কবি ও আদিবাসী গবেষক হাফিজ রশিদ খান বলেছেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি ও বহু ধর্মের দেশ। এখানে বসবাসরত প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে সমান মর্যাদা দেয়া আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে যদি একজন ভিন্ন ধর্ম বা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষও বসবাস করেন, তাকেও পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিতে হবে। আদিবাসীদের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করা বৈজ্ঞানিক ও সামাজিকভাবে সঠিক নয়। বরং আদিবাসী শব্দটি তাদের পরিচয় ও মর্যাদাকে যথাযথভাবে তুলে ধরে। কোনো জাতিকে ক্ষুদ্র বলে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
রবিবার (১২ এপ্রিল) বিকেলে নগরীর কাজীর দেউরী জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠের বই মেলা মঞ্চে স্বাধীনতার বই মেলার আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ১৯ দিন ব্যাপি বই মেলার ১৩ তম দিনে “নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ” শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে হাফিজ রশিদ খান বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই জনগোষ্ঠীগুলো স্মরণাতীতকাল থেকে এ ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে, ফলে তাদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি দেশের প্রায় এক দশমাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং সেখানে বাঙালিসহ প্রায় ১৬টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তফসিলভুক্ত না হলেও আসামি, নেপালি, সাঁওতাল ও রাখাইন জনগোষ্ঠীকেও আদিবাসী পরিচয়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, পাঠ্যপুস্তকেও এখনো সঠিক ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস উপস্থাপন করা হয় না। শব্দ পরিবর্তনের নামে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি জাতির একজন সদস্য বেঁচে থাকলেও সেই জাতির অস্তিত্ব অটুট থাকে। তিনি ব্যক্তির সম্ভাবনা ও গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একজন মানুষই সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের সম্পদের অভাব নেই, অভাব আছে আন্তরিকতা, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার।
সংস্কৃতি ও জীবনধারার বৈচিত্র্য নিয়ে তিনি বলেন, খাদ্যাভ্যাস বা ভাষা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা অনুচিত। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈচিত্র্যের কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক।
শেষে তিনি বলেন, নতুন সরকারের ঘোষিত “রেইনবো বাংলাদেশ” ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে সকল জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি এ লক্ষ্যে সবার সচেতনতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী রিফাত চৌধুরী লিজা গান পরিবেশন করেন এবং চসিকের কুলগাঁও উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, কাপাসগোলা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, বাগমনিরাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং ভোলানাথ মনোরমা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. শামসুদ্দিন শিশিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ আলোচক ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক উপ পরিচালক ড. আজাদ বুলবুল, কথাসাহিত্যিক নাসের রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক কর্মধন তঞ্চঙ্গ্যা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন টিভি ও বেতারের উপস্থাপিকা নাহিদা নাজু।


