শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

[the_ad id='15178']

আমাজনের হৃদয় থেকে বাংলাদেশের উপকূল : কপ৩০ এর অভিজ্ঞতা

ড. মো. আরিফুর রহমান

COP অর্থ হলো Conference of the Parties। এটি UNFCCC-এর অধীনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বার্ষিক সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সম্মেলন। বর্তমানে প্রায় ২০০টি দেশ কপ প্রক্রিয়ার অংশ। প্রতি বছর একটি দেশে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে বিশ্বনেতা, নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, নাগরিক সমাজ, যুব ও আদিবাসী প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

- Advertisement -

কপ সম্মেলনে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। যেমন:

- Advertisement -shukee

১. নির্গমন হ্রাস (Mitigation): কার্বন ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো।

২. খাপ খাওয়ানো (Adaptation): জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি।

৩. জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance): উন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থ সহায়তা।

৪. ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি (Loss and Damage): জলবায়ু দুর্যোগে অপূরণীয় ক্ষতির স্বীকৃতি ও সহায়তা।

গুরুত্বপূর্ণ কপ সিদ্ধান্তগুলো হলো নিম্নরূপ:

১. কপ২১ (প্যারিস, ২০১৫): প্যারিস চুক্তি—বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫–২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার অঙ্গীকার।

২. কপ২৬ (গ্লাসগো): কয়লা ব্যবহার কমানো ও ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য জোরদার।

৩. কপ২৭ (মিশর): ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।

৪. কপ২৮ (দুবাই): প্রথম বৈশ্বিক স্টকটেক (Global Stocktake)।

বাংলাদেশের জন্য কপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশ একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা ও বাস্তুচ্যুতি দেশের উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলছে। কপ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন দাবি করতে পারে। অভিযোজন ও ক্ষতি-ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার তুলে ধরতে পারে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার সুযোগ পায়।

বেলেমে পৌঁছানো: প্রতীক থেকে বাস্তবতায়:

ব্রাজিলের বেলেম শহরে পা রাখার মুহূর্তেই অনুভব করেছি, এটি কেবল একটি কনফারেন্স শহর নয়; এটি জলবায়ু সংকটের এক জীবন্ত রূপক। আমাজন নদী ও অরণ্যে ঘেরা এই অঞ্চল প্রকৃতির অফুরন্ত শক্তি যেমন তুলে ধরে, তেমনি উন্নয়নের নামে সেই প্রকৃতির ওপর চালানো আঘাতের চিহ্নও স্পষ্ট করে। বন উজাড়, ভূমি দখল, দারিদ্র্য ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংকট সব মিলিয়ে বেলেম যেন আমাদের বৈশ্বিক ভবিষ্যতের একটি সতর্ক মানচিত্র।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একজন বাংলাদেশি উন্নয়নকর্মী হিসেবে আমার মনে বারবার ভেসে উঠেছে চট্টগ্রাম, ভোলা, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম জনপদগুলোর কথা। ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও বাস্তবতা অভিন্ন,জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়; এটি বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা।

আমার কাছে কপ৩০–তে অংশগ্রহণ কোনো আনুষ্ঠানিক সফর ছিল না; এটি ছিল মাঠের মানুষের কণ্ঠ বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেয়ার এবং সেই কণ্ঠ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তা প্রত্যক্ষ করার এক দায়বদ্ধ যাত্রা।

কপ৩০–এর প্রেক্ষাপট: প্রত্যাশা বনাম অগ্রগতি:

গ্লোবাল স্টকটেকের পর প্রথম কপ হিসেবে কপ৩০–এর সামনে ছিল স্পষ্ট দায়িত্ব,প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার রোডম্যাপ তৈরি করা। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য, নতুন ও উচ্চাভিলাষী এনডিসি, জলবায়ু অর্থায়নের বাস্তব প্রবাহ এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা।

আমাজনের শহরে এই সম্মেলনের আয়োজন একটি নৈতিক বার্তা দেয়, জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য, আদিবাসী, যুব ও প্রতিবন্ধী অধিকার আলাদা ইস্যু নয়; এগুলো একই সংগ্রামের অংশ। এই উপলব্ধি কপ৩০–এর আলোচনাকে আগের অনেক কপের তুলনায় বেশি আন্তঃসংযুক্ত করেছে।

বাংলাদেশের অবস্থান: বেঁচে থাকার ন্যায্য দাবি

বাংলাদেশ কপ৩০–এ কোনো বিশেষ সুবিধা চাইতে আসেনি; এসেছে বেঁচে থাকার ন্যায্য দাবি নিয়ে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল,

 লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়নের পথে এগোবে।

 অভিযোজন অর্থায়নে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অগ্রাধিকার নিশ্চিত হবে।

 জলবায়ু উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত মানুষের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক নীতিতে স্বীকৃতি পাবে।

 নন–ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ (NELD) সংস্কৃতি, পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও সামাজিক কাঠামো ভাঙনের বিষয়গুলো দৃশ্যমান হবে।

বিভিন্ন সাইড ইভেন্ট ও বৈঠকে আমি তুলে ধরেছি,বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কেবল নদীভাঙন বা লবণাক্ততায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে দিচ্ছে, মানুষকে শিকড়ছাড়া করছে।

আলোচনার ভেতরের বাস্তবতা: কূটনীতি ও মানবিকতার দূরত্ব

কপ৩০–এর আলোচনায় একটি পরিচিত বৈপরীত্য স্পষ্ট। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যখন কার্বন বাজেট বা অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলে, তখন মনে পড়ে খোলা আকাশের নিচে চরম অনিশ্চয়তায় বেঁচে থাকা উপকূলের মানুষের কথা।

ইতিবাচক দিক হলো বাংলাদেশের কণ্ঠ আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। যুব প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব , সিভিল সোসাইটির তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন এবং লোকালি লেড অ্যাডাপটেশনের উদাহরণ আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি করেছে। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ও নন ইকোনমিক লস এন্ড ড্যামেজ NELD আলোচনার টেবিলে জায়গা পেয়েছে।

তবে হতাশার জায়গাও রয়ে গেছে। প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু বাধ্যতামূলক সময়সীমা নেই; সদিচ্ছার ভাষা আছে, কিন্তু জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল। “আমরা চেষ্টা করব” কিংবা “আরও পর্যালোচনা প্রয়োজন” এই বাক্যগুলো এখনো বাস্তবতার ভার বহন করে না।

সিভিল সোসাইটি ও আদিবাসী কণ্ঠ: কপ৩০–এর চালিকাশক্তি

কপ৩০–এর সবচেয়ে প্রাণবন্ত দিক ছিল সিভিল সোসাইটি, যুব, প্রতিবন্ধী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দৃঢ় ও সংগঠিত উপস্থিতি। আমাজনের আদিবাসী নেতাদের বক্তব্য স্পষ্ট করেছে,এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন নয়; এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিরা লোকালি লেড অ্যাডাপটেশন, কমিউনিটি রেজিলিয়েন্স, সামাজিক সংহতি, যুব নেতৃত্ব ও শর্তবিহীন অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। এসব আলোচনা আবারও প্রমাণ করেছে টেকসই সমাধান অনেক সময় স্থানীয় উদ্যোগেই নিহিত।

প্রাপ্তি ও সীমাবদ্ধতা: আপডেটেড চিত্রঃ

কপ৩০ থেকে বাংলাদেশের কিছু বাস্তব অগ্রগতি স্বীকার করতেই হবে। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়েছে, NELD এখন আর প্রান্তিক ধারণা নয়, এবং লোকালি লেড অ্যাডাপটেশন আন্তর্জাতিক নীতিভাষায় দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করেছে।

তবে সীমাবদ্ধতা এখনো প্রকট। ঘোষিত অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, অভিযোজন অর্থায়ন এখনো গৌণ বিবেচনায় রয়ে গেছে এবং জবাবদিহির প্রশ্নে দৃঢ় অগ্রগতি নেই।

বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত শিক্ষা

কপ৩০ বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে। যেমন:

  • একক কণ্ঠ নয়, জোটভিত্তিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও সমন্বিত চাপ জরুরি।
  • মানুষের গল্প ও মাঠের বাস্তবতা আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
  • সরকার ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত ও ধারাবাহিক অবস্থান অপরিহার্য।
  • বাংলাদেশ NELD ও জলবায়ু উদ্বাস্তু ইস্যুতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে পারে।

বেলেমের পর: আমাদের করণীয়ঃ

বেলেম থেকে ফিরে আমার উপলব্ধি স্পষ্ট কপ কোনো শেষ কথা নয়; এটি একটি চলমান সংগ্রামের মাইলফলক। কপ৩০ দেখিয়েছে, বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতি ন্যায়ের ভাষা শিখছে, কিন্তু সেই ভাষা বাস্তবে প্রয়োগ করতে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে স্থানীয় মানুষের জীবনে রূপান্তর করা। উপকূলের মানুষ, জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও তরুণ প্রজন্ম তাদের জীবনে যদি বাস্তব, দৃশ্যমান ও টেকসই পরিবর্তন আসে, তবেই কপ৩০–এর অভিজ্ঞতা অর্থবহ হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য ভবিষ্যতের নয় এটি বর্তমানের বাস্তবতা। বেলেম সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এখন দায়িত্ব আমাদের এই বাস্তবতাকে ন্যায়ের পথে রূপ দেয়ার।

জলবায়ু পরিবর্তন ও কপ (COP) প্রক্রিয়াঃ

জলবায়ু পরিবর্তন বলতে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়াগত পরিবর্তনকে বোঝায় যার মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস (যেমন: কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন) এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর, যেমন বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামো (UNFCCC)

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলার জন্য ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের অধীনে United Nations Framework Convention on Climate Change (UNFCCC) গঠিত হয়। এর লক্ষ্য হলো পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থাকে বিপজ্জনক মানবসৃষ্ট প্রভাব থেকে রক্ষা করা।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সংকট, যার সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিক ও ন্যায্য। কপ প্রক্রিয়া হলো সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চ, যেখানে রাষ্ট্রগুলো একত্রে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু ন্যায়ের জন্য কপ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়বদ্ধ করা।

লেখক: উন্নয়ন সংগঠক ও গবেষক

প্রতিষ্ঠাতা ও  প্রধান নির্বাহী, ইপসা

ই-মেইল: ypsa_arif@yahoo.com

সর্বশেষ

মহান মে দিবস আজ

এই বিভাগের আরও