অপরিকল্পিত নগরায়ণ,আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, জলাবদ্ধতা, খাল ও নালা-নর্দমা বেদখল, বর্জ্যব্যবস্থাপনার অভাব,যানযট,বস্তিগুলোতে অস্বাস্থ্যকর আবাসন, পাহাড়কাটা, ফুটপাতে ভাসমান দোকানপাট,খেলার মাঠের অভাবসহ নানান সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার পাহাড়-সমুদ্রের ছায়াতলে অবস্থিত চট্টগ্রামশহর। সরকার আসে সরকার যায়,মেয়র আসে মেয়র যায় কিন্তু চট্টগ্রাম নগরের প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয় না।
বিশ্বের সব উন্নত দেশে রাজধানী ছাড়াও একাধিক শহর থাকে যেগুলো রাজধানীর চেয়ে বেশি উন্নত। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনের চেয়ে নিউইয়র্ক ও কালিফোর্নিয়া,কানাডার রাজধানী অটোয়ার চেয়ে টরেন্টো ও কুইবেক, অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার চেয়ে সিডনী ও মেলবোর্ন এবং ভারতের রাজধানী দিল্লির চেয়ে মুম্বাই অনেক উন্নত। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বন্দরনগর চট্টগ্রাম কেন রাজধানী ঢাকা থেকে অনুন্নত? কেন চরম উন্নয়নবৈষম্যের শিকার এ চট্টগ্রাম? চট্টগ্রাম বিশ্বের দৃষ্টিনন্দন শহরগুলোর তালিকায় কেন জায়গা করে নিতে পারিনি? চট্টগ্রাম থেকে সরকার যে ট্যাক্স পায়, সেখান থেকে ১ শতাংশ দিলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা মজবুত হয় এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নে অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না। চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেনকে উন্নয়নপ্রকল্পের বরাদ্দের জন্যে কেন স্থানীয় সরকার,পল্লীউন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করতে হবে,উন্নয়নপ্রকল্পের ফাইল মন্ত্রণালয় থেকে কেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার বাসায় চলে যায়? মেয়রের অভিযোগ,মন্ত্রণালয়ে কোনো ফাইল গেলে তা অনুমোদন হয় না। প্রকল্পের ফাইল হলে উপদেষ্টা মহোদয় সেগুলো বাসায় নিয়ে যায়। উপদেষ্টার আচরণে কতোটা বিক্ষুব্ধ হলে মেয়র শাহাদাৎ জনসমক্ষে এধরনের অভিযোগ তুলতে পারেন।

অতীতে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার গল্প শোনা গেলেও তা কথামালায় সীমিত। নগরউন্নয়নের প্রতিশ্রুতি অনেক শুনেছে নগরবাসী। চট্টগ্রামের উন্নয়নবৈষম্য ও বঞ্চনার মূল কারণ জনদরদী,যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্বের অভাব। বিগত ৫৪বছরে ১২ টি জাতীয় সংসদের যারা মন্ত্রী-এমপি ছিলেন তারা চট্টগ্রামের উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারেননি। চট্টগ্রামের ভৌগলিক গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে তারা কাজে লাগাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নে জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন ফোরামে সোচ্চার ছিলেন এমন উল্লেখযোগ্য নেতা নেই বললে চলে। তবে মন্ত্রী-এমপি না হয়েও চট্টগ্রামের স্বার্থে সাহসী ও আপোসহীন ভূমিকা রেখেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি চট্টলবীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই প্রথমবার বন্দর পরিচালনার ভার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর মোহনায় বেসরকারি বন্দরনির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্টিভিডোর সার্ভিসেস অব আমেরিকা (এসএসএ)। এ নিয়ে একটি চুক্তি করার ব্যাপারে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার ও এসএসএ। কিন্তু চুক্তিটি দেশের স্বার্থপরিপন্থী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে তখন আন্দোলনে নেমেছিলেন সরকারি দলেরই প্রভাবশালী নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোসহীন। নিজদলের হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরকে রক্ষা করেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড এর হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতারা চুপচাপ; কেউ উচ্চবাচ্য করছে না। এ নিয়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল আন্ন্দোলন শুরু করলেও অজ্ঞাতকারণে তা আবার থেমে যায়। এ সময়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী বেঁচে থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে যা হচ্ছে তার জন্যে চট্টগ্রাম অচল করে দিতেন।

ঢাকা- চট্টগ্রাম উন্নয়নের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য চলছে। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা,শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে। এতে করে সবকিছু হয়ে পড়েছে ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের সরকারি-বেসরকারি ৮২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিই ঢাকায়। ৩৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ৩২টিই এ ঢাকা মহানগরীতে। বিশেষায়িত সব হাসপাতাল গড়ে ওঠেছে রাজধানীকে ঘিরে। শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, মানের দিক থেকেও দেশের সেরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এ রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত। আমাদের মন্ত্রী-এমপি-আমলারা সব ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়; স্থানীয়সরকারকে শক্তিশালী করতে নারাজ।
এদিকে নগরীতে কাজ করছে সরকারের ডজনখানেক সেবাসংস্থা। সিভিল ও পুলিশ প্রশাসন চট্টগ্রাম বন্দর,সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিটিসিএল, ফায়ারসার্ভিস,গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বিএসটিআই, বিআরটিসি, বিআরটিএ ছাড়াও আরও অনেক সেবাসংস্থা রয়েছে। সরকারি এসব সেবাসংস্থার সাথে সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়হীনতার গল্প শোনতে শোনতে চট্টলবাসী ক্লান্ত ও বিরক্ত। এসব সংস্থার ওপর মেয়রের কোনো কর্তৃত্ব নেই। তার জন্য প্রয়োজন সিটি গভর্মেন্ট বা নগর সরকার। অতীতে ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, সাদেক হোসেন খোকা ও চট্টগ্রামের মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী নগর সরকার প্রতিষ্ঠার জন্যে অনেক আন্দোলন–সংগ্রাম করলেও সরকারপ্রধানের সাড়া পাননি।
চট্টগ্রামকে অবহেলিত রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন মানে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন। জাতীয় অর্থনীতির ৮০ শতাংশের বেশি আয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে অর্জিত হয়। আমদানি–রফতানির ক্ষেত্রেও এ বন্দরে ৮০ শতাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হয় । অথচ এ বন্দরের মালবাহী গাড়ি যে মহাসড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করে ৫৪ বছরেও সেটির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এখনো এ সড়কের ৮-১০ লাইন করার কাহিনী শোনে আসছে দেশবাসী। জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে আরও ২০/২৫বছর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ১০লাইন করা উচিত ছিল।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

