রবিবার, ৩ মে ২০২৬

[the_ad id='15178']

মোহাম্মদ ইউসুফ

জাহাঙ্গীরের প্রেসক্রিপশনে এখনও চলছে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্তমানে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত হওয়ার কথা। জাহাঙ্গীর চৌধুরী হাইকোর্টে রীট করলে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্থগিত করা হয়। প্রায় দুবছর পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দীর্ঘ শুনানী শেষে তার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। সমাজসেবা অধিদপ্তর এখন আদালতের রায়ের আদেশ অফিসিয়ালি না পাওয়ায় পুনরায় প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না। আদালতের রায়ের আলোকে বর্তমানে জাহাঙ্গীর চৌধুরী চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি কিংবা হাসপাতাল পরিচালনা পরিষদের কেউ না। হাসপাতালে ঢুকার তার আইনগত অধিকার না থাকলেও সভাপতি হিসেবে হাসপাতাল পরিচালনা করছেন। আইন-আদালত, সরকারি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বহিস্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী কীভাবে হাসপাতালে সুধীসমাবেশ ও আদর্শ রোগীদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন- এমন প্রশ্ন ওঠেছে সর্বমহলে। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে হাসপাতালের আজীবন সদস্যদের মধ্যে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ জাহাঙ্গীর চৌধুরী সভাপতি হিসেবে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবসে সুধী সমাবেশ ও আদর্শ রোগীদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে প্রধান অতিথি করা হয়। অবশ্য প্রধানঅতিথি অনুষ্ঠানে গরহাজির ছিলেন। এ ধরনের একটি অবৈধ ও ভুয়া অনুষ্ঠানের সংবাদ স্থানীয় পত্রিকাগুলো কীভাবে প্রচার করে- তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালের আজীবন সদস্যরা। বেশ কজন আজীবন সদস্য মুঠোফোনে চাটগাঁর বাণীকে বলেন, জাহাঙ্গীর চৌধুরীর রিটপিটিশন যে আদালত খারিজ করে দিয়েছিল সেই সংবাদ তো এসব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো। আইনগতভাবে জাহাঙ্গীর চৌধুরী এ হাসপাতালের কেউ নয়। তারপরও জেনে শুনে পত্রিকাগুলো কীভাবে এ ধরনের ভুয়া সংবাদ ছাপায়- তা আমাদের বোধগম্য নয়।
এদিকে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতাল রক্ষা পরিষদের জীবন সদস্যবৃন্দ ২মার্চ ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীতে মহামান্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধ সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী ও তার কমিটির হাসপাতালে প্রবেশের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ আমরা চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির জীবন সদস্য। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে ৫ হাজারের ওপর জীবন সদস্য রয়েছেন। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর নামে সরকারি অনুদানের ও হাসপাতালের অর্থ আত্মসাৎ,স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় গত ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি জনাব সাব্বির ইমাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে সমাজসেবা অধিদপ্তর তাকে সভাপতির পদ থেকে ও তার অবৈধ কমিটিকে বহিস্কার করেন এবং হাসপাতালে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ দেন।কিন্তু জাহাঙ্গীর চৌধুরী প্রশাসক নিয়োগের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন যার রিটপিটিশন নম্বর ১৬১০/২৩। দীর্ঘ শুনানী শেষে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে জাহাঙ্গীরের করা রিট আবেদন মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও দেবাশীষ রায় চৌধুরী খারিজ করে দেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ হাসপাতালের জীবন সদস্যদের অবগত না করেএবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে লোক দেখানোর জন্যে হাসপাতালের লাখ লাখ টাকা খরচ করে সভা ডেকেছেন- যা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা ডায়াবেটিক হাসপাতালের আজীবন সদস্যরা তার এ সভা ডাকা এবং তার হাসপাতাল অভ্যন্তরে ঢুকার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবশেষে জাহাঙ্গীর চৌধুরীকে হাসপাতাল অভ্যন্তরে ঢুকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
অন্যদিকে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের সাবেক বহিস্কৃত সভাপতি জাহাঙ্গীর চৌধুরী আজ (৪মার্চ) সভাপতি হিসেবে চট্টগ্রামের স্থানীয় সব পত্রিকায় “রমজান মাসে আপনার জাকাত দান করুন” শিরোনামে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। হাসপাতালের আজীবন সদস্যরা বলছেন, যেহেতু তিনি এখন হাসপাতালে কেউ নন, তাই এ কাজ করার তার আইনগত কোনো অধিকার নেই। গত প্রায় দুযুগ ধরে রমজান মাসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে জাকাতের টাকা তিনি নিয়েছেন তার কোনো যথাযথ হিসাব নেই, প্রায় সবই গেছে তার পকেটে। ফলে নতুন কমিটি না হওয়া পর্যন্ত কাউকে হাসপাতালের পকেট কমিটিকে জাকাতের টাকা না দেয়ার আহবান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল রক্ষা পরিষদের সদস্যরা। সমাজের সামর্থ্যবানদের দান-অনুদান ও দান-খয়রাতের টাকায় পরিচালিত সেবাধর্মী এ হাসপাতালে সুলভমূল্যে ডায়াবেটিক রোগীদের সেবাদানের কথা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে তার বিপরীত। ডায়াবেটিক রোগীদের এখানে প্রাইভেট হাসপাতালের মতো উচ্চমূল্যে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। বাণিজ্যিক হাসপাতালের মতোই চলছে সমিতির এ হাসপাতাল। আইসিইউ, সিসিইউ,এইচডিইউ ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা চালু থাকলেও সরকারি কোনো দপ্তরের অনুমোদন নেই। নেই কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। বিগত সময়ে গরীব রোগীদের বিনামুল্যে ইনসুলিন দেয়ার নামে জনগণের কাছ থেকে যাকাতের টাকা নেয়া হলেও বিনাপয়সায় ইনসুলিন পাওয়ার রেকর্ড নেই।
জাহাঙ্গীর চৌধুরী ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, হাসপাতাল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মানববন্ধন, ব্যানারের ছবিতে জুতাপেটা, অকথ্যভাষায় গালাগাল দেয়ার পরও লজ্জা-শরম বলতে কিছুই নেই তার মধ্যে। তার বিরুদ্ধে আদালতে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রক ২০২৪ সালে ২০ এপ্রিল সাড়ে ২৭লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত জমা দেয়া হয়নি। চট্টগ্রাম দুর্নীতি দমন কমিশনও জাহাঙ্গীর চৌধুরীর দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে। এতকিছুর পর তিনি হাসপাতালের হাল ছাড়তে নারাজ।
১৯৭৮ সালে স্থাপিত চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতি কর্তৃক পরিচালিত এ হাসপাতালটি জাহাঙ্গীর চৌধুরীর কবব্জায় পড়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। সমিতির আজীবন সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এ হাসপাতাল পরিচালনা করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না এখানে। দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে হাসপাতালটি যদি পরিচালিত হতো তাহলে ৪০/৫০ কোটি টাকা এ হাসপাতালের তহবিলে জমা হতো। অত্যাধুনিক মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনা যেতো,গরীব রোগীরা সুলভমূল্যে চিকিৎসাসেবা পেতো। জাহাঙ্গীর চৌধুরী ২০০১ সালে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর উদ্দিনকে অনৈতিক পন্থায় হটিয়ে ওই পদে আসীন হন। সেই তখন থেকেই এখন পর্যন্ত প্রভাব খাটিয়ে গঠনতন্ত্রকে নিজের সুবিধামতো সংশোধনী এনে সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে সভাপতি পদ দখলে নিয়ে হাসপাতালটিকে ব্যক্তিগত হাসপাতালে পরিণত করেছে। হাসপাতালে প্রতিদিন ৯/১০ লাখ টাকা আয় হলেও হাসপাতালের নামে কোনো আয়-ব্যয়ের রেজিস্ট্রার বই নেই। আয়-ব্যয়ে নেই কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। গঠনতন্ত্রের ১২ (ঘ) ধারা মোতাবেক ব্যাংক হিসাব-যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ সমিতির যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করার কথা। ১৭ (গ) ধারা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব- যা সমিতির নামে কোষাধ্যক্ষ নিজে এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে-কোনো একজনসহ দুজনের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয় না।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও