বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

[the_ad id='15178']

প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

শিল্পপতি নাছির উদ্দিনের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী

মোহাম্মদ ইউসুফ

নিজপ্রচেষ্টায়,পরিশ্রম,সাধনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যিনি দেশের পোশাকশিল্পের নামজাদা শিল্পপতি হিসেবে দেশ-বিদেশে যথেষ্ট যশ-খ্যাতি অর্জন করেছিলেন,নিজের হাতেগড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তিল তিল করে অনন্যউচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন,প্রথিতযশা সে-ই স্বনামধন্য শিল্পপতি হলেন প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক,বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক প্রয়াত মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। মানবতাবাদী এ সমাজহিতৈষীর আজ (২৮ ফেব্রুয়ারি) তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। প্রয়াণদিবসে প্রয়াত শিল্পপতি নাসির উদ্দিনের প্রতি রইল  বিনম্র শ্রদ্ধা।
নাছির উদ্দিন ১৯৫০ সালের ১৫ডিসেম্বর সীতাকুণ্ড উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ছলিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা আমেনা খাতুন, বাবা আবদুল জলিল।৪ভাই ও ৩বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সাহসী ও অনুসন্ধিৎসু ছিলেন তিনি। ছাত্রজীবনে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী।১৯৬৫ সালে কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৭০ সালে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৮সালে তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসার সাথে যুক্ত হন।
নাছির উদ্দিন খাতুনগঞ্জভিত্তিক আমদানি বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭২ সালে ডিপ-সি ট্রলিং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মৎস্যশিল্পের সাথে সম্পৃক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারিতে এনজেডএন শিপ ব্রেকিং লিমিটেড ও একই সালে নাসিরাবাদে স্থাপন করেন ফরিদপুর স্টিল রি-রোলিং মিল। উল্লেখ্য,নাছির উদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের জাহাজভাঙ্গাশিল্পের প্রাথমিক উদ্যোক্তাদের একজন।
নাছির উদ্দিন ১৯৮৪ সালে পোশাকশিল্পে পদার্পণ করেন। যাত্রা শুর হয় এনজেডএন গার্মেন্টস লিমিটেড দিয়ে।বাংলাদেশের পোশাকশিল্প তখন ঊষালগ্নে। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে ৫শ’ লোকবল নিয়ে তিনি পোশাকশিল্প শুরু করেন। দেশে দক্ষ জনশক্তির অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় বিদেশ থেকে নিয়ে আসেন সুদক্ষ প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী। আশির দশকে বাংলাদেশ বর্হিবিশ্বের কাছে পরিচিত ছিল দুর্ভিক্ষ ও বন্যাকবলিত গরীব দেশ হিসেবে। সেই সময় অদম্য সাহস নিয়ে নাছির উদ্দিন উন্নত দেশগুলোতে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হন। বাংলাদেশকে নতুন করে পরিচয় করে দেন পোশাকশিল্পের এক সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে। একে একে বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে থাকে উন্নতবিশ্বের পোশাকক্রেতারা। তাঁর এ উদ্যমে উৎসাহিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আরও অনেক পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

- Advertisement -

নাছির উদ্দিন সাফল্যের এ ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) প্রতিষ্ঠা করেন প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড। পোশাকশিল্পের গতানুগতিক ধ্যান-ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে। শুধু তাই নয়, পণ্যের গুণগত মানোন্নয়নে এবং পোশাকশিল্পকে একটি গবেষণানির্ভর শিল্পে পরিণত করার প্রয়াসে তিনি আত্মনিয়োগ করেন।এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পোশাক ক্রয় শুরু করে বিশ্ববিখ্যাত প্রথম সারির ফ্যাসন ব্র্যান্ডসমূহ। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর ব্যবসার পরিসর। ২০০১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জিন্স ২০০০ লিমিটেড এবং ২০০৮ সালে শুরু করেন ইউনিভার্সেল জিন্স লিমিটেড নামের রপ্তানিমুখি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপে কর্মরত আছে ৩০হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারি। বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে প্যাসিফিক জিন্সের পণ্য।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক হিসেবে প্যাসিফিক জিন্স পরপর ৫বার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি অর্জন করেছে।নাছির উদ্দিন বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিকাশে অসাধারণ অবদানের জন্যে ২০০৬ সালে Businessman of the year পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া জীবৎকালে তিনি বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির শিল্পপতির স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক Commercial Important person (CIP) হিসেবে সম্মানিত হয়েছিলেন বারংবার। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সংগঠন বিজিএমইএ এর তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বিজিএমইএ এর জন্মলগ্ন থেকে তিনি নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন।
নাছির উদ্দন ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সমাজসেবায় স্থাপন করেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। সীতাকুণ্ড উপজেলায় শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত লতিফপুর আলহাজ্ব আবদুল জলিল উচ্চবিদ্যালয় ও মাতার নামে স্থাপন করেন আমেনা বিদ্যানিকেতন। এছাড়া সীতাকুণ্ডে নারীশিক্ষা প্রসারে প্রতিষ্ঠা করেন হযরত কালুশাহ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও বাড়বকুণ্ড স্কুল এন্ড কলেজের দৃষ্টিনন্দন একাডেমিক ভবন। সীতাকুণ্ডের এমন কোনো শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নেই- যেখানে তাঁর আর্থিক সহায়তার ছোঁয়া লাগেনি। সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নাছির উদ্দিন প্রতিষ্ঠা করেছেন প্যাসিফিক জিন্স ফাউন্ডেশন- যা সীতাকুণ্ডবাসীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বিশেষকরে শিক্ষাক্ষেত্রে নজিরবিহীন অবদান রাখছে।
সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী’র উদ্যোগে ২০১৮ সালের ২৩নভেম্বর শিল্প ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্যে শিল্পপতি নাছির উদ্দিনকে সম্মাননা স্মারকে ভূষিত করা হয়।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও