সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

[the_ad id='15178']

স্মরণ

ব্যতিক্রমধর্মী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী অধ্যাপক আহসাবউদ্দিন খালেদ

মোহাম্মদ ইউসুফ

জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টদায়ক ঘটনা হলো প্রিয়জনের মৃত্যু। ঘনিষ্ঠ মানুষটি যখন চিরতরে হারিয়ে যায়,তখন হৃদয়ে তৈরি হয় বিশাল এক গভীর শূন্যতা। এটি জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। প্রতিটি মৃত্যুই এক অপূরণীয় ক্ষতি, কোনোকিছু দিয়ে এই ক্ষতিপূরণ কখনোই হয় না। আসলে জীবন ক্ষণিকের খেলা, মৃত্যুই তার চূড়ান্ত নিস্তব্ধতা। চোখের সামনে আপনজনের প্রয়াণ স্বব্ধ করে দেয় নিকটজনদের। কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। মৃত্যু আমাদের শেখায় যে, ভালোবাসা কখনো মরে না,শুধু বদলায়। মৃত্যুতে বুকের ভেতরে এতটা শূন্যতা অনুভব হয় যে, তা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। প্রিয় মানুষের হারিয়ে যাওয়া হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় কিন্তু সেই স্মৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তবে মৃত্যুই একমাত্র চিরন্তন সত্য, যা আমাদের প্রতিটি সম্পর্ককে মূল্য দিতে শেখায়। মৃত্যু হয়তো জীবনের সমাপ্তি ঘটায় কিন্তু সম্পর্কের নয়। যারা আমাদের ছেড়ে চলে যায়,স্মৃতির মাঝে তাঁরা অনন্তকাল বেঁচে থাকে। ভালোবাসা মৃত্যুর চেয়ে অনেক শক্তিশালী, তাই আপনজনেরা কখনো হারায় না। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের শিখিয়ে দেয় জীবন কতটা মূল্যবান এবং সময় কতোটা সীমিত। সব মৃত্যুই মানুষকে নাড়া দেয় তবে কিছু মানুষের মৃত্যু হৃদয়কে ভীষণভাবে ধাক্কা দেয়। একইভাবে আমাকে মানসিকভাবে মর্মাহত করেছে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন অধ্যাপক আহসাবউদ্দিন খালেদ ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ। তাঁর ডাকনাম খোকন হলেও খালেদভাই বলেই ডাকতাম। ৭ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন (৮আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও বিকেলে সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের শেখ তৈয়বুল্লাহ ভুঁইয়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজাশেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
অধ্যাপক খালেদ সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সীতাকুণ্ড মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি, চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০২০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে,“Every lives are born to die”. প্রতিটি জীবন মৃত্যুর জন্যে জন্মগ্রহণ করে। জন্ম নিলে সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। তবে প্রতিটি মৃত্যু সমানভাবে সবাইকে নাড়া দেয় না। তবে খালেদভাইয়ের হঠাৎ মৃত্যুসংবাদ আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়। আমার সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। কথায় কথায় তিনি নানা-মামার গল্প করতেন। তাঁর নানা নাজীর আহমদ প্রিন্সিপাল ছিলেন জাতিদর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরাসরি শিক্ষক। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবণীতে তা উল্লেখ আছে। বড়মামা প্রয়াত নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ছিলেন বাগরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আরেক মামা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লেখক আহমদ মুজতাহিদ । ছোটবেলায় নানার মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম শুনতে শুনতে তিনি ‘বঙ্গবন্ধুপাগল’ হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখে মুঠোফোনে আমাকে শোনাতেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক যেকোনো বিষয় নিয়ে আমাকে হরহামেশাই মুঠোফোনে কল দিতেন এবং অনেকক্ষণ ধরে কথা বলতেন। মাঝেমধ্যে কল রিসিভ করতাম না বলে তিনি মনে খুব কষ্ট পেতেন। অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাদামনের পরোপকারী মানুষ ছিলেন তিনি। রাজনীতি-সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে উদারহস্তে তিনি দান-অনুদান দিতেন। তিনি রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে ভাবতেন সর্বদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার কারণে জাতীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে তাঁর পরিস্কার ধারণা ছিল । বিভিন্ন সময়ে কথাপ্রসঙ্গে জাতীয়নেতাদের রাজনৈতিক চরিত্র তুলে ধরতেন। যেকথাটি তিনি আমাকে প্রায় বলতেন, রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র না পাল্টালে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কখনো হবে না; এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না।
তিন কন্যাসন্তানের জনক অধ্যাপক খালেদ ছিলেন গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, চমৎকার যোগাযোগ দক্ষতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অধিকারী। শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি খুবই সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীবান্ধব ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। যেকোনো জটিল বিষয়বস্তু খুব সহজ,সাবলীল ও আকর্ষণীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারতেন এবং তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনতেন। তাঁর মধ্যে ছিল শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলা,জীবনের বড় স্বপ্ন দেখাতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার সক্ষমতা। এছাড়া তিনি সব শিক্ষার্থীর প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি রাখা,পক্ষপাতহীন হওয়া এবং ক্লাসে সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতেন। তিনি উন্নত চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্যে রোলমডেল হিসেবে কাজ করেছেন।
অধ্যাপক আসহাবউদিন ছিলেন আপদমস্তক একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। দেশ,মাটি ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা। নিজের পেশাগত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন এবং দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলার মাধ্যমে তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম ফুটে ওঠতো। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তিনি ছিলেন সর্বদা শ্রদ্ধাশীল। তবে দোষে-গুণে মানুষ। দোষ-ত্রুটির ঊর্দ্ধে কেউ নন। অধ্যাপক আহসাবউদ্দিনও তার ব্যতিক্রম নন।
পরিশেষে, অধ্যাপক খালেদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অভিবাদন। তাঁর বিদেহী পরমাত্মার প্রশান্তি কামনা করছি।
লেখকঃ প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও