চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, চট্টগ্রামকে একটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও দূষণমুক্ত নগরীতে রূপান্তর করতে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, পানি সংকট ও পরিবেশ দূষণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখন থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী ও বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রজন্মের মেধা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৃহস্পতিবার (১৪মে) কাট্টলী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে “কৌতূহল থেকে সৃষ্টির পথে” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত “বিজ্ঞান উৎসব-২০২৬”-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মেয়র বলেন, তিনি প্রতিটি স্টল ঘুরে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত বিভিন্ন প্রকল্প মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন এবং তাদের চিন্তাশক্তি ও বাস্তবমুখী উদ্ভাবনে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহণ করতাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, বিজ্ঞানচর্চা শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে। আজকের শিক্ষার্থীরা যেভাবে একটি ইকো-ফ্রেন্ডলি, সাস্টেইনেবল ও দূষণমুক্ত শহর গড়ে তোলার চিন্তা করছে, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। আমি মনে করি, এই ধরনের চিন্তাভাবনা আগামী দিনের উন্নত চট্টগ্রাম গঠনের ভিত্তি তৈরি করবে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ। কোথায় পানি জমছে, কীভাবে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা যায়, কীভাবে খাল-নদী রক্ষা করা যায় এবং কীভাবে নগরকে দূষণমুক্ত রাখা যায়—এসব বিষয় নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রতিনিয়ত কাজ করছে। তিনি বলেন, “শুধু সরকারি উদ্যোগে নয়, নাগরিকদের সচেতনতা ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আজকের এই বিজ্ঞান উৎসব প্রমাণ করেছে, আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছে না, বরং সেগুলোর কার্যকর সমাধান নিয়েও চিন্তা করছে।”
বিজ্ঞান উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মেয়র বলেন, কিছু শিক্ষার্থী রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও রিচার্জ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নিয়ে কাজ করেছে, আবার কেউ নদীর পানি পরিশোধন করে পুনঃব্যবহারের প্রযুক্তি উপস্থাপন করেছে। তিনি বলেন, “এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদের ভবিষ্যৎ পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পৃথিবীতে পানি সংকট দিন দিন বাড়ছে। একসময় হয়তো পানিকেই কেন্দ্র করে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকট তৈরি হবে। তাই এখন থেকেই আমাদের পানি সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ এবং পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অযথা পানি অপচয় বন্ধ করতে হবে এবং বিকল্প উৎস ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে।”
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ঋতুচক্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যে বর্ষাকাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণ নগরবাসীর জন্য দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, “গত বছর আমরা দেখেছি, জুন থেকে শুরু হয়ে নভেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। অতিবৃষ্টি শুধু জলাবদ্ধতাই সৃষ্টি করে না, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বৃষ্টির পানি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং সেটিকে পরবর্তীতে ব্যবহারযোগ্য করা যায়, সে বিষয়ে এখন থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় গাছের গুরুত্ব এবং কার্বন নিয়ন্ত্রণ নিয়েও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উদ্ভাবনী চিন্তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছ যেভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি শিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন করেছে। পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিশোধন ও বিশুদ্ধ বাতাস নিশ্চিত করার প্রযুক্তিগত ধারণাও তারা তুলে ধরেছে। মেয়র বলেন, “আমাদের নতুন প্রজন্ম শুধু বইয়ের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়েও চিন্তা করছে। এই মানসিকতাই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মেয়র বলেন, জীবনে হার-জিত থাকবে, কিন্তু নতুন কিছু শেখা ও সৃষ্টির জন্য সবসময় এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, “আজ এখানে যারা অংশগ্রহণ করেছে, আমি মনে করি সবাই বিজয়ী। কারণ তারা নিজেদের মেধা, চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়েছে। প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়া বড় কথা নয়, বরং নতুন কিছু জানার আগ্রহ ও উদ্ভাবনের মানসিকতা গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, অভিভাবকদের সহযোগিতা এবং আয়োজকদের উদ্যোগের কারণেই এমন একটি সৃজনশীল আয়োজন সফল হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিচারক ও সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ সাইফুল করিম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা। সমাপনী পর্বে পুরস্কার বিতরণ ও আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা কর্মকর্তা ও সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমা বিনতে আমিন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনজুর আলম মঞ্জু, অভিভাবক সদস্য রফিক উদ্দিন চৌধুরী, মো. শাহেদ আকবর, সুফিয়া আক্তার সিমি, কাট্টলী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল কাশেম।


