চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবসের ৯৬ তম বাষির্কী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত যুব সমাবেশে বক্তারা চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের দিন ১৮ই এপ্রিলকে জাতীয় যুব দিবস ঘোষণা করার দাবী জানিয়েছেন।
আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল ) বিকেলে নগরীর জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলার উদ্যোগে আয়োজিত যুব সমাবেশ বক্তারা এই দাবী জানান।

যুব সমাবেশে বক্তারা বলেন, ব্রিটিশবিরোধী যুব আন্দোলনের ঐতিহাসিক অনুপ্রেরণা, বিশেষ করে সূর্য সেন–এর নেতৃত্বে সংঘটিত চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ, পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাষ্টারদা’ সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ হয়েছিল, সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বর্তমান বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও আগ্রাসনের মাধ্যমে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে ও রক্ত ঝরাচ্ছে। যা নতুন করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

বক্তারা আরো বলেন, বর্তমানে এদেশেও সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির দোসরদের সহায়তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এই অসম চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র–এর সাথে বিভিন্ন সমঝোতার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং কৌশলগত সম্পদ বিদেশিদের কাছে ইজারা দেয়ার চেষ্টা চলছে।
আমরা অবিলম্বে এসব গোপন ও অসম চুক্তি বাতিলের দাবি জানাই। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী যেকোনো চুক্তি জনগণ মেনে নেবে না। এসব চুক্তি বাতিল না করলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশে আরও বলা হয়, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে প্রগতিশীল যুব আন্দোলনের বিকল্প নেই। সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।

বক্তারা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় সকল অন্যায়, অসম ও গোপন চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং যুব বিদ্রোহের চেতনায় সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সংগঠনের সভাপতি শাহ আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক জাবেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক সুভাষ দে, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শংকর সাঁওজাল, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অপূর্ব সাহা প্রমুখ।
যুব সমাবেশ পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনা করেন সংগীত ভবন, পদ্ম নৃত্যকলা একাডেমি, লোকজ গানের ব্যান্ড দল সরলা।

সমাবেশ থেকে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের দিন ১৮ই এপ্রিলকে জাতীয় যুব দিবস ঘোষণা করা এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক জালালাবাদ পাহাড়টি সেনাবাহিনী থেকে অধিগ্রহণ করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার এবং সেখানে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার দাবি জানানো হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের প্রকৃত ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্তসহ যুব বিদ্রোহের মহানায়কদের স্মরণে নগরীর প্রধান প্রধান সড়কের নামকরণ করারও দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, ‘বর্তমানে পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক শোষণ ও লুটপাটের রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব হচ্ছে। দেশের যুব সমাজ আজ সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার। ভোগবাদিতা ও অবক্ষয়ের এই সময়ে তরুণদেরই চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের চেতনা ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে শোষণ বৈষম্য মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৩০ সনের ১৮ এপ্রিল অপার সাহস ও মাতৃভূমির প্রতি অসীম কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়ে বিপ্লবী মহানায়ক, অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে একদল অসম সাহসী যুবক চট্টগ্রামকে ৪ দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করেছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী যুব বিদ্রোহের অনুপ্রেরণাই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছিল। সূর্যসেনের নির্দেশে চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা সেদিন দামপাড়া পুলিশের অস্ত্রাগার ও পাহাড়তলী অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার দখল করেন। টেলিফোন ভবনের টেলিফোন বোর্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ করে পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে দেন। বিপ্লবীরা ধূম ও লাঙ্গলবন্দ রেলস্টেশনের নিকটবর্তী রেললাইনের ‘ফিসপ্লেট’ তুলে ফেলেন এবং টেলিগ্রাফের তার কেটে দেন। বিদ্রোহের আগে ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুর অত্যাচার হতে দেশকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিপ্লবীরা ইশতেহার বিলি করেন। অভ্যুত্থান শেষে বিপ্লবীরা দামপাড়া পুলিশ অস্ত্রাগার মাঠে সমবেত হয়ে অস্থায়ী সরকার ঘোষণা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনকে ‘গার্ড অব অনার’ দেন। এ অভ্যুত্থানই ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’ হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত রাখার শেষদিন, ২২ এপ্রিল পাহাড়তলীর জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সৈনিকদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী ৫৮ জন বিপ্লবীর মধ্যে ১১ জন শহীদ হন এবং ৮০ জন ব্রিটিশ সেনা মারা যান।


