বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

আগামীর বাংলাদেশ ও নির্বাচনী ভাবনা

মোহাম্মদ ইউসুফ *

- Advertisement -

- Advertisement -shukee

স্বাধীনতা অর্জনের ৫৩বছর পরও বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের স্বাদ প্রত্যাশানুযায়ী পায়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনীতিতে সুস্থ ধারায় বিঘ্ন ঘটায় গণতন্ত্র ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। বিগত সময়ে শাসকেরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণকে শাসনের নামে শোষণই করেছেন। চলেছে এক ব্যক্তি,গোষ্ঠী ও একদলের শাসন। সমাজকে,মানুষের কাজ ও চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। গড়ে ওঠনি স্থায়ী নির্বাচনপদ্ধতি। নিশ্চিত হয়নি সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার;ন্যায়নীতি-সাম্য ও বাক্-স্বাধীনতা। স্বাধীনতার স্থপতি,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে লক্ষ্য–উদ্দেশে দেশ স্বাধীন করেছিলেন-তা এখনো পূরণ হয়নি। তবে এখন সময় এসেছে,পাঁচদশকের রাজনীতির সফলতা ও ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জনস্বার্থে রাষ্ট্রপরিচালনার জন্যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা। প্রবর্তন করা স্থায়ী নির্বাচন পদ্ধতি। চলমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে অবাধ,সুষ্ঠু ও দলনিরেপক্ষ সরোপরি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে রাষ্ট্রসংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। এ বছরের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ করে বিশেষকরে নির্বাচনপদ্ধতি চূড়ান্ত করে আগামী বছরের শুরুতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি রোডম্যাপ জাতির সামনে তুলে ধরা জরুরি প্রয়োজন।

নির্বাচনী তফসিল

জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের জন্যে দেশে গতানুগতিক যে তফসিল অনুসরণ করা হয়, তা পরিবর্তন করতে হবে। একজন নাগরিককে নির্বাচনে প্রার্থী হতে প্রচলিত অপ্রয়োজনীয়সব নিয়মকানুন কেন পালন করতে হবে- তা বোধগম্য নয়। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার নিয়ম-কানুন হবে অত্যন্ত সহজ-সরল। যেকোনো ভোটারই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন। প্রার্থী উম্মাদ.ঋণখেলাপী, চোর-ডাকাত যা-ই হোক না কেন- তা দেখার দায়িত্ব তো নির্বাচন কমিশনের নয়;সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা মূল্যায়ন করবে ভোটারেরা।

দলীয় মনোনয়ন

বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে। অবশ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিধান আছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের অনুগত সতীর্থদের (নেতাদের) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন। প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতার চেয়ে দল ও নেতার প্রতি কতোটা অনুগত ও বাধ্য তা-ই বিবেচনা করা হয়। টাকার বিনিময়েও দলীয় মনোনয়ন দেয়ার অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে। এতে করে দলের যোগ্য নেতাদের অনেকেই নির্বাচন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ভোটারদের বাধ্য হয়ে মন্দের ভালো প্রার্থী বেছে নিতে হয়। যোগ্য ও গুণগত জনপ্রিয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রার্থীতা সকলের জন্যে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। দলীয় হাইকমান্ডের অনুমতি নিয়ে দলের অনুসারী যেকেউ নির্বাচন করতে পারবে। এতে করে প্রার্থীর সংখ্যা অনেক কমে যাবে। সার্বিকভাবে যোগ্য ও জনগণের মধ্যে পরিচিতি ও গ্রহণয়োগ্যতা না থাকলে কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সাহস করবে না। প্রার্থী তারা-ই হবেন, যারা আসলেই যোগ্য ও নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা রাখেন। এর মাধ্যমে গুণগত নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে। নির্বাচনে থাকবে না বিভিন্নভাবে প্রভাববিস্তার ও টাকার ছড়াছড়ি।

প্রচলিত নির্বাচনী প্রচারপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রার্থীদের পোস্টার-লিফলেটসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর দায়িত্বে থাকবে নির্বাচন কমিশন। সংসদীয় এলাকার সুবিধাজনক স্থানে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে স্থানীয় প্রশাসন একটি নির্বাচনী সভার আয়োজন করবে। নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় চিন্তিত ছিলেন। তিনি বোঝতে পেরেছিলেন,এ প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিতে সত্যিকারের ভালো মানুষেরা খুব কমই জিতে আসতে পারবেন, যত জনপ্রিয় হোন না কেন। তাই, তিনি এমন একটি পদ্ধতির চিন্তা করেছিলেন, যেখানে নির্বাচনের সব খরচ বহন করবে রাষ্ট্র।নির্বাচন কমিশন সব প্রার্থীর জন্যে অভিন্ন একটি পোস্টার ও সবার পরিচিতি দিয়ে সম্মিলিত একটি লিফলেট ছেপে দেবে।প্রতিটি ওয়ার্ড কিংবা ইউনিয়নে জনসভার মঞ্চ তৈরি করার দায়িত্বও কমিশনের। অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা শুধু তাদের জন্যে নির্ধারিত সময়ে বক্তৃতা করবেন অথবা বিতর্কে অংশ নেবেন।

১৯৭৫ সালে সর্বদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাকশাল প্রবর্তিত হলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং তার কিশোরগঞ্জের আসনটি খালি হয়।সেই আসনে তাঁর আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন আশরাফ মাস্টার।আওয়ামী লীগের একজন শক্তিশালী নেতার বিরুদ্ধে একজন স্কুলমাস্টার জয়ী হয়ে আসেন কোনো টাকা খরচ না করেই। কুষ্টিয়ার আরেকটি উপনির্বাচনেও একই বাস্তবতা দেখা দিয়েছিল ।

সংবিধানের আমূল সংশোধন

ত্রিশলাখ শহিদ ও ২লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-বাংলাদেশ পরিচালনার জন্যে যে সংবিধান রচিত হয়েছে, তা জনবান্ধব নয়। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ বলা হলেও তা কাগজে-কলমে সীমিত। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন-ভাতা দেয়া হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, রাষ্ট্রের মন্ত্রী-এমপি ও সরকারি কর্মকর্তারা দেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিক আর সাধারণ মানুষ হলো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। নাগরিকেরা যাদের প্রতিনিধি করে সংসদে পাঠায়,সংবিধানে তাদের ক্ষমতা খর্ব করে রাখা হয়েছে। তারা সত্য কথা বলতে পারেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পাঠ করলে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেঃ “নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- ক. উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন অথবা খ. সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।”এক্ষেত্রে জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের সংবিধানের বাংলা অংশটি সহজ-সরল ভাষায় লেখা হয়নি। সাধু ভাষায় রচিত সংবিধানকে প্রচলিত ভাষায় (চলতি ভাষায়) রূপান্তর করতে হবে। বর্তমানে সংবিধানের ধারা-উপধারা পড়ে পাঠককে বোঝতে অনেক কষ্ট হয়। তাই সময় এসেছে,সংবধিানের যেসব ধারা-উপধারা জনস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক তা বাতিল করে সংবিধানকে জনবান্ধব করা।

আমাদের সংবিধানের চার মূলননীতির অন্যতম হলো গণতন্ত্র।গণতন্ত্র বলতে কোনো জাতি-রাষ্ট্রের (অথবা কোনো সংগঠনের) এমন একটি শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে। সত্যিকার গণতন্ত্র দীর্দিন নির্বাসিত। তাই,গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবী।

এখন যা করা দরকার

দেশের বিদ্যমান শাসনকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর এখনি মোক্ষম সময়। এমনকিছু মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে আগামীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা না যায়। জাতীয় স্বার্থে এখন যেসব পদক্ষেপ নেয়া জরুরিঃ

১.সংবিধানকে জনবান্ধব করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দুস্পরিবর্তনীয় করতে হবে।

২. নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন করা ও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে।

৩.দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন করতে হবে।

৪.প্রধান বিরোধীদলের ছায়া মন্ত্রিসভা থাকা বাধ্যতামূলক করা এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ রাখতে হবে।

৫.সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন বাতিল করে ৩০শতাংশ নারীকে মনোনয়ন প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের বিশেষ একজনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্তৃত্বের অবসান করতে হবে।

৭.আমলাতন্ত্রে নিয়োগের ক্ষেত্রে সাক্ষাতকারগ্রহণ পদ্ধতি বাতিল করে লিখিত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নিয়োগদান করতে হবে।

৮. স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে সংসদ-সদস্যদের (আইনপ্রণেতাদের) কাজ শুধু আইনপ্রণয়নে সীমিত রাখা। নির্বাহী ও উন্নয়ন কার্ক্রমে তাঁদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এছাড়া তাদের করবিহীন গাড়ি ক্রয়, স্বেচ্ছাধীন তহবিল প্রদান বন্ধসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা আরও কমাতে হবে। এছাড়া সংসদে দুবারের বেশি কেউ প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না- এ নিয়ম চালু করতে হবে।

৯. সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করা এবং বিরোধীদলীয় সংসদ-সদস্যদের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা।

১০. আমলাতন্ত্রে ক্ষমতার সার্ক বিকেন্দ্রীকরণের রূপরেখা প্রণয়ন করা। স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের কার্যপরিধি পুননির্ধারণ করতে হবে।

১১.আইন,বিচার ও শাসনব্যস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা।

১২. একই ব্যক্তি যাতে একই সাথে সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী),দলীয়প্রধান ও সংসদনেতা থাকতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

১৩. দেশে গণতন্ত্র আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রচর্চা করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় একটি রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। এক ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক থেকে দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই,দেশের সার্ক উন্নয়নের জন্যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও