একসময় চট্টগ্রামকে বলা হতো খাল-নদীর শহর। পাহাড়, নদী, সাগর আর অসংখ্য খাল ঘিরে গড়ে ওঠা এই বন্দরনগরী ছিল প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো,আজ সেই খালগুলোর অধিকাংশই আবর্জনা, পলিথিন, দখল ও দূষণের ভারে মৃতপ্রায়। যেসব খাল একসময় জোয়ার-ভাটার স্রোতে জীবন্ত ছিল, আজ সেগুলো থেকে বের হয় দুর্গন্ধ; জলাবদ্ধতায় ভোগে নগরবাসী; পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য পড়ে ভয়াবহ ঝুঁকিতে।
অথচ বিশ্বের বহু দেশে খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনীতি, পর্যটন, পরিবেশ ও নগরজীবনের সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিদেশের অনেক খাল দেখলে মনে হয় যেনো বিস্তীর্ণ কোনো নীল হ্রদ। অথৈ জলরাশি, চোখ জুড়ানো সবুজ, ছোট ছোট দ্বীপ, নানা প্রজাতির পাখি, রঙিন মাছ আর জলকেন্দ্রিক মানুষের জীবন, সব মিলিয়ে যেনো এক জীবন্ত প্রকৃতির কাব্য। কৃত্রিমভাবে সংরক্ষণ ও পরিকল্পনা করা হলেও সেগুলো এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে মনে হয় প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে সাজিয়েছে।
খালের বুকে চলে স্পিডবোট, ওয়াটার ট্যাক্সি কিংবা ছোট ছোট নৌকা। সন্ধ্যার আলো জলে পড়ে সৃষ্টি করে মোহনীয় পরিবেশ। পাখির কলতানে সকাল শুরু হয়, পর্যটকের আনাগোনায় প্রাণবন্ত থাকে চারপাশ। এসব খাল কেবল জলপথ নয়,একটি শহরের সংস্কৃতি, পরিবেশ ও অর্থনীতির অংশ।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।
চট্টগ্রামের অধিকাংশ খাল আজ আবর্জনায় ভরা। প্রতিদিনের বাসাবাড়ির বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন ও নর্দমার ময়লা জমে খালগুলো অনেকাংশে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। খালের পাশে বসবাসকারী মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ সহ্য করতে হয়। ঘরে অতিথি এলে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নাগরিকরা নিয়মিত সিটি কর্পোরেশনকে কর দিলেও অনেক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা সেবা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায় না।
এটি শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়; এটি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু অভিযোজন ও নগর ব্যবস্থাপনার বড় সংকট।
বিশ্ব থেকে শেখার সুযোগ:
বিশ্বের অনেক শহর তাদের খালকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতি ও পর্যটনে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের এ্যামেস্টারডাম শহরের খালগুলো আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সেগুলো শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং নগর পরিবহন ও পর্যটনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
ইতালির ভ্যানিস শহরে খালই প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা। লাখো পর্যটক শুধু জলনির্ভর সেই জীবনযাত্রা দেখতে সেখানে ভিড় করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডুবাই শহর কৃত্রিম খাল ও ওয়াটারফ্রন্ট উন্নয়নের মাধ্যমে মরুভূমিকেও দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিয়েছে।
এমনকি এশিয়ার অনেক দেশেও খাল সংস্কার করে পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে চট্টগ্রামেও তা সম্ভব।
চট্টগ্রামের খালগুলোকে কীভাবে রূপান্তর করা যেতে পারে:
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়রের প্রতি বিনীত অনুরোধ,খালগুলোকে শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নয়, বরং ‘নগর সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
নিম্নোক্ত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রামের চিত্র বদলে যেতে পারে,
১. খাল সম্পূর্ণ আবর্জনামুক্ত করা
নিয়মিত ড্রেজিং, বর্জ্য অপসারণ ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের মাধ্যমে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।
২. আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রতিটি ওয়ার্ডে কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ খালে ময়লা ফেলতে বাধ্য না হয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. স্লুইসগেট বা গেট ভাল্ব ব্যবস্থা
সাগর বা নদীর মুখে আধুনিক স্লুইসগেট স্থাপন করে জোয়ার-ভাটার পানি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে খালে স্বচ্ছ পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে।
৪. জলপথ চালু করা
যেখানে সম্ভব সেখানে ছোট নৌকা, ওয়াটার বাস বা স্পিডবোট চালুর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এতে যানজট কমবে এবং বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হবে।
৫. খালভিত্তিক পর্যটন জোন
খালের দুই পাশে হাঁটার পথ, ফুলের বাগান, বসার স্থান, সৌন্দর্যবর্ধন ও আলোকসজ্জা করা গেলে এটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।
৬. জীববৈচিত্র্য ও মাছের চাষ
পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়া, জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও পাখির আবাস তৈরি করা গেলে খালগুলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

৭. এনজিও ও প্রযুক্তিবিদদের সম্পৃক্ততা
পরিবেশবাদী সংগঠন, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী ও এনজিওদের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘চট্টগ্রাম খাল পুনর্জীবন প্রকল্প’ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৮.নগরীর সৌন্দর্যায়ন, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ, উন্মুক্ত স্থান, পাহাড় ও জলাশয় সংরক্ষণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে IAB, BIP, IEB, BAPA, BELA, REHAB, YPSA এবং বিভিন্ন নাগরিক ফোরাম এর মতামত,পরামর্শ ও সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
৯.নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি নগরের প্রত্যেকটি মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে যাতে একজন নাগরিকও খালের মধ্যে আবর্জনা না ফেলে।
এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা ও সামাজিক সংগঠন,স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা,মসজিদ, মন্দিরের মাধ্যমে সেমিনার সিমোজিয়ামসহ সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
খালের পাশে সিসিটিভি ক্যামরা স্থাপন করলে দোষীদের সহজে সনাক্ত করা যাবে এবং আইনানুযায়ী জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্তের:
চট্টগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক বন্দরনগরী। অথচ এই শহরের প্রাণপ্রবাহ খালগুলো আজ অবহেলায় মৃতপ্রায়। নগর উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন নির্মাণ নয়; একটি পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলাই প্রকৃত উন্নয়ন।
খালভিত্তিক পর্যটন, ওয়াটার ট্যাক্সি, নৌবিহার, ওয়াকওয়ে, সাইকেল ট্র্যাক, ফুলের বাগান ও সবুজ করিডর তৈরির মতো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সিডিএ, চসিক,বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ,পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পরিবেশ অধিদপ্তর হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়নকারী সংস্থা। তাই এদের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আজ যদি আমরা খালগুলোকে বাঁচাতে পারি, তাহলে শুধু জলাবদ্ধতা কমবে না,চট্টগ্রাম পাবে নতুন সৌন্দর্য, নতুন পর্যটন সম্ভাবনা, নতুন পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ।
একদিন হয়তো চট্টগ্রামের খালের পাশেও মানুষ দাঁড়িয়ে বলবে,
‘নীল জলরাশি বিস্তৃত চাদর,
জলের আয়নায় মেঘের রঙিন ছায়া।
খালের বুকে ভাসে জীবনের গান,
প্রকৃতি যেনো মেলে দিয়েছে তার মায়া।’
চট্টগ্রামের খালগুলোকে ঘিরে সেই স্বপ্ন বাস্তব হোক, এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক

