চট্টগ্রাম ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের নগরী। এই নগরীর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ; ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি আজকের কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোরদের একটি অংশ দলবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, মাদক, অস্ত্র বহন থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত এর বিস্তার। এতে একদিকে কিশোরদের প্রাণ যাচ্ছে, অন্যদিকে আরও অনেক কিশোর অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে।
কারণ ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন নয়। একের পর এক প্রাণহানি প্রমাণ করছে, এ সমস্যা শহর থেকে মফস্বল, গ্রাম নানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী আর অভিযুক্ত, দুই পক্ষেই এখন কিশোর। এই মুহূর্তে সমাজ যদি শুধু আতঙ্ক আর সমালোচনায় থেমে থাকে, তাহলে প্রতিটি ঘটনা কেবল একটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে যেতে পারে। অথচ প্রতিরোধের সুযোগ এখনো আমাদের হাতে আছে। এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়। উদ্দেশ্য হলো পরিবার, বিদ্যালয়, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সমাজকে একসঙ্গে ভাবতে ডাকা।

প্রসঙ্গত: কয়েকটি মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ করছি:
২০১৮ সালে জামালখান এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান ইসফারকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়। কিশোর গ্যাং-এর অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ঘটা এই ঘটনা সম্ভবত চট্টগ্রামে বিষয়টি নিয়ে প্রথম ব্যাপক জনআলোচনার জন্ম দেয়।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাকির হোসেন (সানি) ছুরিকাঘাতে নিহত হন। মামলার তদন্তে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে।
২০২২ সালে ব্যস্ত চেরাগী মোড়ে কলেজছাত্র আসকার বিন তারেক ছুরিকাঘাতে নিহত হয়।
আগ্রাবাদে ১৭ বছর বয়সী নুরুল আজিমকে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি কিশোর-তরুণ দলের সংঘবদ্ধ হামলার পর ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পুলিশ একে পূর্ববিরোধের জের বললেও পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা স্থানীয় কিশোর গ্যাং-এর সঙ্গে যুক্ত।
হালিশহরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের বিরোধে ১৮ বছর বয়সী কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ছুরিকাঘাত ও মারধরের শিকার হন এবং ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান। তদন্তে পুলিশ একে গ্যাং-দ্বন্দ্বের ফল বলে নিশ্চিত করে।
২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল কর্ণফুলী নদী থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ১২ বছরের রাহাত ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিকল্পিতভাবে মারধর করে নদীতে ফেলে দেয়ার অভিযোগে তার চার সহপাঠীকে আটক করা হয়।
২০২৬ সালে সাতকানিয়ায় আধিপত্য বিস্তার ও ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ১৯ বছর বয়সী তাহমিদুল হাসান হামীমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতালা এলাকায় কিশোর গ্যাং-এর ছুরিকাঘাতে হৃদয় নামে এক কিশোর নিহত হয়।
প্রতিটি ঘটনার আইনি ও তদন্তগত নিজস্ব বাস্তবতা আছে। কে দোষী, প্রকৃত কারণ কী, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া, যাকে যথাযথ সম্মান জানানো জরুরি। তবে সবগুলো ঘটনা মিলিয়ে যে বার্তা পাওয়া যায়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিশোররা আজ সংঘবদ্ধ সহিংসতার শিকার ও কুশীলব দুই ভূমিকাতেই জড়িয়ে পড়ছে।
কেন কিশোররা এই পথে যাচ্ছে? একজন কিশোর হঠাৎ অপরাধী হয়ে ওঠে না। তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ, পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবহ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় অপরাধী চক্রের প্রভাব, সবই তার মানসিকতা গড়ে দেয়। তাই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে মূল কারণগুলো চোখের আড়ালে থেকে যায়।
দ্রুত নগরায়ণ ও ব্যস্ততার কারণে অনেক পরিবারে বাবা, মা, অভিভাবকদের সন্তানের জন্য সময় ও মনোযোগ কমছে। একাকিত্ব, অবহেলা বা পারিবারিক দূরত্বে বেড়ে ওঠা কিশোর সহজেই এমন গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকে পড়ছে; যেখানে ক্ষমতা প্রদর্শন, ভয় সৃষ্টি ও আধিপত্য বিস্তারকে মর্যাদা মনে করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই দলই হয়ে ওঠে তার পরিবার ও পরিচয়ের বিকল্প।
প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই বাস্তবতার অংশ। প্রযুক্তি নিজে অপরাধের কারণ নয়; তবে সহিংসতা, অস্ত্র প্রদর্শন ও অপরাধকে ‘রোমাঞ্চকর’ হিসেবে তুলে ধরা কনটেন্ট কিশোরমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ডিজিটাল নৈতিকতার শিক্ষা এখন সময়ের দাবি।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, আমাদের শহর কিশোরদের জন্য কতটা ইতিবাচক পরিসর তৈরি করছি। খেলার মাঠ কমছে, পাঠাগার ও পাঠচক্রের সংকট বাড়ছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল বিনোদনের সুযোগ দিন দিন সীমিত হচ্ছে। কিশোরদের শক্তি ইতিবাচক কাজে ব্যবহারের সুযোগ না পেলে সেই শূন্যস্থান অন্য কোনো গোষ্ঠী দখল করে নেবেই।
এর সমাধান শুধুমাত্র শাস্তিতে হতে পারে না। অপরাধ ঘটলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। কিশোরদের বয়স, বিকাশ ও সংশোধনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে, যেন একটি ভুলে একটি জীবন পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে যায়। প্রতিরোধ, আইন প্রয়োগ, কাউন্সেলিং, সংশোধন ও পুনর্বাসন, সবকিছুকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
যেমন:
পরিবার: সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী করে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্টে যুক্ত হচ্ছে সেসব বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার। নজরদারি যেন কেবল শাসনে সীমাবদ্ধ না থাকে। সন্তানের কথা শুনতে হবে, তার ভয়, হতাশা ও স্বপ্ন বুঝতে হবে। আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, পড়াশোনায় অনীহা, অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব বা আগ্রাসী মনোভাব দেখা দিলে ভালোবেসে সময় দিয়ে এবং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে সমাধান দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়। বিদ্যালয় ও কলেজ হতে হবে নৈতিকতা, মানবিকতা, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ শেখার জায়গা। নিয়মিত কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, পাঠচক্র, বিজ্ঞানচর্চা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম,নেতৃত্ব বিকাশ এবং জীবনদক্ষতা বিষয়ক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের শনাক্ত করে প্রয়োজনে কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্থানীয় উদ্যোগ: পাড়া-মহল্লাভিত্তিক খেলার মাঠ,কিশোর ক্লাব, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিচর্চার সুযোগ বাড়াতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলো পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করতে হবে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: কিশোররা অপরাধী চক্রের হাতিয়ার হচ্ছে কি না, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের উৎস কোথায়, কারা কিশোরদের অপরাধে জড়াচ্ছে, এসকল বিষয়ে কার্যকর নজরদারি দরকার। কিশোরদের দিয়ে অপরাধ করানো বা তাতে পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রে সংশোধন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যম: কিশোর অপরাধের সংবাদে চাঞ্চল্যের পাশাপাশি সামাজিক কারণ ও প্রতিরোধের পথও তুলে ধরা উচিত। কোনো কিশোরের অপরাধকে এমনভাবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়, যাতে তা তার কাছে গৌরবের বিষয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কে খেলায় সাফল্য পেল, কে বিজ্ঞানচর্চা করছে, কে বই পড়ছে, কে মানুষের পাশে দাঁড়াল এসব ইতিবাচক গল্পও সামনে আনতে হবে।
কিশোর গ্যাং কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও হতে হবে সম্মিলিত উদ্যোগে। জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষক, অভিভাবক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সাংবাদিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সমাজের প্রত্যেক দায়িত্বশীল মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধুমাত্র অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না; অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
একজন কিশোরের হাতে ছুরির চেয়ে বই অনেক বেশি অর্থবহ। অপরাধের আড্ডার চেয়ে খেলার মাঠ তার বেশি দরকার। ভয় সৃষ্টির চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা তার ভবিষ্যৎকে বেশি আলোকিত করে। প্রতিটি কিশোরের মধ্যে অপরাধের ঝুঁকি থাকতে পারে, তার চেয়েও বড় সম্ভাবনা আছে একজন ভালো মানুষ, দক্ষ কর্মী ও মানবিক নেতা হয়ে ওঠার।
তাই এই ঘটনাগুলোকে কেবল ভয় বা শাস্তির চোখে না দেখে এগুলোকে পড়তে হবে সামাজিক সংকেত হিসেবে। কোথায় পরিবার দুর্বল হচ্ছে, কোথায় কিশোর একা হয়ে পড়ছে, কোথায় খেলাধুলা ও পাঠাভ্যাসের সুযোগ কমছে, কোথায় মাদক ও অপরাধী চক্র তাদের টেনে নিচ্ছে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ আজকের কিশোরই আগামী দিনের চট্টগ্রাম; একজন কিশোরকে অন্ধকারে হারানো মানে হারানো একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং সমাজের একটি সম্ভাবনা। তাই এখন সময় কিশোরদের পাশে দাঁড়ানোর; ভয় দেখানোর নয়, আস্থা ফিরিয়ে দেয়ার; অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার নয়, আলোর পথ দেখানোর। চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের অন্ধকার থেকে সম্ভাবনার আলোয় ফেরার সময় এখনই—আজকের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে আগামী দিনের চট্টগ্রামকে আরও নিরাপদ, মানবিক ও সম্ভাবনাময় করে তুলতে।
লেখিকা: সামাজিক উন্নয়ন সংগঠক

