চট্টগ্রামের উপকণ্ঠ সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল, সেটার একটা নমুনা হচ্ছে জঙ্গল সলিমপুর। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর একমাসের মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী কার্যক্রম লক্ষ্য করেছি। চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর বাসভবনে সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত হয়ে গালিগালাজ এবং চাঁদা আদায়ের ঘটনার পর বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে নিই। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তাদের অভয়ারণ্য নষ্ট করতে হবে। জঙ্গল সলিমপুর আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এলাকা বা অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই এলাকায় পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
আজ রবিবার (৩১মে) সকালে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন।

পরিদর্শনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ভূমিপ্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দিন, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী,পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের আশপাশে বেতুয়া ও চা–বাগান নামে দুটি পাহাড়ি এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায়ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনার তথ্য পেয়েছে সরকার। ফলে শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, আশপাশের এলাকাগুলো থেকেও সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘পরিকল্পিত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, সারা দেশেই মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নির্মূলের চেষ্টা করা হবে।’
বিদ্যমান জুয়া আইন দিয়ে বর্তমান সময়ের অনলাইন–নির্ভর ও আধুনিক পদ্ধতির জুয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আইনটি দুর্বল হওয়ায় এসব কার্যক্রম কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। এ কারণে আগামী সংসদ অধিবেশনে নতুন আইন বা সংশোধনী আনার চেষ্টা করা হবে।’ মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। বর্তমানে বহু মাদক মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।’
কিশোর গ্যাং দমনে আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং তারা ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয়ে আইন সংস্কার করা হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি এই এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। সেই ঘটনার পর গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের একটি যৌথ অভিযানে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন এবং আলীনগরে একটি অস্থায়ী যৌথ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
সর্বশেষ গত ২৪ মে দিবাগত গভীর রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নেতৃত্বে কয়েকশ সশস্ত্র অপরাধী ভারী বুলডোজার নিয়ে সেই যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পথ রুদ্ধ করতে ভেতরের সড়ক কেটে বড় বড় গর্ত করে রাখে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক গুলিবিনিময়ের পর হামলাকারীরা পাহাড়ের গভীরে পালিয়ে যায়। এই হামলার ঘটনায় গত ২৬ মে সীতাকুণ্ড থানায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় ৩০০ অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মামলা হয়।


