মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

বাঙালির প্রাণের দিন পহেলা বৈশাখ

ঢাকা প্রতিনিধি

জীবনযুদ্ধে নানা অস্থিরতা আর অপ্রাপ্তি, আশা-নিরাশার দোলাচল- সব কিছু ভুলিয়ে দিয়ে আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে উড়ায়ে দিতে, পুরনো বছরের আবর্জনা দূর করতে এসেছে নতুন দিন। দুঃখ-কষ্ট ভুলে, হতাশা-গ্লানি মুছে সবাই নবরূপে আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত হবে ।

- Advertisement -

আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হবে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের যাত্রা। বাংলা নববর্ষ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের দিন নয়, এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণের দিন।

- Advertisement -shukee

প্রতি বছর ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের ঢল নামে রাজধানীর রমনা উদ্যানে। সূর্যের প্রথম কিরণে শুরু হয় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও প্রায় দুই শ শিল্পীর অংশগ্রহণে সুর, বাণী ও ছন্দের এক অপূর্ব সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই আয়োজন। প্রকৃতি, মানবতা, দেশপ্রেম ও লোকজ জীবনের গান পরিবেশিত হবে।

এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীকে।

সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বিতর্ক এড়াতে এবার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হলেও এর প্রাণবন্ততা ও তাৎপর্যে কোনো ঘাটতি নেই।

শোভাযাত্রার রুট: চারুকলা অনুষদের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর ঘুরে পুনরায় চারুকলায় ফিরে এসে শেষ হবে। এ বছরের স্লোগান: ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। পাঁচটি প্রধান মোটিফ- মোরগ (নতুন দিন, শক্তি), বেহালা (সৃজনশীলতা), পায়রা (শান্তি), হাতি (গৌরব) ও ঘোড়া (গতিময়তা)।

৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’ ও বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান শোভাযাত্রাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। প্রায় দুই শ শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করে শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে। আজ মূল আয়োজন হবে জাতীয় নাট্যশালায় বিকেল ৩টায়। থাকবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, শতকণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনা, কবিগান, গম্ভীরা ও বাউল গানের আসর।

পরবর্তী দিনগুলোতে থাকছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা, অ্যাক্রোব্যাটিক প্রদর্শনী, ‘জাতি বৈচিত্র্যে বৈশাখী উৎসব’ এবং পুতুলনাট্য। সমাপনী দিনে নৃত্য, লোকসংগীত, ব্যান্ডসংগীত ও তারকা শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি প্রদর্শিত হবে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’।

ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ’। ভোর ৫টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীরা অংশ নেবেন। একই সঙ্গে সেখানে বসেছে বৈশাখী মেলা, যেখানে মাটির তৈরি খেলনা, তৈজসপত্র, লোকজসামগ্রী এবং নাগরদোলাসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও সারা দেশের জেলা-উপজেলায় বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসী ও বিশ্বের সব বাংলাভাষী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পহেলা বৈশাখকে জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক উল্লেখ করে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। এটি ‘ফসলি সন’ থেকে ‘বঙ্গাব্দে’ রূপান্তরিত হয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

পাকিস্তান আমলে পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনা বটমূলে প্রভাতী অনুষ্ঠান ছিল তৎকালীন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বাঙালির জাতিসত্তা পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে শুরু হওয়া শোভাযাত্রা অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

২০১৬ সালে ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়- যা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

পহেলা বৈশাখ শুধু দিন নয়, আবেগের নাম। পুরনো অভিযোগ ভুলে, সব বাধা পেরিয়ে নতুন প্রতিজ্ঞায় পথচলার নাম। আজ বাঙালির প্রাণের দিন। ঘরে ঘরে উৎসব। দেশপ্রেম আর বাঙালিয়ানার এক অনবদ্য মেলবন্ধন পহেলা বৈশাখ।

চট্টগ্রামে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান

এদিকে নানা অনুষ্ঠানমালায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিলে শুরু হয়েছে বাংলা নববর্ষের বর্ষবরণ আয়োজন। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবার ডিসি হিলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। একই সঙ্গে নগরীর সিআরবির শিরীষতলাতেও পৃথক আয়োজনে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ডিসি হিলে বর্ষবরণের আয়োজন নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’-এর মতপার্থক্য দেখা দিলে সংস্থাটি প্রথমে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান করার ঘোষণা দেয়। তবে সেখানে পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় এবং কয়েক দফা আলোচনার পর তারা ডিসি হিলের আয়োজনে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আয়োজক হিসেবে থাকছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

এছাড়া সিআরবির শিরীষতলায় বরাবরের মতো বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ‘সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’। এ আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব।

এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষে সার্কিট হাউজ থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে আলপনা আঁকা হয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, যা নগরীতে এই প্রথম এত দীর্ঘ আলপনা।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় জমবে ডিসি হিলঃ

ডিসি হিলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রায় অর্ধশত সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেবে। দিনব্যাপী সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি বিকেলে চিশতি বাউল সংগীত পরিবেশন করবেন।

১৯৭৮ সাল থেকে ডিসি হিলে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ।

শিরীষতলায়ও বর্ষবরণের আয়োজনঃ

অন্যদিকে সিআরবির শিরীষতলায় ২দিনব্যাপি বর্ষবিদায় অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার বিকেল ৩টা থেকে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

আজ মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়েছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। দিনব্যাপী এ আয়োজনে অংশ নেবে ৬২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন।

নগরজুড়ে আরও আয়োজনঃ

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনও পৃথক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ চট্টগ্রাম দুই দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন, সংগীত পরিবেশনা ও গীতি-নৃত্য আলেখ্য।

এছাড়া বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে ‘বোধন বর্ষবরণ উৎসব ১৪৩৩’ আয়োজন করেছে। সেখানে আবৃত্তি, সংগীত, যন্ত্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেবে ২৪টি সংগঠন।

নগরীর পাথরঘাটায় সেন্ট প্ল্যাসিডস স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণেও শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্বালন, সমবেত সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হবে।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও