১০ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৪শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা   বিদেশি জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়ার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই নতুন করে এসেছে চট্টগ্রামে বেসরকারি আইসিডির চার্জ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মাশুল বাড়ার ঘোষণা। এদিকে কারখানায় উৎপাদন বাড়লেও বাড়তি খরচ ও পণ্যের দাম না বাড়ায় দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি এই চার ধরণের বাড়তি খরচের বোঝা বইতে গিয়ে লোকসানে পড়ে বিপুল কার্যাদেশের মধ্যেও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত পণ্য দ্রুত ডেলিভারি নিতে বেশ কযেক বছর ধরে ১৯টি প্রাইভেট আইসিডি ব্যবহার করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে সম্প্রতি আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ে ২৩ শতাংশ হারে চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে বেসরকারি আইসিডি মালিকরা। এদিকে ১৫টি সেবার বিপরীতে বিভিন্ন উপখাতে ৩৩ থেকে ৪৮৮ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বাড়াতে চায় কর্তৃপক্ষ। তবে বন্দরের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক ও দুঃখজনক বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধি, নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন ও সেবার মান বাড়ার কারণে মাশুল বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে দাবি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের।

পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) এক প্রকার গায়ের জোরেই আইসিডি চার্জ বাড়িয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। পাশাপাশি বন্দরের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা প্রয়োজন। কারণ করোনাকালীন সময় থেকে এক প্রকার লোকসানের মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ীরা কোনোমতে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রেখেছেন। করোনা কিছুটা স্বাভাবিক হবার পর কার্যাদেশ বাড়ার কারণে লাভের মধ্য দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। এরমধ্যে বৈশ্বিক প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে পাঁচ-ছয়গুণ বাড়তি জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়ার বোঝা বইছেন ব্যবসায়ীরা। তার উপর পণ্য জাহাজীকরণের আগে বাড়তি আইসিডি খরচ ও বন্দরের মাশুল বাড়ার বিষয়টি মরার উপর খরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার্যাদেশ বাড়লেও বিদেশি বায়াররা পণ্যের বাড়তি দাম দিতে চায় না। তার উপর পণ্যের কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন থেকে শুরু করে বায়ারের কাছে পাঠানো পর্যন্ত খরচ আগের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে গেছে। এরমধ্যে বাড়তি আইসিডি চার্জ ও বন্দরের মাশুল বাড়ানো হলে অনেক ব্যবসায়ী খরচ সামলাতে না পেরে লোকসানে পড়বে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ারও উপক্রম হবে।

২৩ শতাংশ হারে চার্জ বাড়ানোর কারণে বেসরকারি আইসিডিতে বর্তমানে ২০ ফুট সাইজের রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৯৫২ টাকা বেড়ে ৫ হাজার ৯২ টাকা ও ৪০ ফুট সাইজের রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডালিংয়ে ১২শ’ ৭০ টাকা বেড়ে ৬ হাজার ৭৯০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে ২০ ফুট সাইজের আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৩ হাজার ৩২৫ টাকা বেড়ে ১১ হাজার ২৫৫ টাকা খরচ হচ্ছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে বন্দরে ১৯৮৬ সালে নির্ধারণ করা নিয়মেই মাশুল আদায় করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তির সংযোজন করার কারণে বর্তমানে বন্দর ডিজিটালাইজড হয়েছে, নতুন নতুন যন্ত্রপাতি বসানোর কারণে বিভিন্ন খাতে সেবার মান বেড়েছে। তাই পানি সরবরাহ চার্জ, লিফট অন/লিফট অফ চার্জ (ঢাকা আইসিডি), লিফট অন/লিফট অফ চার্জ (চট্টগ্রাম বন্দর), রেফার কনটেইনার সেবা, বন্দরের স্থান ব্যবহার ভাড়া, কনটেইনার বোঝাই ও খালাস করা, বার্থিং-আনবার্থিং ফি, রিভার ডিউজ, পোর্ট ডিউজ, ঢাকার আইসিডিতে কনটেইনারের স্টোরেজ ভাড়া, ল্যান্ডিং অথবা শিপিং চার্জ, বার্থে অবস্থান, মুরিংয়ে অবস্থান ও পাইলটেজ ফি- এই ১৫টি সেবা খাতে মাশুল বাড়াতে চায় বন্দর সংশ্লিষ্টরা।

তাছাড়া মোবাইল হারবার ক্রেন ব্যবহার করে পণ্য ওঠানো-নামানো চার্জ, হারবার ক্রেন ভাড়া, হ্যাচ কভার হ্যান্ডলিং চার্জ, মোবাইল স্ক্যানার চার্জ ও খালি কনটেইনার অপসারণে মাশুল আরোপ করার প্রস্তাব দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম  বলেন, বন্দরে বেসরকারি আইসিডিতে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ে ২৩ শতাংশ হারে চার্জ বাড়ানোর বিষয়টি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। কারণ আইসিডি নীতিমালা অনুযায়ী তারা বাড়াতে পারেন না। এটা বাড়াতে হলে ট্যারিফ কমিটির সিদ্ধান্ত লাগবে। এটা নিয়ে আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। এটা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি আমরা। তারা চার্জ না কমালে আমরা আইনের আশ্রয়ও নিতে পারি। কারণ আমরা এখন এত বেশি খরচের চাপ সামলাতে পারব না। এভাবে খরচ বাড়লে অনেক কোম্পানি এ চাপ নিতে পারবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের কার্যাদেশ কমে যাবে। লোকসানে পড়ে অনেক মালিক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে বন্দর হচ্ছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তাদের কাজ সেবা দেয়া, ব্যবসা করা নয়। অথচ তারাও মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করে সমাধানের জন্য বিকডা ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিবো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ১৯৮৬ সালে নির্ধারণ করা নিয়মেই মাশুল আদায় করা হচ্ছে। তবে ওই সময়ের তুলনায় বর্তমানে সার্বিকভাবে বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে। তাই মাশুল বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন্দর। তবে মাশুল এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যাতে বন্দর ব্যবহারকারীদের কোন সমস্যা না হয়।1