২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ৮ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মো. শফিকুল  আলম খান  *

আজ ঊনত্রিশ অক্টোবর,২১২১ খ্রিস্টাব্দ। রোটারি  ক্লাব অব ইসলামাবাদের বত্রিশতম অভিষেক বেশ জাঁক-জমকের সাথে অনুষ্ঠিত  হচ্ছে।  সাফা আর্কেডে আয়োজিত আজকের  এ আনন্দঘন মুহূর্তে তুমি নেই।তাই, আজ বারে বারে তোমারই কথা মনে পড়ছে। মানসপটে প্রতিক্ষণে ভেসে ওঠছে তোমার  হাসিমাখা  সহজ সরল প্রতিচ্ছবি। তোমার অনুপস্থিতি হ্নদয়কে করছে দহন। বিষণ্নতায় ভরে যাচ্ছে মন। মনে হয়,এইতো তুমি আমাদের সাথেই আছ। তোমার  অশরীরি আত্মা আমাদের  চারদিকে ঘুরপাক করছে। তুমি মিশে আছ আমাদের  অস্থি মজ্জায়। আছ, আমাদের  মনের গভীর  থেকে গভীরতম স্থানে।

আমাদের  প্রিয় সংগঠন রোটারি  ক্লাব অব ইসলামাবাদের একত্রিশটি অভিষেক অনুষ্ঠান তোমাকে  সাথে নিয়ে উদযাপন  করেছি। প্রতিটা  অভিষেক  অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে  সব সাধারণ  বা প্রস্তুতি সভায়  শত ব‍্যস্ততার মাঝেও তুমি ঝটিকাবেশে  উপস্থিত  থাকতে।তুমি ছিলে আমাদের  ক্লাবের শিক্ষক ও মেন্টর। তুমি বলতে  Practice  makes man perfect  আরো বলতে, অভিষেক অনুষ্ঠানে যারা পারফর্ম করবে তাদেরকে অবশ‍্যই বারবার  রিহার্সেল দিতে হবে। প্রয়োজনে বাসায়  বা ওয়াসরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে  বক্তৃতার অনুশীলন  করতে হবে। এতে কেটে যাবে মুখের জড়তা, দূর হবে মানসিক ভীতি।

পরিতাপের  বিষয়,  তুমি আজ আমাদের  সাথে নেই। আছ আমাদের কাছ থেকে অনেক, অনেক দূরে ; বহু দূরে। আল্লাহতালার ডাকে সাড়া দিয়ে তুমি চলে গেছ না ফেরার দেশে। নীল আকাশে তুমি এখন ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলজ্বল করে আলো ছড়াচ্ছ। তোমাকে  দেখতে না পেলেও তোমার অস্তিত্ব নিরবধি আমাদের  হ্নদয়ে বেদনার সুর অনুরণিত করে। আজ তোমাকে  বড়ই  মিস করছি।

হ‍্যা, এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম, তিনি আর কেউ নন। আমাদের  সবারই প্রিয় ইঞ্জিনিয়ার  আলী আশরাফ  ভাই। তিনি  এখন আমাদের  সাথে নেই। দেখতে দেখতে দু’শ সাঁইত্রিশ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত  হয়ে গত ৬ মার্চ,২০২১ সালে তিনি ঢাকাস্থ এভার কেয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল  করেছেন। অথচ দেশবাসীকে  বিশেষ  করে চট্টগ্রামবাসীকে এ করোনার হাত থেকে বাচাঁনোর জন‍্যে  তিনি নিরলসভাবে  কাজ করে গেছেন। মা ও শিশু হাসপাতালে সংশ্লিষ্টদের  সহায়তায়  তারই প্রচেষ্টায় চালু করা হয়েছিল  করোনা ইউনিট। ভাগ‍্যের নির্মম পরিহাস, সেই করোনা ইউনিটে তিনি অনেক দিন করোনার চিকিৎসা  নিয়েছিলেন। পরে আরো উন্নততর চিকিৎসার  জন্য তাকে ঢাকায় এভারকেয়ার  হাসপাতালে  স্থানান্তরিত  করা হয়। সেখানেও ডাক্তারদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ব‍্যর্থ করে তাকে মৃত‍্যুর স্বাদ গ্রহণ  করতে হয়। তাই কবির ভাষায় বলতে হয় “এনেছিলে সাথে করে মুত‍্যুহীন প্রাণ,মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”

আর পড়ুন:   দলীয় মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগ নেতাদের দৌড়ঝাঁপ, নিরব বিএনপি

আন্তর্জাতিক  সেবা সংগঠন  রোটারি ক্লাব অব ইসলামাবাদের সদস‍্য হিসেবে একটানা একত্রিশ বছর আশরাফ  ভাইয়ের সাথে কাধেঁ কাধঁ মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমাদের  সবার। আমরা রোটারি  ক্লাবের সদস‍্যরা পরস্পরের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ। এই ঘনিষ্ঠতা  পরিবারের  অন‍্যান‍্য সদস্যের মধ‍্যেও সম্প্রসারিত। নিকট আত্মীয়ের চেয়েও  আমরা  পরস্পরকে  আপনজন হিসেবে  বিবেচনা  করি। স্বাভাবিক কারণে  আশরাফভাইয়ের সাথে ছিল আমাদের  গভীর ও নিবিড়  সম্পর্ক। ইঞ্জিনিয়ার  আলী আশরাফ ছিলেন একজন খূবই বন্ধুবৎসল আপাদমস্তক  ভদ্রলোক। ছিলেন খুবই  বিনয়ী, মার্জিত,নির্মোহ, নিরহঙ্কারী আদর্শবান ব‍্যক্তি। এতগুলো গুণের সমাহার  সাধারণত  খুব কম লোকের মাঝেই দেখা যায়।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আলী আশরাফ একদিকে ছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ অন‍্যদিকে ছিলেন  প্রতিভাবান  শিক্ষক ও সমাজসেবক। নগর পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞ হলেও প্রকৌশল  বিষয়ের সর্বত্র ছিল  তাঁর সরব বিচরণ। যুক্তরাষ্ট্রের ক‍্যান্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি  থেকে নগর এবং অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর  ডিগ্রিধারী, ইঞ্জিনিয়ার  আলী আশরাফের মধ‍্যে ছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার। তিনি যেমন ছিলেন জ্ঞানী তেমনি  খুবই  গুছিয়ে  চমৎকারভাবে তাঁর বক্তব‍্য উপস্থাপন  করতেন। বিভিন্ন  সভা, সেমিনার,সিম্পোজিয়ামে তাঁর বক্তব্য  সবাইকে  মোহিত করত।

চট্টগ্রামকে  ঘিরে তাঁর  ছিল বিশাল স্বপ্ন।তাঁর ভাবনার পুরোটাই  ছিল চট্টগ্রামের  উন্নয়ন। চট্টগ্রামের  জলবদ্ধতা, যানযট, ভূমিকম্পের  ঝুঁকি এবং পাহাড়  নিধনের সমস্যা  এবং  এর সমাধানে  তিনি বিভিন্ন  অনুষ্ঠানে  তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য  তুলে ধরতেন। একইসাথে তিনি এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন  পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিবন্ধ লিখে জনসচেতনতা সৃষ্টি  করতেন।টেলিভিশনের বিভিন্ন চ‍্যানেলে চট্টগ্রামের  বিভিন্ন  সমস্যা   ও এর প্রতিকারে সাহসিকতার  সাথে তিনি তাঁর মতামত  ব‍্যক্ত করতেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর  রহমানের  ঘনিষ্ঠ  সহচর,আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের সাবেক  সদস‍্য, চট্টগ্রামের  প্রখ‍্যাত  আইনজীবী মরহুম নুরুল হুদার প্রথম পুত্র ইঞ্জিনিয়ার  আলী আশরাফের অকাল মৃত্যুতে চট্টগ্রামের  যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ  হবে না। তার মৃত‍্যূতে চট্টলবাসী হারিয়েছে একজন সমাজ সেবককে  অন‍্যদিকে তাঁর পরিবার হারিয়েছে একজন যোগ‍্য অভিভাবককে। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।