৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ  *

একদিন যে অঙ্গুলি উঁচিয়ে বাঙালী জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ভাবতে অবাক লাগে সেই স্বাধীন দেশের মানুষই তাঁর অঙ্গুলি চিরদিনের জন্য নিস্তেজ করে দেয়। আর কোনোদিন ওই অঙ্গুলি আমাদের প্রেরণা দিতে আসবে না, দেবে না মুক্তির বারতা। মানুষ মরণশীল বলেই সবার মৃত্যু হয়। তবে কোনো কোনো মানুষের শুধু দেহাবসানই ঘটে, মৃত্যু হয় না। তারা থাকে মৃত্যুহীন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনি একজন মানুষ। তিনি মৃত্যুহীন, তিনি অমর।

সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর বড় সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। সেই নারকীয় হামলার পর দেখা গেছে, ভবনটির প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে রক্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁজরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ। তাঁর তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁজরা। পাশেই পড়ে ছিল তাঁর ভাঙ্গা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরই খন্দকার মোশতাক আহমেদ, যিনি কিনা বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন এবং খুনীদের বাঁচানোর জন্য ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাক আহমেদের স্বাক্ষর আছে।

অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।’ দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো, অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।’

আর পড়ুন:   ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

এরপর ক্ষমতায় আসেন সামরিক শাসক মেজর জিয়া। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে বৈধতা দেন।

এরপর দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার আইনী বাধা অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (রহিতকরণ) বিল, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে উত্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর আইনটি সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটি পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত হয়। ফলে মোশতাকের জারি করা এবং জিয়াউর রহমানের সময় বৈধতা পাওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বিলুপ্তি বলে গণ্য হয়। এরপর শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজ।

বিচারে নিম্ন আদালত ঘাতকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পরে নিম্ন আদালতের এ রায় হাইকোর্টও বহাল রাখেন। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রীমকোর্টে বিচারক নিয়োগ না দেয়াসহ নানা কারণে বিচারের পথে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। ফলে রায় কার্যকরে বিলম্ব হতে থাকে। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর উচ্চআদালত পর্যায়ের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়। সুপ্রীমকোর্টেও আপীল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পাঁচ খুনীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়। আশার কথা এ যে, কয়েকদিন পূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশবাসীকে জানিয়েছেন মুজিববর্ষেই পলাতক খুনীদের গ্রেফতার করে রায় কার্যকর করা হবে।

১৫ আগস্টের হৃদয়বিদারক ঘটনা যদি না ঘটত তা হলে বিশ্বদরবারে বহু আগেই আমরা একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পরিগণিত হতে পারতাম। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল তার পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারেনি শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যাওয়ায়। তাই হয়ত ২০০৪ সালের ২১ আগস্টসহ এ পর্যন্ত প্রায় ২১ বার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল ষড়যন্ত্রকারী ঘাতকরা। কোটি কোটি দেশবাসীর দোয়া এবং আশীর্বাদের জন্যই হয়ত শেখ হাসিনাকে বারবার মেরে ফেলার উদ্যোগ ভেস্তে গেছে।

আর পড়ুন:   জলাবদ্ধতার শিকার নিখোঁজ সালেহ আহমদের বাস ভবনে মেয়র

বঙ্গবন্ধু হত্যার সকল দুরভিসন্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী ও পাকিস্তানী চক্র এবং তাদের এ দেশীয় দালালদের গোপন আঁতাতের কথা আজ দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আজ মানুষ বুঝতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে বাংলাদেশের নাম চিরতরে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে। কিন্তু তাদের সেই ধ্যানধারণা বাস্তবে রূপ লাভ করতে পারেনি।

জাতীয় শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে পারলেই জাতির জনকের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। আর এ লক্ষ্যেই দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন মানবতার জননী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়