কোপা আমেরিকার শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল।রাত পোহালেই স্বপ্নের ফাইনাল।  ফুটবলের তীর্থভূমি মারকানা স্টেডিয়ামে আগামীকাল রবিবার (১১জুলাই) বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় শুরু হবে এ ঐতিহাসিক লড়াই। এ খেলাটিকে ঘিরে দুই শিবিরে বিভক্ত সারা দুনিয়া ।

তাপ ছড়ানো এ ম্যাচকে সামনে রেখে নানা হিসাব-নিকাশ কষছেন দুদলের ভক্তরা। বিশ্ব ফুটবলের অহঙ্কার দিয়েগো ম্যারাডোনার মশালবাহী লিওনেল মেসি কি পারবেন শেষ ভালোর পরীক্ষায় উতরাতে? আর্জেন্টিনার জার্সিতে আজ পর্যন্ত যে বড় কোনো আসরে শিরোপা জিততে পারেননি ফুটবলবিস্ময় মেসি। মেসি জাদু বারবার হোঁচট খেয়েছে ফাইনালে। বিশ্বকাপে একবারসহ কোপার তিন তিনটি ফাইনালের ট্র্যাজেডিই হয়েছে মেসির সঙ্গী। ম্যারাডোনা নেই, আর্জেন্টিনার শিরোপাও নেই, এটি প্রবাদের পর্যায়ে উন্নীত। ৩৪ বয়সি মেসির জন্য ট্রফিতে চুমু দেয়ার এটাই শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেকেই।

মেসির দল আর্জেন্টিনা

মেসির জন্য অলক্ষ্য থেকে ম্যারাডোনার আশীর্বাদ তো থাকছেই! প্রিয় শিষ্যের হাতে ট্রফি দেখার সুযোগ হয়নি ম্যারাডোনার। গত বছর ২৫ নভেম্বর ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়ে অনন্তলোকের সান্নিধ্যে মিশে গেছেন ম্যারাডোনা। ঐতিহাসিক ম্যাচে বারবার আসবে ম্যারাডোনার নাম। কেননা আর্জেন্টিনার ফুটবলের বড় অর্জনের সঙ্গে যে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছেন ম্যারাডোনা। তাই ম্যাচটি মেসির জন্য আবেগেরও। গত কয়েক বছর ধরেই মেসির পাশাপাশি উচ্চারিত নাম ব্রাজিলিয়ান গোল মেশিন নেইমার। অলিম্পিক স্বর্ণ জিতলেও ফুটবলের দুই বড় আসরে (বিশ্বকাপ ও কোপা) এখনও শিরোপা অধরা নেইমারের। ঘরের মাটিতে ২৯ বছর বয়সি নেইমার ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন, এই আশায় বুক বেঁধেছেন ভক্তরা। ঘরের মাঠ হতে পারে নেইমারের জন্য একই সঙ্গে চাপ ও প্রেরণারও। ঘরের মাঠে কোপা ফাইনালে আজ অবধি হারেনি ব্রাজিল। এবারেরটি বাদে এখন পর্যন্ত ব্রাজিল কোপা আয়োজন করেছে পাঁচবার। বলাবাহুল্য প্রতিবারই শিরোপা উৎসব করেছে স্বাগতিকরা। তাই অজেয় রেকর্ড ধরে রাখার ঐতিহাসিক দায় এসে বর্তেছে নেইমারের কাঁধে।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে দ্বৈরথে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে ব্রাজিল। দুদলের সর্বশেষ ৫ লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার দুই জয়ের বিপরীতে ব্রাজিলের জয় তিনটিতে। কোপায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলছে ব্রাজিল। পক্ষান্তরে এই আসরে গত ২৮ বছর ধরে ট্রফিশূন্য আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতেছে ১৪ বছর আগে। আর শেষবার (২০১৬) ব্রাজিলের কাছে হেরেই শিরোপাস্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। দুই দেশের ওই সর্বশেষ ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল। তবে একটা জায়গায় কিন্তু অনেকটাই এগিয়ে আর্জেন্টিনা। কোপায় আর্জেন্টিনার শিরোপা জিতেছে ১৪ বার। আর ব্রাজিলের ট্রফির সংখ্যা ৯। কোপায় নিজেদের শিরোপা সংখ্যাকে দুই অঙ্কের ঘরে উন্নীত করার সুযোগ নেইমারদের। আবার দুদলের মোট লড়াইয়ে এগিয়ে ব্রাজিল। ১১১ ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৪০ জয়ের বিপরীতে ব্রাজিলের জয় ৪৬ ম্যাচে। বাকি ২৫ ম্যাচ নিষ্ফলা।

আর পড়ুন:   পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে দল ঢাকায়
নেইমারের দল ব্রাজিল

পুরো আসরেই সব আলো নিজের দিকে টেনে এনেছেন মেসি। সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট দুটোতেই সবার ওপরে মেসি। নিজে গোল করেছেন চারটি। আর বাকি পাঁচটির উৎসও তিনি। এ আসরে এ পর্যন্ত ১১ গোল পেয়েছে আর্জেন্টিনা। এর মধ্যে ৯টিতেই মেসির অবদান। বিপরীতে দুটো গোল পেয়েছেন নেইমার। সেভাবে গোল না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের জয়ে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন নেইমার। কোয়ার্টারের মতো সেমিফাইনালেও তিনি ছিলেন আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। দুবারই প্রতিপক্ষ ডিফেন্স তছনছ করে দেন নেইমার। তার বাড়ানো বল থেকেই গোল করে দলকে নিরাপদ রাখেন লুকাস পাকুয়েতা। নেইমার-পাকুয়েতা জুটি বড় স্বপ্নই দেখাচ্ছে ব্রাজিল ভক্তদের।

অগ্নিপরীক্ষা দুদলের কোচের জন্যও। মুখোমুখি লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল স্কালোনির চেয়ে কিছুটা সুবিধাজনক জায়গায় আছেন ব্রাজিলিয়ান কোচ তিতে। কোপার দুই আসর মিলিয়ে এখন পর্যন্ত অপরাজিত তিতে। ১৩ ম্যাচের মধ্যে জিতেছেন ৯ ম্যাচে। আর বাকি ৪ ম্যাচ ড্র। কোপায় দুই আসরে স্কালোনির তত্ত্বাবধানে আর্জেন্টিনা খেলেছে ১২ ম্যাচ। এর ৭টিতে জয়ের সঙ্গে দুটোতে হার হয়েছে স্কালোনির। বাকি তিন ম্যাচ ড্র। দুজনের সম্মুখসমরেও কিছুটা এগিয়ে তিতে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কোচের তিন লড়াইয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে তিতে।

মেসিকে আটকানোর ওপরই নির্ভর করছে ব্রাজিলের শিরোপা এমন আলোচনা সর্বত্র। তবে মেসির পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বাকিদের নিয়েও সাবধান ব্রাজিল শিবির। আগের দিন স্বাগতিক ডিফেন্ডার মার্কুইনকোস বলেন, মেসি অসাধারণ। তবে আমাদের শুধু মেসির দিকে নজর রাখলেই চলবে না। অন্যরা যেন সুযোগ নিতে না পারে সেটাও নজরে রাখতে হবে। একই কথা বলেছেন ব্রাজিল অধিনায়ক ক্যাসেমিরোও, আর্জেন্টিনা মানেই শুধু মেসি আর লাওতারো নয়। তারা ফাইনালে এসেছে। তাই আর্জেন্টিনার পুরো দলকেই আমাদের সমীহের চোখে দেখতে হবে। ম্যাচটিকে বিশেষ কিছু বলে মনে করছেন আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি। তার ভাষায়, এ দুদলের লড়াই খেলার চেয়েও বেশি কিছু। গোটা বিশ্ব এ ম্যাচের দিকে তাকিয়ে আছে। এটি অসাধারণ একটা ম্যাচ হবে, এমনটাই আমার প্রত্যাশা।