প্রভাষ আমিন  *

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছবি দেখে আমার মন ভালো হয়ে যায়। সারিবাঁধা পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা। কোনও একটি প্রকল্পের অবস্থান নদীর পাড়ে। শিশুরা খেলাধুলা করে নদীতে লাফিয়ে পড়ছে। বারবার দেখি। যতবার দেখি, ততবার ফিরে যাই ছেলেবেলায়। মানুষের বয়স যত বাড়ে, ততই সে ছেলেবেলায় ফিরতে চায়। নদীতে লাফিয়ে পড়া শিশুদের মাঝে আমি নিজের শৈশবকে ফিরে পাই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ছবি দেখলে আমার কাছে স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে। যারা আমার লেখালেখির সঙ্গে অল্প-স্বল্প পরিচিত, তারা জানেন আমি শেষ জীবনটা কোনও নদীর পাড়ে একটা কুঁড়েঘরে কাটাতে চাই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো আমার সেই স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর। মাঝে মাঝে আমার লোভ হয়, ইশ নদী পাড়ের কোনও আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটা দুই রুমের ঘর থাকতো।

আমি স্বপ্ন দেখি, আমি জানি, দুই বছরের মধ্যে এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের চেহারাই পাল্টে যাবে। ফুলে-ফলে পল্লবিত হবে প্রতিটি গৃহকোণ। হাস-মুরগি, গরু-ছাগলে, গাছপালায় লাগবে সমৃদ্ধির ছোঁয়া। গ্রামীণ নারীদের যে অন্তর্নিহিত শক্তি, যা আমাদের মূলধারার অর্থনীতির বিবেচনায় আসে না, তারাই পাল্টে দিতে পারে সবকিছু। কিন্তু ইদানীং কিছু নিউজ দেখে ভয় হচ্ছে, দুই বছর এই আশ্রয়ণ প্রকল্প টিকবে তো! সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি নানা প্রশ্নে বর্তমান সরকারের অনেক সমালোচনা আছে। দুর্নীতি, অর্থপাচারের অভিযোগও দেদার। কিন্তু ঘোর শত্রুও মানবেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত এক দশকে বাংলাদেশের চেহারাই পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ এখন বদলে যাওয়া এক দেশের নাম। উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন করা বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ভারতের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ এখন এক আত্মমর্যাদায় বলীয়ান এক দেশ। আমাদের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে বেড়ে উঠছে পদ্মা সেতু। কর্নফুলী টানেল, মেট্রোরেলের মতো বেশ কিছু প্রকল্পর কাজ এগুচ্ছে বাংলাদেশকে আরও বদলে দিতে। শহরে বসে সরকারকে গালি দেওয়া সহজ। কিন্তু গ্রামে গেলে টের পাওয়া যাবে দেশ কতটা এগিয়েছে। এক দশক আগেও হাঁটা ছাড়া যেখানে যাওয়ার কোনও উপায় ছিল না, এখন সেখানে সাঁই সাঁই গাড়ি চলে। কিছু পার্বত্য এলাকা বাদ দিলে বাংলাদেশে এখন দুর্গম বলে কিছু নেই। তবে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়ন সামষ্টিক। একটি রাস্তা বা ব্রিজ পাল্টে দিতে পারে একটি এলাকার অর্থনীতির চেহারা। তবে নিন্দুকেরা বলতে পারেন, রাস্তা হয়েছে তো আমার কী? আমার ভাগ্য তো বদলায়নি। এটা ঠিক, অর্থনীতি যতই বেগবান হোক, প্রান্তিক মানুষের ঘরে তার রেশ পৌঁছায় না বা সামান্য কিছু দোলা লাগলেও তা অনেক দেরিতে। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে বৈষম্য। উন্নয়নের কোনও ছোঁয়াই লাগে না প্রান্তিক মানুষদের জীবনে।

আর পড়ুন:   ১২৫ কেন্দ্রের  ফলে আওয়ামী লীগের রেজাউল বিপুল ভোটে এগিয়ে

তবে কিছু কিছু উন্নয়ন ভাবনা একদম অন্যরকম। যেখানে জিডিপি, আয়-ব্যয়ের জটিল অঙ্ক নেই; আছে স্রেফ মায়া আর মানবতা। আশ্রয়ণ শেখ হাসিনার মমতামাখা তেমন একটি মানবিক প্রকল্প। প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই গৃহহীন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার স্বপ্নটা দেখেছিলেন শেখ হাসিনা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের শুরুটা কিন্তু ১৯৯৭ সালে। তবে তার সেই আকাঙ্ক্ষাটা আরও পরিণত হয়েছে এবার। মুজিববর্ষে মুজিবের কন্যার স্বপ্ন- বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না। বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি দেশে সব মানুষকে ঘর দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেও সাহস লাগে। কিন্তু সেই সাহস শেখ হাসিনার আছে। বিশ্বব্যাংককে দেখিয়ে দিতে নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু গড়ে তিনি সেই সাহসের প্রমাণও রেখেছেন। শেখ হাসিনা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেন না। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পে এরইমধ্যে ঘর পেয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।

নিজের একটা ঘর- এই স্বপ্নপূরণ যে একটা পরিবারে কতটা আনন্দ আনতে পারে, আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে গেলেই আপনারা অনুভব করবেন। তবে আশ্রয়ণ প্রকল্প মানে নিছক মাথার ওপর একটা ছাদ নয়; একটি ঘর মানে একটি স্বপ্ন, একটি ঠিকানা, আত্মমর্যাদা। একটু উদ্যোগী ও পরিশ্রমী হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পকে ঘিরেই বদলে যেতে পারে একটি পরিবারের ভাগ্য। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ভাবনাকে পাশে ঠেলে শেখ হাসিনা আশ্রয়ণে জমির দলিল করেছেন স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে। এতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হবে, অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে।

তবে এত যে স্বপ্নের কথা বললাম, অনেকের সেই স্বপ্ন দানাবাঁধার আগেই ভেঙে গেছে। ভেঙে গেছে মানে আক্ষরিক অর্থেই তাদের ঘর ভেঙে গেছে। গত জানুয়ারি আর জুনে স্বপ্নেরও অধিক স্বপ্নপূরণে যাদের চোখে পানি এসেছিল, তাদের বুকই এখন ভেঙে যাচ্ছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। আশ্রয়ণ প্রকল্প উদ্বোধনের পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ প্রকল্পের নানা অনিয়মের খবর আসে। গৃহহীনদের বাছাইয়ে স্বজনপ্রীতি-অনিয়ম, স্থান নির্বাচনে অনিয়ম তো আছেই, আছে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগও। এরইমধ্যে বেশ কয়েক জায়গায় ঘর ভেঙে গেছে, পানি পড়ছে, কোথাও ভিত্তি নড়ে গেছে। যমুনা টিভির রিপোর্টে দেখলাম, ২২ জেলার ৩৬ উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের অভিযোগ তদন্ত করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ১৪৪ সরকারি কর্মকর্তা আর ৩৬ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে। এরইমধ্যে ৫ সরকারি কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আশ্রয়ণ প্রকল্পে যেকোনও অনিয়ম ঠেকাতে বদ্ধপরিকর।

আর পড়ুন:   ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে প্রচারণা চালালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা- পুলিশপ্রধান

তবে আশ্রয়ণ প্রকল্পে যা হয়েছে, তা অস্বাভাবিক নয়; এটাই এখন বাংলাদেশের চিত্র। ঠিকাদার আর ইঞ্জিনিয়ারের যোগসাজশে নিম্নমানের সামগ্রীতে অবকাঠামো নির্মাণই বাংলাদেশের রীতি। কোনোরকমে কাজ করে বিল তুলে নিতে পারলেই হলো। উদ্বোধনের আগেই ভেঙে পড়া, রাস্তা ডেবে যাওয়া, রডের বদলে বাঁশ দেওয়ার খবরও আমরা পাই। তবে আশ্রয়ণ প্রকল্পে যারা দুর্নীতি করেছেন, তাদের সাহস দেখে আমি বিস্মিত। তারাও নিশ্চয়ই জানেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহের প্রকল্প। এই প্রকল্পের সব খবর মুহূর্তেই প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছে যাবে। তারপরও যারা করেছেন, তারা আসলেই সাহসী। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তদন্ত চলছে। দাবি করছি, দায়ীদের সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্প নয়, সব প্রকল্পের দুর্নীতির বিরুদ্ধেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে উন্নয়নটা টেকসই হয়।

আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতির খবর দেখে আমার খালি তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্কটা মনে পড়ছে। একটা বানর বাঁশ বেয়ে ওপরে উঠছে, কিন্তু বাঁশটি তৈলাক্ত হওয়ায় আবার নেমেও যাচ্ছে কিছুটা। ফলে তার বাঁশের আগায় উঠতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।

শত প্রতিকূলতা, বাধা ঠেলে শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু দলের ভেতরে-বাইরে অনেক অপশক্তি শেখ হাসিনার সেই অর্জনকে বিসর্জনে বদলে দিচ্ছে। ছাত্রলীগ বা যুবলীগের একেকটি অপকর্ম শেখ হাসিনার অনেক অর্জনকে ম্লান করে দেয়। এই যেমন আশ্রয়ণ প্রকল্পের মতো একটি মানবিক ও স্বাপ্নিক প্রকল্পে এখন আলোচনা হচ্ছে দুর্নীতি আর অনিয়মের খবর নিয়ে। হয়তো ১ শতাংশ ঘর ভেঙেছে। অনেকে এটুকু অনিয়মকে গ্রহণযোগ্য মাত্রাও দিতে চাইবেন। কিন্তু এক লাখের এক শতাংশ মানে একশ’। আশ্রয়ণ প্রকল্পে একশ’ ঘর ভাঙলে সেটা অবশ্যই বড় খবর।

আমরা চাই সব অনিয়মের তদন্ত হোক, ভাঙা ঘর মেরামত হোক। শেখ হাসিনার স্বপ্ন যেন মিলে যায় ঘরহীন প্রান্তিক মানুষটির সঙ্গে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ