মোহাম্মদ সেলিম *

জন্মিলেই মরিতে হইবে, এটাই চিরন্তন সত্য। পৃথিবীতে যত সত্য আছে, মৃত্যু তন্মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তবে নিজগুণাবলী ও কর্মের মাধ্যমে মৃত্যুর পরও মানুষের মাঝে বহুকাল বেঁচে থাকা সম্ভব। এমন স্বীয় প্রতিভাগুণে যিনি বহুকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তিনি হলেন চট্টগ্রামের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও লেখক মরহুম মো. রেজাউল করিম।

সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নিয়ে যিনি একক প্রচেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম, সাধনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেই একজন নামকরা চিকিৎসক, লেখক ও সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। বহুগুণের অধিকারী সেই মানুষটির আজ (২২জুন) ষষ্ঠমৃত্যুবার্ষিকী। নিজপ্রচেষ্টা ও বিত্তবানদের সহযোগিতায় চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিকমানের হৃদরোগ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে যিনি এগুচ্ছিলেন, নিজের অজান্তেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রায় আড়াই মাস লড়াই করে মাত্র ৬১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।

ডা. করিম শুধু মানবসেবায় সন্তুষ্ট ছিলেন না; সুন্দর ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং কল্যাণকর রাষ্ট্রের স্বপ্ন লালন করতেন। পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে দেশের বিরাজমান সমস্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সততা, পরোপকারিতা , দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তিনি ছিলেন প্রবলভাবে বিশ্বাসী। অসচ্ছল রোগী ও পরিচিতজনদের বিনাপয়সায় চিকিৎসাসেবা দিতেন তিনি। অসংখ্য গরিব ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ বহন করা, সমাজসেবামূলক ও জনহিতকর নানা কর্মকাণ্ডে নিবিড় সম্পৃক্ততার কারণে একজন ব্যক্তি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে তার অনন্য দৃষ্টান্ত মরহুম ডা. রেজাউল করিম।

ডা. করিম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও শিক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণ এবং অব্যাহত অধ্যয়ন ও গবেষণার সুবাদে একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যাপক সুনামের অধিকারী হন। তিনি হৃদরোগের একজন সফল চিকিৎসক এবং হৃদরোগ সংক্রান্ত জনসচেতনতা সৃষ্টির অন্যতম পথিকৃৎ। ইংরেজী ভাষায় তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘ Lecture Notes on Essentials of Electrocardiography ’ ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিষয়ক প্রকাশনার তীব্র অভাব তাঁকে বিশেষ করে হৃদরোগ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলায় লেখালেখি করতে উৎসাহিত করেছে। ‘‘হৃদরোগ: প্রতিরোধ ও প্রতিবিধান” শীর্ষক প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘‘হৃৎপিন্ডের ছন্দবৈষম্য ও হৃদরোগ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনা’’ তাঁর দু’টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

আর পড়ুন:   উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

তাঁর লেখা স্বাস্থ্যবিষয়ক বই ও পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস-সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলো জনগণের স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতে অবদান রাখছে। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ হলো, “বাংলাদেশের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা”।

রেজাউল করিম ১৯৫৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ঘোড়ামরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কুবান স্টেট মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে ইন্টারন্যাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজিতে স্পেশালাইজেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। এরপর দেশে ফিরে চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার, ১৯৮৭ সালে একই হাসপাতালে রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান এবং একই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে চমেক হাসপাতালের ‘কার্ডিওলজি কাম করোনারি কেয়ার ইউনিট’ স্থাপনের দায়িত্ব পালন করেন। মেডিক্যালে এই বিভাগ চালু করার জন্যে সরকারিভাবে তাঁকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। ১৯৯০-৯১ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভ্যাসকিউলার ডিজিজেস, ঢাকা-এর রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান, ১৯৯২-৯৩ সালে চমেক-এর মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট, ১৯৯৩-৯৪ সালে চমেক হাসপাতালের কার্ডিওলজি কাম করোনারি কেয়ার ইউনিটের কনসালট্যান্ট হিসেবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে ডা. করিম হৃদরোগীদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

মানবসেবী ডা. করিম চট্টগ্রামের অবৈতনিক কনসালটেন্ট কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে ফাদার বুদ্রোস মেডিক্যাল সেন্টারে ১৫ বছর যাবত সপ্তাহে দু’বার গরিব ও নিঃস্ব রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।চিকিৎসা সেবায় প্রশংসনীয় অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়েছে। ছাত্রাবস্থায় তিনি ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্রফেশনাল এম.বি.বি.এস পরীক্ষায় প্রথমস্থান অধিকার করায় বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ‘ফাইজার’ কর্তৃক পুরস্কৃত হন।

ছাত্রাবস্থা থেকে তিনি জনসেবা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকতেন। অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁর সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা ছিল । ভাটিয়ারী মুক্তিযোদ্ধা মেমোরিয়াল হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি , কুমিরা আবাসিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক উন্নয়নে আমৃত্যু পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন ডা. করিম।এছাড়া তিনি চক্রবাক ক্লাব-এর উপদেষ্টা, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি এবং মা ও শিশু হাসপাতাল চট্টগ্রাম এর জীবনসদস্য, চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেড এর সদস্য, চট্টগ্রাম একাডেমি পরিচালনা পরিষদের নির্বাহী সদস্য ও সীতাকুণ্ড সমিতি – চট্টগ্রামের পৃষ্ঠপোষক সদস্য ছিলেন।

আর পড়ুন:   দুইবাসের সংঘর্ষে নিহত ৬ ঠাকুরগাঁওয়ে

সর্বশেষ পেশাগতজীবনে ডা. করিম চট্টগ্রামের সেভরণ ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরিজ প্রা. লিমিটেডের অন্যতম পরিচালক ছিলেন। এখানে তিনি বিকেলে নিয়মিত হৃদরোগীদের ইকো-কার্ডিওগ্রাফি করতেন। ডা. রেজাউল করিম দি ট্রিটমেন্ট হসপিটালে সকাল -সন্ধ্যা নিয়মিত রোগী দেখতেন।

ডা. রেজাউল করিমের আকস্মিক মৃত্যুতে তার সহজসরল সহধর্মিণী বিলকিস করিম রোগে-শোকে আক্রান্ত হয়ে গেলবছর মৃত্যুবরণ করেন।

নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য  অনুকরণীয় আদর্শ  ডা. রেজাউল করিমের অকাল মৃত্যুতে চিকিৎসাপেশাসহ জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। রোগীর প্রতি দরদী মনের অধিকারী এ গুণী চিকিৎসককে চট্টগ্রামের মানুষ বহুকাল স্মরণ রাখবে ।

লেখকঃ সম্পাদক- সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম