বিশেষ প্রতিনিধি *

ঢাকা বোট ক্লাবে মধ্যরাতে চিত্র নায়িকা পরী মণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে হওয়া মামলায় অভিযুক্তদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে  ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই । তবে গুলশানে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার ঘটনায় হওয়া মামলার প্রায় দুমাস হলেও একমাত্র  অভিযুক্ত বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে এখনো গ্রেপ্তার না করায়  জনমনে নানাপ্রশ্ন ওঠেছে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) বলছে আনভীর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানা রিকুইজেশন দিলে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

সোমবার (১৪ জুন) উত্তরা থেকে চিত্র নায়িকা পরী মণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত প্রধান আসামি নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ডিবি উত্তর শাখা ও সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার হারুন-অর-রশীদ। এ সময় পরী মনির ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামির বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া হলো। অথচ বসুন্ধরা এমডির আনভরের বিরুদ্ধে সেটা দেখা গেল না কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরী মনির ঘটনায় সাভার থানায় মামলা হলেও আসামি উত্তরায় থাকেন। সাভার থানা পুলিশ আমাদেরকে রিকুইজিশন দেয়ার ফলে আমরা তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছি। বসুন্ধরা এমডির ব্যাপারে গুলশান থানা পুলিশ রিকোজিশন দিলে আমরা একই ধরনের ব্যবস্থা নিব।

প্রসঙ্গত, গুলশান দুই নম্বর এভিনিউয়ের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লটের বি/৩ ফ্ল্যাটে একা থাকতেন কলেজছাত্রী মুনিয়া। চলতি বছরের মার্চ মাসে এক লাখ টাকা মাসিক ভাড়ায় তিনি ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন। ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় ওই বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার মধ্যেই মুনিয়ার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনভীরের নাম আসে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সায়েম সোবহান তানভীর কলেজছাত্রী মুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, গুলশানে ফ্ল্যাট ভাড়া করে তাকে রেখেছিলেন। কিন্তু বিয়ে না করে উল্টো হুমকি দেয়ায় মুনিয়া আত্মহত্যা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, মুনিয়া আসামি আনভীরের শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বলে তাকে হুমকিও দেয়া হয়েছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে এসময় বলা হয়, মুনিয়ার ফ্ল্যাটে আনভীরের যাতায়াতের প্রমাণ তারা পেয়েছেন। মামলার পর পুলিশ তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করে। তাতে ঢাকার আদালত সাড়াও দেয়। তবে এখনো পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি তাকে।

আর পড়ুন:   আইনশৃঙ্খলায় দায়িত্বরতদের গাফিলতির সাজা হবেঃ হাছান মাহমুদ

চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বসুন্ধরার এমডি আনভীর ও মুনিয়ার পরকীয়ার কাহিনী ঘটনার শুরুতেই নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্বামী-স্ত্রীর মতো দীর্ঘদিন বসবাস করার পর বিয়ে করার বিষয়টি সামনে আসার পরই দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন আনভীর। নানা অপবাদ ও অজুহাত দেখিয়ে মুনিয়াকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া হয়।

ফলে ওই তরুণী যদি আত্মহত্যা করে থাকে তাহলে এর প্ররোচনা যে বসুন্ধরা এমডি দিয়েছে, সেটিও পুলিশি তদন্তে ওঠে আসছে। তবে মুনিয়ার মৃত্যু হত্যাকাণ্ডও হতে পারে, সেটি শতভাগ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তসহ ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে পুলিশ। সম্ভাব্য সবদিক মাথায় রেখেই আলোচিত এ মামলার তদন্ত চলছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে জব্দ হওয়া দুটি স্মার্টফোনে বসুন্ধরা এমডি আনভীরের সঙ্গে মুনিয়ার অসংখ্য ছবি রয়েছে। বেশ কয়েকটি ছবিতে মুনিয়া এবং আনভীরকে হাতে হাত রেখে এবং কিছু ছবিতে কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা গেছে। মুনিয়ার ফোনে পাওয়া গেছে বাংলালিংক অপারেটরের একটি নম্বরের অসংখ্য কল রেকর্ড। ওই নম্বরটি এমডি আনভীরের বলে নিশ্চিত করেছেন বসুন্ধরা গ্রুপের একাধিক কর্মকর্তা। ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিলের কথোপকথনের সবগুলোতেই তাদের মধ্যে ঝগড়াবিবাদ চলছিল।

এদিকে মুনিয়ার ফোনে ডাউনলোড করা একটি অ্যাপে মুনিয়া ও আনভীরের নম্বরে চ্যাটের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এই অ্যাপে দেখা যায়, মুনিয়া প্রতিদিনই আনভীরের নম্বরে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ এবং ছবি দিতেন। এসব মেসেজে ফ্ল্যাটে একা থাকা মুনিয়া কখন কী করতেন, সারাদিন কীভাবে কাটত, ফোনে সারাদিন কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে ইত্যাদি লেখা রয়েছে।

একই সূত্র মতে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ছাড়াও মুনিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করিয়ে তার সঙ্গে সায়েম সোবহান আনভীরের অবৈধ সম্পর্কের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ঠিক কী কারণে তাদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল এবং ভিকটিমকে মোবাইলে ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে যে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল তাও তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া মুনিয়ার ব্যবহৃত ছয়টি ডায়েরিতে আনভীরকে উদ্দেশ্য করে লেখা অভিমান ও হতাশার কথাগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।

আর পড়ুন:   কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন  শিপ্রা রানী

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, আমরা ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। স্পর্শকাতর মামলাটির নিবিড় তদন্ত চলছে।

কলেজছাত্রীর মুনিয়ার লাশ উদ্ধারের ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’

কিন্তু জনমনে প্রশ্ন, মামলা দায়েরের  প্রায় দুমাস  অতিবাহিত হলেও কেন এ মামলার অন্যতম আসামি সায়েম সোবহান আনভীরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না? ‘জনমনে এও প্রশ্ন রয়েছে, দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী বলে পুলিশ গ্রেফতারে অনীহা প্রকাশ করছে- যা দেশের সাধারণ মানুষের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অশনি সঙ্কেত।