মোহাম্মদ ইউসুফ *

সম্মেলনের ১৭মাস পরও সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত কোনো পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হওয়ায় দলীয় কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। দলীয় সভা ডেকে কোনো সমস্যা সমাধানের সুযোগ নেই; নেই কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম। দলের এ পরিস্থিতির জন্যে শীর্ষনেতাদের দায়ী করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। জেলা কমিটির অনুমোদন দেরিতে হওয়া, করোনা মহমারী, রমজানসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনে দেরি হচ্ছে বলে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের মন্তব্য।

সীতাকুণ্ডে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ত্রি-ধারায় বিভক্ত। সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি , সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুনকে ঘিরে দলের সিংহভাগ নেতাকর্মীর অবস্থান। দলের একটি অংশ স্থানীয় এমপি দিদারুল আলমের সমর্থক। দলীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে কমিটি গঠনে বিলম্ব হচ্ছে। কোন্ নেতার অনুসারী কমিটিতে কতজন থাকছে-এটি একটি বড় সমস্যা কমিটি গঠনে। মূল দলীয় রাজনীতির চর্চা থেকে গ্রুপ রাজনীতির চর্চা বেশি হয় বলে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। ফলে সভাপতি-সম্পাদক ঐক্যমতে পৌঁছতে পারছেন না বলে ৭১সদস্য বিশিষ্ট কমিটির চুড়ান্ত তালিকা হয়নি; এখনো খচড়া তালিকাতেই আটকে আছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বে মতভেদ ও বিভাজন থাকায় এর নেতিবাচক প্রভাব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনেও পড়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে অস্বস্তিতে আছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মী না হয়ে,তাদের নেতার পরিচয়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে।          ২০১৯ সালের ২৯নভেম্বর সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সেদিন সভাপতি-সম্পাদকপ্রার্থীরা শোডাউন করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল; প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়েছিলেন বেশকজন নেতাকর্মী। সভাপতি-সম্পাদক হওয়ার অনেকের বাসনা থাকলেও শেষমেষ সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের চারবারের ( ১৯৯৩, ১৯৯৮, ২০০৩ ও ২০১২) নির্বাচিত দেড়যুগেরও বেশি সময়ের সাধারণ সম্পাদক, সীতাকুণ্ড  উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া সভাপতি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এস এম আল মামুনের পিতা সাবেক এমপি ও প্যানেল স্পীকার এ বি এম আবুল কাসেম মাস্টার আমৃত্যু বাকের ভুঁইয়ার কমিটিতে সভাপতি ছিলেন।

সম্মেলনের সতেরো মাসেও সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন গঠন হচ্ছে না- তা জানতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ও সীতাকুণ্ড উপজেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সাথে  চাটগাঁরবাণীডটকম এর সাথে  মুঠোফোনে কথা হয়।চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ সালাম বলেন, “প্রাণঘাতি অতিমারী করোনার থাবায় গোটা বিশ্ব আজ মহাবিপর্য়ের কবলে। করোনা সংক্রমণে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিসহ বহু নেতাকর্মী মারা গেছেন, আক্রান্ত হয়েছেন অনেকেই । লকডাউনের কারণে জনজীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে আছে।করোনার নেতিবাচক প্রভাব সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনেও পড়েছে। তারপরও আমি সীতাকুণ্ডের এমপি দিদারুল আলম, সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক এস এম আল মামুনকে মুখেও বলে আসছি, চিঠিও দিয়েছি। আশা করছি ,খুব শিগগির সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির চূড়ান্ত তালিকা আমাদের কাছে জমা দেয়া হবে।”

আর পড়ুন:   ১৫আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জিয়া জড়িত-প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, “সম্মেলনের পর থেকে তো আমরা করোনাযুদ্ধে আছি, লকডাউনের মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে সকলেই দিনযাপন করছে। এ করোনার মধ্যেও আমরা ৬মাস আগে চিঠি দিয়েছি সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগকে, কমিটি জমা দেয়ার জন্যে। আমরা মৌখিকভাবেও তাগাদা দিয়ে আসছি। ২/১দিনের মধ্যে আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটির জমা দেয়ার আরেকটি চূড়ান্ত পত্র দেবো। ব্যতিক্রম কিছু হলে জেলা কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।”

সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আল মামুন বলেন, “সম্মেলনের কিছুদিন পরেই করোনা সংক্রমণ ও লকডাউন শুরু হয়। করোনাক্রান্ত হয়ে আমি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছি; এখনো পরিপূর্ণভাবে সুস্থ হয়নি। এ ভেতরেও বাকের ভুঁইয়া সাহেবের সাথে বসেছিলাম ,কমিটির খসড়াও করা হয়েছে। আবার লকডাউন, রোজা সবকিছু মিলিয়ে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে সময় অতিবাহিত হচ্ছে। এছাড়া জেলা কমিটি অনুমোদন হয়েছে কয়েকমাস আগে; হাটহাজারী ও সন্দ্বীপ উপজেলা কমিটিও তো এখনো হয়নি। তাছাড়া কমিটি ঝুলিয়ে রেখে কী লাভ,পূর্ণাঙ্গ কমিটি তাড়াতাড়ি গঠন করতে পারলে আমার কাছে ভালো লাগবে। বাকের সাহেবের সাথে আবারও বসে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে দ্রুততম সময়ে জেলায় জমা দেবো “

সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া কমিটি গঠনে বিলম্বের জন্যে দুঃখ ও হতাশা ব্যক্ত করলেও এ নিয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতির চর্চা হয় না। নীতি-আদর্শ থাকলেও তা কাগজে-কলমে। কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্বের ওপর কোনো চেইন অব কমান্ড নেই। নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দলের সম্মেলন হয় না। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলে সাংগঠনিক কার্যক্রম। নেতার ইচ্ছে-অনিচ্ছায় চলে কীর্তন।দলের সম্মেলন হলেও বছরের পর বছর গড়িয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় না। সিলেকশন কিংবা ইলেকশনের মাধ্যমে সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত হলেও তারা সময়মতো পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে না বা করতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতিনির্ভর না হয়ে নেতাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আদর্শকে ঘিরে কোনো দলীয় কর্মসূচি নেই। জনস্বার্থ নিয়ে কোনো দলই সক্রিয় ও সোচ্চার নয়। দলীয় গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র অনুসরণে দলগুলো পরিচালিত হয় না। সব জেনেশোনেও দলীয় নেতাকর্মীরা উচ্চবাচ্য ও প্রকাশ্যে নেতাদের অগঠনতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন না। দলীয় ফোরামে সাংগঠনিক বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার পরিবেশ নেই। দলীয় গঠনতন্ত্র না মানা,সম্মেলন হলেও যথাসময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া,টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ-পদবী বাগিয়ে নেয়া,নেতাকর্মীদের পাশকাটিয়ে পকেট কমিটি গঠন করা-এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুসঙ্গ হয়ে গেছে। ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো মূল্যায়ন নেই রাজনৈতিক দলগুলোতে। টাকা থাকলে এমপি-মন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে আসীন হওয়া যায়। নীতি-আদর্শের কোনো দাম নেই। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা নেই বলে গুণী মানুষেরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে গেছেন। ফলে রাজনীতিতে মেধাবী ও গুণ-মানসম্পন্ন নেতার তীব্র সঙ্কট চলছে। আমাদের জাতীয় সংসদ এখন চেম্বার হাইজ। জনগণের প্রতিনিধি সেখানে নেই বললে চলে; প্রায় সকলেই ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি।সেবার বদলে রাজনীতি এখন ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার-এ রূপান্তরিত হয়েছে। রাজনীতিকে যারা সেবার ব্রত হিসেবে নিয়েছে,তারা এখন খুব অসহায়; রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাদের জায়গা নেই। রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সকল পর্যায়ের নেতৃত্ব জনপ্রতিনিধিদের কব্জায় চলে যাওয়ায় দলীয় রাজনীতি অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে; অসহায় হয়ে পড়েছে ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ দলীয় নেতাকর্মীরা। জনপ্রতিনিধিরা এখন এলাকার হর্তা-কর্তা-বিধাতা। রাজনীতি কালক্রমে সুবিধাবাদী,ভূমিদস্যু,মুনাফাখোর ,চোরাকারবারী, ইয়াবাব্যবসায়ী ও মাস্তানদের দখলে চলে গেছে।রাজনীতির নামে চলছে অপরাজনীতি ও লাগামহীন দুর্নীতি। ক্ষেত্রবিশেষে রাজনীতিকদের দায়িত্ব পালন করছে আমলারা। কোথাও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। জাতির জন্যে এটি অশনিসঙ্কেত। এ অবস্থা আর বেশি দিন চলতে পারে না। রাজনীতিহীনতার কারণে দেশ ক্রমশ ধর্মের লেবাসধারী জঙ্গী-উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর চারণভূমি হতে চলেছে। রক্তেকেনা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে আফগান-পাকিস্তান বানানোর মহড়া অব্যাহত রেখেছে এ ধর্মব্যবসায়ীরা। চলমান রাজনীতির ওপর নতুনপ্রজন্ম ভীষণ হতাশ। জাতির এ সঙ্কট নিয়ে একটি জাতীয় সংলাপ দরকার।রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে।

আর পড়ুন:   পঞ্চম দফায় নীতম প্রার্থী ১৯৩ কোটির মালিক পুনম সিনহা

লেখক- প্রধানসম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম