নিজস্ব প্রতিবেদক *

উন্নয়ন বলতে সাধারণত নিম্ন অবস্থান থেকে উচ্চ অবস্থানের দিকে ধাপিত হওয়াকে বোঝায়। কোনো নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রণালি খুব অনাড়ম্বর ও দরিদ্র অবস্থা থেকে আধুনিক ও সচ্ছল হওয়াকে উন্নয়ন বলা চলে। বাস্তবিকভাবে উন্নয়নের ধারণটি ব্যাপক ও চলমান। জীবনের সবস্তরে এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে উন্নয়নের চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়ে আজ আমরা শুধু জমকালো জীবন আর বিলাসিতাকে স্থান দিয়েছি; যা নিতান্তই উন্নয়ন ধারণার সঙ্গে যায় না। কারণ মানুষের জীবন প্রণালির আমূল পরিবর্তন করতে যদি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়; তবে সেটা আর উন্নয়ন থাকে না। তখন সেটা উন্নয়নের নামে ধ্বংসের দিকে ঢেলে দেয়। টেকসই উন্নয়ন হলো বর্তমানে প্রকৃতি বা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন উপাদান বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমানকে সুন্দর করা এবং ভবিষ্যতের জন্য ওই উপাদানগুলো অক্ষুণ্ন রাখা। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নয়ন টেকসই না। আমরা নির্বিচারে প্রকৃতি ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমানে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন উপভোগ করছি, যা ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

ধরুন, কৃষিজমির মাঝে প্লাস্টিকের একটি কারখানা স্থাপন করা হলো এবং খসড়া হিসাব করা হলো এই কারখানার কারণে যেটুকু আবাদি জমি নষ্ট হলো, তার থেকে চার গুণ বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। উপরি ভাবনায় এটি সত্যিই ব্যাপক লাভজনক ও উন্নতর জীবনের সহায়ক। কিন্তু একটু মাথা শান্ত করে ভাবুন তো, দুই বছর পর ওই কারখানার বর্জ্য, বিষাক্ত ধোঁয়া যা পরিবেশের সঙ্গে মিশে কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করবে এবং সেটা বিশাল এলাকাজুড়ে যে ক্ষতিসাধন করবে, তা ওই চার গুণ উৎপাদনের থেকে ১২ গুণ বেশি ক্ষতিকর? আসলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ভেবে উন্নয়ন খুঁজে পেলেও দীর্ঘ সময়ে সেটি আমাদের গলার কাঁটা। আমরা কেউই বলছি না কারখানার প্রয়োজন নেই, অবশ্যই আছে! তবে সেটা হতে হবে জলবায়ু বা পরিবেশবান্ধব; যাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বে মানুষের উন্নত আর আধুনিক জীবন আকাঙ্ক্ষা পূরণের দরুন প্রতিনিয়ত পৃথিবী পৃষ্ঠের নিরমল প্রকৃতির ওপর নির্বিচার চলছে। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবীর উষ্ণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ। পৃথিবী ঊষালগ্নে যখন মানুষ প্রকৃতি নির্ভরশীল ছিল তখনও আমরা প্রকৃতির ক্ষতি করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। কালক্রমে গুহাবাসী মানুষ আগুন আবিষ্কার করতে শিখল আর শুরু হয়ে গেল পরিবেশের সঙ্গে অনাচার। মানুষ জীবনের চাহিদা ও বন্যপ্রাণীর ভয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাখত; যার ফলে বনজঙ্গল পুড়ে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতো আর কার্বণ নিঃসরণ হতো। সেই যে শুরু হয়েছে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার তা আর সমাপ্ত হয়নি। মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে প্রতিনিয়ত প্রকৃতি হারিয়ে চলেছে নিজেদের স্বকীয়তা। যা মানবসভ্যতার জন্য হুমকির কারণ। আধুনিক সময়ে মানুষ প্রকৃতির ক্ষতিসাধন বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে; তবে এক্ষেত্র অভিনব সব কায়দার উদ্ভব হয়েছে। সমুদ্রের নীল তিমি থেকে ডাঙ্গার শকুন সবই আজ বিলুপ্তির পথে মানুষের অমানবিক কাজের কারণে।

আর পড়ুন:   ৬ মাস নিষিদ্ধ সাব্বির

আধুনিক যুগ তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। মাত্র কয়েক দশকে তথ্য ও প্রযুক্তির এত উন্নয়ন সাধন হয়েছে; যা কল্পনার বাইরে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সব কাজে এবং স্থল, জল, আকাশ বা মহাবিশ্বের পরতে পরতে আজ প্রযুক্তির জয়জয়কার। এটি মানবজীবনের জন্য সত্যিই আনন্দের। প্রযুক্তি মানুষের প্রতিটি কর্ম ও জীবন সংগ্রামকে করেছে সহজ, সরল, আধুনিক ও উপভোগ্য। তবে প্রযুক্তি নামক মুদ্রার উলটো পিঠেই রয়েছে অকল্যাণ। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে ই-বর্জ্য; যা প্রকৃতির মারাত্মক ক্ষতি করছে। এই জায়গাতেও আমরা টেকসই উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। হাজার হাজার টন ই-বর্জ্য বর্তমান ও ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য আর জলবায়ুর বড় শত্রু। বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে আধুনিক ত্বরিত প্রযুক্তি, শিল্প থেকে কৃষি সর্বত্রই আজ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। যার ফলাফল ভোগ কছে পৃথিবী পৃষ্ঠের মানুষ ও জীবকুল। শিল্পের এই যুগে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে। যেগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য ওপরে বর্ণিত সাময়িক অধিক মুনাফা। দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কথা তারা কেউই মনে রাখে না। এসব শিল্পের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত জলবায়ুসহিষ্ণু নীতিমালা। যার ফলে একদিকে শ্রমিকের মারাত্মক দৈহিক ক্ষতি করছে; অন্যদিকে বিষাক্ত বর্জ্য আর কালো ধোঁয়া পরিবেশের ক্ষতি করছে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা শহরের কথাই বলা যায়, একসময় বিশ্বের বড় বড় সুলতান ও রাজারা ঢাকার সৌন্দর্য আর বুড়িগঙ্গার জলপথের প্রশংসায় মঞ্চমুখ ছিল। কালের বিবর্তন আজকের সেই ঢাকায় পৃথিবীর সেরা দূষিত নগরীতে রূপ নিয়েছে। বুড়িগঙ্গার কথা আর কী বলব, নগরায়ণের বিষের বাণে বুড়িগঙ্গা আজ মৃত্যুপ্রায়। কোনো রকমে অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকলেও তা আজ জনজীবন ও জীববৈচিত্র্যবান্ধব নয়। এই করুণ অবস্থার প্রধান কারণ টেকসই উন্নয়নের অভাব।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। যদিও বর্তমানে কৃষির গুরুত্ব সামান্য কমেছে। তার পরও আমদানিনির্ভর শিল্পায়নের এই দেশের শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎস কৃষি। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনের নীতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত নয় এই সবুজ খাতও। জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি উৎপাদনের জন্য কৃষকের প্রধান আস্থা এখন রাসায়নিক স্যার আর কীটনাশক; যা প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। মানুষের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা আর আধুনিক জীবনের খোরাক মিটাতে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত করা অন্যায় ও অত্যচারের করুণ ফলাফল জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে ক্ষতি বা হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে তার প্রধান ভিক্টর আমাদের প্রাণের জন্মভূমি। প্রতিনিয়ত বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি তার বহিঃপ্রকাশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের জীববৈচিত্র্য, কৃষি উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে; যার ফলে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। করোনা মহামারির ফলে পুরো পৃথিবী আজ স্থবির। স্বজন হারানোর হাহাকার, ক্ষুধা আর কান্নায় প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন শঙ্কা আর সংকট। অক্সিজেন সংকট যার মধ্যে অন্যতম। করোনার ভয়াবহতার ফলে এই সংকট যেন চরম থেকে চরম হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালেই বিষয়টি আঁচ করা যায়। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে অক্সিজেন আমাদের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়। করোনায় কৃত্রিম অক্সিজেনের সংকটে যদি এহেন করুণ অবস্থার সৃষ্টি করে; তাহলে ভাবতেই হবে প্রকৃতি যদি আমাদের সঙ্গে নির্বিচারই একই কর্ম শুরু করে; তাহলে আমাদের কী হবে? কিন্তু এভাবে না ভেবে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের খেয়ালখুশিমতো প্রকৃতির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছি; যা সত্যই আমাদের জন্য ভয়াবহতার ইঙ্গিত।

আর পড়ুন:   প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস পরিস্থিতিঃ প্রাসঙ্গিক কিছু আলোকপাত

এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ুবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। মুনাফার চিন্তাভাবনা থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে। এই পৃথিবী আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাজ থেকে বাসযোগ্য পৃথিবী হিসেবে পেয়েছি, আমাদেরও উচিত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া। কৃষি-শিল্প সবক্ষেত্রে পরিবেশে ক্ষতি করে এমন মনোভাব ও নীতি থেকে সরে আসতে হবে। কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস করে জৈবিক কৃষি উৎপাদনে নজর দিতে হবে। জলবয়ুবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্বণ নিঃসরণ কমাতে হবে। এক্ষেত্রে পৃথিবীর সব দেশের নেতাদের হাতে হাত রেখে এগিয়ে আসতে হবে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে বিশ্বের ১৮৯ দেশ বৈশ্বিক জলবায়ু বিষয়ক প্যারিস চুক্তিতে সমর্থন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব আর পৃথিবীর মোড়লদের অনীহা আর অবহেলার দরুন বরাবরই অবহেলিত হয়ে আসছে চুক্তিটি। তবে অতি সম্প্রতি মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সহযোগী মনোভাব নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু ইস্যুতে। ‘লিডারস সামিট অন ক্লাইমেট’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে বিশ্বের ৪০ দেশের রাষ্ট্রনায়কদের সামনে জলয়াবুবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপ, নির্গমনের হার বহু গুণে হ্রাস করা এবং বিশ্ব নেতাদের এগিয়ে আশার আহ্বান জানানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, চীনের মতো বিশ্ব মোড়লরাও কার্বণ নিঃসরণের হার কমানোর আশ্বাস দেয়। বিশ্ব নেতাদের এমন সহযোগী মনোভাব প্রশংসনীয়। তাদের আশ্বাসগুলো বাস্তবে রূপ নিক এমনটাই আশা বিশ্বের প্রকৃতিপ্রেমীদের।