বিশেষ প্রতিনিধি  *

আজ ২৫ মার্চ। সেই কালরাত্রি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী। মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুরো বাঙালি জাতি জেগে ওঠেছিল স্বাধীনতার জন্য। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রথম বৈঠক। এ অ্যাসেম্বলিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ব্যাপারটা পাকিস্তানিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি প্রথম থেকেই। বস্তুত ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম ‘এক লোক এক ভোট’-এর নির্বাচন পাকিস্তানের শাসকদের সব হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট করে দেয়। ১৯৬৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে চলমান ৬ দফা তথা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানকে ঠেকাতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হিসাবটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে ৬ দফাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সব আসন পাবে, এরপর পূর্ব পাকিস্তানে ৬ দফাবিরোধী দলগুলো সামান্য কয়েকটি আসন পেলে ৬ দফা তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদবিরোধী চেতনার পরাজয় ঘটবে নির্বাচনে। নির্বাচনোত্তর গণপরিষদে তখন সহজেই তাদের মতো করে সংবিধান রচনা করা সম্ভব হবে। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান থেকে দুটি বাদে সব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি আসনে বিজয়ী হলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়, শুরু হয় ষড়যন্ত্র, যেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে অর্থাৎ ৬ দফাভিত্তিক কোনো সংবিধান পাকিস্তানে রচিত না হয় এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যেন পাকিস্তানের ক্ষমতায় যেতে না পারে। ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল সেটা ১ মার্চ এক রেডিও ভাষণে ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য সেই অধিবেশন স্থগিত করে দেয়। পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রটি ধরতে কিন্তু বাঙালির এক মুহূর্তও দেরি হয়নি। ইয়াহিয়ার রেডিও ভাষণ শেষ হতে না হতেই ঢাকার রাস্তায় সেদিন নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। স্লোগান ছিল- ‘ভুট্টোর মুখে লাথি মার, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা। নির্বাচনে পাঞ্জাব ও সিন্ধু তথা পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তার দল। তার বক্তৃতায় ইয়াহিয়া বলেছিল যে, ভুট্টো ঢাকায় যেতে সম্মত হয়নি বলেই প্রধানত অধিবেশন স্থগিত করা হলো। সেই শুরু স্বাধীনতার লক্ষ্যে বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। পাকিস্তানিরা নানা কায়দা-কৌশলে কালক্ষেপণ করে বাংলাদেশে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বাঙালি জাতি মানসিকভাবে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। পাকিস্তানিরা আলোচনা ও সমঝোতার নাম করে কালক্ষেপণ ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। একপর্যায়ে ২৫ মার্চ আলোচনা ভেঙে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ওই এক কালরাত্রিতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে যে গণহত্যা চালিয়েছে আধুনিক বিশ্বে তার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর হেড কোয়ার্টারসহ ঢাকার রাস্তাঘাটে ঘুমন্ত অসহায় মানুষ এবং বস্তিগুলোতে হামলা চালায়। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় শত শত ঘরবাড়ি। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল এবং শিক্ষকদের কোয়ার্টারে চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ওই এক রাতে পাকিস্তানি বাহিনী কত নিরপরাধ মানুষ হত্যা করেছে তার কোনো হিসাব পর্যন্ত করা যায়নি। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল গণহত্যা চালিয়ে অস্ত্রের জোরে বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে। ২৫ মার্চের কালরাত্রির গণহত্যা প্রথমে বাঙালি জাতিকে হতবাক করে দিয়েছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু তখন স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতি প্রস্তুত হয়ে গেছে। ২৫ মার্চের কালরাত্রির গণহত্যাও তাদের দমন করতে পারেনি। শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। আজ ৫০ বছর পর সেই কালরাত্রি আমাদের তাদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যারা সেদিন অসহায়ভাবে প্রাণ দিয়েছিল পাকিস্তানি নরপশুদের হাতে। স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে সেদিন যারা ঘুমিয়েছিল, কিন্তু পরের দিনের প্রভাত দেখতে পারেনি, তাদের কথাই আমাদের মনে পড়ে। বাংলাদেশে ২৫ মার্চের কালরাত্রির হায়েনারা বা তাদের দোসররা এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়নি। কালরাত্রির রাজনৈতিক দোসররা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশে। হায়েনাদের হাত থেকে মুক্ত রাখতে হবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে।

আর পড়ুন:   ২৬ লাখ করোনা টিকা ৩৪ জেলায় পাঠানো শুরু