খন রঞ্জন রায় *

প্রতি বছর বিশ্ব পানি দিবস পালন করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ। জাতিসংঘের মাধ্যমে সভা সেমিনার হয়, পোস্টারিং হয়, গণমাধ্যমে আলোচনা হয়, লেখালেখি হয়, জনসাধারণ কিছুটা হলেও সচতন হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পানি দিবস আলাদা গুরুত্ব বহন করে। পানির অভাবে নানা প্রতিকূলতা আমাদের চেপে ধরেছে। নষ্ট হতে বসেছে বিশুদ্ধ পানির জলাধারগুলো। নানামুখী আগ্রাসনে অস্তিত্ব হারাচ্ছে নদীগুলো। নদীতে পানিপ্রবাহ না থাকায় ভাটি থেকে ওঠে আসছে সাগরের পানি। বাড়ছে লবণাক্ততা। বিরূপ প্রভাব পড়ছে দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে। নগর-মহানগরগুলো থেকে গ্রাম-গ্রামান্তরেও মরুময়তার ছাপ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলছে পানি নিয়ে সংকট, রেষারেষি। তৈরি হচ্ছে যুদ্ধাবস্থা। এ প্রেক্ষাপট বিবেচনা নিয়ে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২২ মার্চকে বিশ্ব পানি দিবস ঘোষণা করা হয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক কল্যাণের জন্য পানিসম্পদ উন্নয়নে সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যই বিশ্ব পানি দিবস পালনের মূল লক্ষ্য।

বিশুদ্ধ পানি একটি অপরিহার্য পণ্য। বিশ্বের একুশ ভাগ মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা নেই। বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই। পানি সম্পদের সুরক্ষা একটি অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব। পানি ব্যতীত জীবন অসম্ভব। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পানির প্রয়োজন। বিশ্বের বহু অংশে বিশুদ্ধ পানির মারাত্মক অভাব। ক্রমান্বয়ে পানি সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে দূষণের মাত্রা। পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে- শুকিয়ে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির আধার। রাসায়নিক শিল্পবর্জ্য বিনষ্ট করছে পানির গুণাগুণ। পানি সম্পদের নিরাপদ সরবরাহ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের ৮০% রোগ ও মৃত্যুর কারণ। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে পানির অভাব হচ্ছে দিন দিন প্রকট। নগরায়ন সম্প্রসারণ ও নগর দারিদ্র্যও সৃষ্টি করছে পানি সংকট। বড় বড় শহরে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, কৃষি, শিল্প ও নগর উন্নয়ন, জনবিচ্যূত্ত উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ মৎস্য চাষ, যোগাযোগ, বিনোদন ও অন্যান্য বহু ক্রিয়াকর্মের জন্য মিঠা পানি অপরিহার্য। প্রকৃতির কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্যও প্রয়োজন পানির ভারসাম্যতা।

মানবিক মৌলিক চাহিদাসমূহের অন্যতম একটি উপাদান নিরাপদ পানি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পানির ব্যবহার এবং গুরুত্ব সর্বজন স্বীকৃত। পানির ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা সার্বজনীন বিধায় নিরাপদ পানি একটি মৌলিক মানবাধিকারও বটে। জীববৈচিত্র্য ও জীবনধারণের অপরিহার্য শর্ত পানি। বিজ্ঞানের এ চরম উৎকর্ষের সন্ধিক্ষণে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা আজ পৃথিবী ছেড়ে চাঁদ এবং মঙ্গলে পানির উপস্থিতি খুঁজে পেতে প্রতিনিয়ত ব্যাপক অনুসন্ধান ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র মানব জীবনের জন্যই নয় পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলেও পানি অপরিহার্য। সৃষ্টির আদিকাল থেকে পানি প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেই অধিকাংশ জনবসতি, নগরসভ্যতা, শিল্প-কারখানা ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ ঘটেছে। খাদ্য উৎপাদনে, গৃহপালিত পশুর পুষ্টি জোগাতে, কাঁচামাল প্রস্ততকরণে এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন বিকাশে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পানি অপরিহার্য।

বিজ্ঞানীদের হিসাবমতে ১% এরও কম পানি মানবজাতির ব্যবহারযোগ্য। পৃথিবীর ৯৭% এরও অধিক পানি দিয়ে গঠিত হয়েছে সমুদ্র, অপরদিকে হিমবাহ তুষারস্রোত বন্দি করে রেখেছে আরো ২% পৃথিবীর পানি। মানবজাতির ব্যবহার উপযোগী ১% পানির অর্ধেক রয়েছে ভূ-পৃষ্ঠের আধা মাইল নীচে- যা মানুষের আয়ত্বের বাইরে। অবশিষ্ট পানি সরবরাহ রয়েছে নদী, লেক ও ভূগর্ভে। পানি-চক্র বা Hydrologic cycle  হলো পানির মেঘ থেকে মাটি ও সমুদ্রে পরিভ্রমণ প্রক্রিয়ার বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থা যা কখনো শেষ হবার নয়। পানিকে, বাড়িতে, স্কুলে ও নগরে এনে মানবজাতি পানি চক্রে বাধার সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতিতে কোনো নতুন পানির সৃষ্টি হয় না। ভূমণ্ডলের পানি লক্ষ লক্ষ বছরের পুরাতন এবং তা প্রতিনিয়ত পুনঃব্যবহারোপযোগী (recycled)  হচ্ছে। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে আমরা একই পানি ব্যবহার করে আসছি।

মহাকালের ধারায় সহজাত আগ্রহ ও প্রয়োজন থেকে প্রকৃতিকে খুঁজে ফিরেছে মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় মানুষের হাতে জন্ম নিয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ধর্ম, শিল্পসহ সবকিছুই। অন্যদিকে প্রকৃতির আপন সৃষ্টি নদী। আমাদের অঞ্চলের নদ-নদীগুলো প্রবাহিত হচ্ছে প্রায় ৬০ লাখ বছর ধরে। প্রাচীনকাল থেকেই এসব নদ-নদীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে মানুষের জীবন চক্র। এখনো কোনো না কোনোভাবে প্রয়োজনের তাগিদে নদী অববাহিকায় বসতি  গড়ে তুলছে মানুষ। আমাদের সম্পদ, সংস্কৃতি, সমাজ, জীবনযাত্রা সবসময়ই নদীর বাতাস ও স্রোতকেন্দ্রিক। আহার-বিহার, বসন-ব্যসন, সুখ-দুঃখ, আমাদের মানস-সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অতি একান্ত সব কাজেই ভূমিকা রয়েছে নদীর। আমাদের রয়েছে ১০ দশমিক ১৩ লাখ হেক্টর নদী-নালা, খাঁড়ি ও মোহনা অঞ্চল। রয়েছে ২৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর প্লাবনভূমি ও হাওড়। রয়েছে ১ দশমিক ১৪ লাখ হেক্টর বিল, সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর বাওড়, ৬৮ দশমিক ৮ হাজার হেক্টরের কাপ্তাই হ্রদ ও ৩ দশমিক শূন্য ৫ লাখ হেক্টর পুকুর-দীঘি। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের আয়তন ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নদীর মোহনা রয়েছে ২৭৫ কিলোমিটার। নদীর জন্যই আমাদের বসতি। আমাদের আয়নির্ভর কর্মসংস্থানেরও জোগান দিয়ে চলেছে নদী। বাংলাদেশের সব নদীর উৎস ভারতের পাহাড়-পর্বত থেকে। পাহাড়-পর্বত থেকে বয়ে আসা পানি নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশে। সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে ঠেলে সমুদ্রের দিকে নিয়ে আমাদের জীব-বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে আসছে হাজার বছর ধরে। গঙ্গা-পদ্মা-যমুনা-মেঘনাসহ সব নদীর পানি এক অমূল্য সম্পদ। নদীই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। নদী তীরেই গড়ে ওঠেছে বন্দর, শহর। নদীর পানি সম্পর্কে একটি প্রবাদ আছে- ‘জাতের মাইয়া কালাও ভালো- নদীর পানি ঘোলাও ভালো’। নদীর পানিকে কেন্দ্র করে অববাহিকার লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। মাছ ধরা, নৌ-পরিবহন, সেচ, গোসল, রান্না-বান্নার কাজে নদীর পানির ব্যবহার আবহমানকাল থেকে।

মানবদেহেও তিন ভাগ পানি। পানি ছাড়া মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও গাছপালা বেঁচে থাকতে পারে না। পানি আমরা পাই প্রকৃতি থেকে। সমুদ্র, নদী, খাল, বিল, হাওর, জল-প্রপাত, ঝরনা প্রভৃতি পনির উৎস প্রকৃতিরই দান। আগে মানুষ নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর থেকেই পানি সংগ্রহ করত জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে মানুষ প্রথমে কূপ খনন করে ও শহরে নদীর পানি শোধন করে পান করত। ঢাকাসহ বড় বড় শহরে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করা হয়। পানির প্রধান উৎস সমুদ্র। ভূগর্ভস্থ পানি, হ্রদ, নদী, খাল-বিল হাওর-পুকুর ও জলধার হচ্ছে পানির প্রাথমিক উৎস। এসব পানি আসলে সমুদ্রেরই পানি। সূর্যতাপে বাষ্প হয়ে সমুদ্রের কোটি কোটি টন পানি মেঘরূপে উপরে ভেসে বেড়ায়। এই মেঘ থেকেই বৃষ্টি হয়। আবার উঁচু পর্বতের গায়ে যে বরফ জমে তাও এ মেঘ থেকেই। বৃষ্টির পানি ও পর্বতের বরফগলা পানিই পাহাড় বেয়ে নদী দিয়ে আবার সমুদ্রে পতিত হয়। এই পানিরই একটি ক্ষুদ্র অংশ সমতলের বিল-হাওর, খাল, পুকুরে জমা হয়। যা নিয়ে শুষ্ক মৌসুমে মানুষ নানা কাজ করে থাকে। হাওর হচ্ছে মিঠা পানির এক বিশাল আধার, চারদিকে অথৈ পানি আর পানি, সমুদ্রসম এর বিস্তৃতি ও বিশালত্ব। আমাদের প্রায় পাঁচ হাজার বর্গমাইল আয়তনের হাওর এলাকায় মূলত দুটি মৌসুম: বর্ষা ও শুকনো।

দেশের আর্সেনিক সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ পানীয় জলের জন্য বৃষ্টি, পুকুর, নদী ইত্যাদির পানি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। এই সমস্ত উৎসের পানি ব্যবহারের জন্য পানি পরিশোধন বা পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে ভূ-পৃষ্ঠের পানি পরিশোধন করে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। ভূ-পৃষ্ঠের পানি পরিশোধনের জন্য পুকুরের পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কুয়ার পানি ব্যবহার এবং আর্সেনিক দূষিত নলকূপের পানি পরিশোধনের জন্য আর্সেনিক আয়রন মুক্তকরণ পদ্ধতিসহ আর্সেনিক মুক্ত করার নানা ব্যবস্থা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালু হয়েছে। অতিসম্প্রতি গ্রামীণ এলাকাকে আর্সেনিক মুক্ত নলকূপ স্থাপনের লক্ষ্যে ৯ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি আর্সেনিকমুক্ত ও নিরাপদ। বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ এর ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া আছে কি না তা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। তবে, নিরাপদ পানির জন্য ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন উৎসের মধ্যে বৃষ্টির পানি ছাড়া অন্য কোনো পানি বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ না করে পান করা যায় না। খাল-বিল এবং জলাশয়সমূহে গৃহস্থালী, কলকারখানা ও মানব বর্জ্য জমা হয়ে দূষিত হয় নিরাপদ পানির উৎস ও পরিবেশ পানি দূষণ সম্পর্কে জনগোষ্ঠীর অসচেতনায় রোগাক্রান্ত হয়। মোট রোগের ৮০ শতাংশ রোগই হচ্ছে পানিবাহিত রোগ এবং ডায়রিয়া, টাইফয়েড, কৃমি, হেপাটাইটিস-বি এবং পাতলা পায়খানার মত রোগের শিকার হচ্ছে মানুষ ঘন ঘন। এখনও বেশিরভাগ মানুষ দূষণমুক্ত নিরাপদ পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। পানির এই ঘাটতির কারণে বিবিধ সমস্যা কোষ্ঠকাঠিন্য, কিডনীতে পাথর, হাঁপানি, দাঁতের অসুখ, ঠাণ্ডা, ক্যান্সার ইত্যাদি হতে পারে। মানবদেহের ওজনের উপর ভিত্তি করে প্রতিদিন কম করে হলেও ৮ থেকে ১২ কাপ পানি পান করা উচিত। ব্যায়ামকালে, গরমের দিনে বাড়তি পানি পানের প্রয়োজন হয়।

আর পড়ুন:   গরুর মাংসে হাড় বেশি দেয়ায় সংঘর্ষ, আহত ২০

আমাদের দেহের প্রস্রাবে বিদ্যমান কেলসিয়াম, ইউরিক এসিড এবং অন্যান্য পদার্থ ঘন হয়ে কেলাসিত হয়ে উঠলেই পাথর গড়ে উঠে। পর্যাপ্ত পানি পান করলে এই ঘনত্বের পরিমাণ কমে যায় ফলে পাথর সৃষ্টি হতে পারে না। এইসব থেকে উত্তরণ ঘটাতে পরিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা বড় বিষয়। বাংলাদেশের পানি সম্পদের প্রাপ্যতা বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় পাওয়া যায় এবং তা মূলত তিনটি মাধ্যমে থাকে। (১) বৃষ্টিপাতের পানি (২) নদী ও অন্যান্য জলাশয়ের পানি (৩) ভূ-গর্ভস্থ পানি।

বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সময় অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন মাত্রায় হয়ে থাকে। দেশের বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮০ ভাগ বৃষ্টি হয়ে থাকে এপ্রিল- সেপ্টেম্বর সময়ে এবং সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়ে থাকে সিলেট অঞ্চলে। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাৎসরিক ৫৬৯০ মি.মি. বৃষ্টি হয়ে থাকে এবং পশ্চিমাঞ্চলে এর পরিমাণ হলো ১১১০ মি.মি.। দেশের গড় বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ২৩০০ মি.মি. এর মধ্যে বাষ্পীভূত হয়ে যায় প্রায় ১০০০ মি.মি.। তাই আমাদের ব্যবহারের জন্য মোটামুটি ১৩০০ মি.মি. অবশিষ্ট থাকে। বাংলাদেশের অসংখ্য নদী-নালার দেশ এবং সারাদেশে নদী-নালাসমূহ জালের মত বিস্তৃত হয়ে আছে। সারাদেশে প্রায় ২৩০টি নদী বিদ্যমান মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪১৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কর্ণফুলী, ইছামতি ইত্যাদি অন্যতম। এ সমস্ত নদীসমূহ নিয়ে প্রতিদিন  গড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি দেশের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে।

দেশে উন্মুক্ত জলাশয়ের মধ্যে কাপ্তাই লেক বৃহত্তম এবং অন্যান্য জলাশয়ের মোট আয়তন ১২০০ বর্গ কি.মি.। সারাদেশে মোট পুকুরের সংখ্যা ১৭,৬৭,১২৭টি- যা ২২,১১,৩০০ একর। এইসব মাধ্যমগুলো হতে পানির সরবরাহ  বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় পাওয়া যায়। শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমের সরবরাহের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে গড়পড়তা। পানিপ্রাপ্যতার এই হেরফের মোকাবিলা করতে শুরু হয়েছে বোতলজাত পানির সরবরাহ। বৈধ-অবৈধতার বেড়াজালে আটকা এই বোতল পানি নিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পত্রিকার শিরোনাম হয়। জনসাধারণ; ভোক্তারা নিশ্চিত বিশুদ্ধ পানির আকাঙ্ক্ষায় ভ্রান্তিতে পরে। বোতলজাত পানির নিশ্চয়তা দেয় বিএসটিআই। সহজ-সরল প্রযুক্তির তেমন হিসাব নিকাশ না থাকায় সারাদেশে অন্তত ৫ হাজার কারখানা গড়ে ওঠেছে বিশুদ্ধ পানি তৈরির নামে। এর মধ্যে বিএসটিআইর অনুমোদন রয়েছে ৪শ’টির। ইতিমধ্যে রাজধানী ও আশপাশের ৪৪টি কারখানার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রচলিত যে কোনো পণ্যের জন্য বাজারজাতকরণে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক, বিএসটিআই’র ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর এসব পণ্যের ছাড়পত্র দেয়া হয়। বোতলজাত পানির ক্ষেত্রে মাত্র ২০ ভাগের মান ভালো বলে নিশ্চিত করেছে। বিএসটিআই পানি বাজারজাতকরণের সার্টিফিকেট মার্কস (সিএম) লাইসেন্স দেয়ার সময় বিশুদ্ধ পানির উপাদানগুলোর পরিমাণ উল্লেখ করে দেয়। এই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি লিটার পানিতে উপাদান থাকতে হবে: পিএইচ ৬.৪ থেকে ৭.৪, টিডিএস ২৬০ মিলিগ্রাম, ক্যাডমিয়াম .০০৩, লেড .০১, ক্লোরাইড ২৫০, নাইট্রেট ৩ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম পানিতে আর্সেনিক ও সায়ানাইড গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রতিলিটার পানিতে গ্রহণযোগ্য উপাদানগুলো হলো: আর্সেনিক ০.০৫ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৭৫ , ক্লোরাইড ২০০, ক্যাডমিয়াম ০.০০৫, কপার ১, ফ্লোরাইড ১, আয়রন ০.০০৫, কপার ১, ফ্লোরাইড ১, আয়রন ০.১-০.৩, লেড ০.০৫, মার্কারি ০.০০১, ম্যাগনেশিয়াম ৩০-৫০, ম্যাঙ্গানিজ ০.০৫, নাইট্রেট ১০-৪৫, পিএই ৭-৮.৫, সালফেট ২০০, টিডিএস ৫০০, টোটাল হার্ডনেস ১০০ এবং জিঙ্ক ৫ মিলিগ্রাম। পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে, বাজারের বেশিরভাগ পানিতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে নামমাত্র। ক্ষতিকারক নাইট্রেট, আর্সেনিক ও সায়ানাইড যথাযথভাবে শোধন করা হয় না।

আর্সেনিক খনিজ পদার্থ জাতীয় একটি গোপন বিষ, এ বিষ এক সঙ্গে অধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে মারাত্মক হতে পারে। এর কোন স্বাদ, গন্ধ বা বর্ণ নেই। পানিতে এর পরিমাণ নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। আর্সেনিক নানাভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। কীটনাশক, কাঠ সংরক্ষণ, পশুখাদ্য, চিকিৎসা, ইলেকট্রনিক ও বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মানবদেহে আর্সেনিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটার পানিতে ০.০১ মি.গ্রা.। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটার পানিতে ০.০৫ মি.গ্রা.। বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে নানা এলাকায় যে বিপুল জনসম্প্রদায় বিশুদ্ধ পানির অভাবে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে তাদের দুই-তৃতীয়াংশের বাস এশিয়ায়। বাংলাদেশও পানি সংকটে নিপতিত দেশগুলোর একটি। মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার উপযোগী পানির অভাবও এদেশের কোনো কোনো স্থানে প্রকট। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ বিশু দ্ধ পানির জন্যে টিউওয়েলের উপর নির্ভর করে। পানি যেমন জীবন আবার তা মরণেরও কারণ। পানীয়জল বিশুদ্ধ না হলে নানা রোগে মৃত্যু ঘটে। নদী, নালা, খাল, বিলের পানি যদি কল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য দ্বারা দূষণ করা হয়- তাহলে সে পানি হয় মানুষ, পশুপক্ষী ও কীটপতঙ্গের জন্য মরণ।

আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের একটি লাইন আছে ‘ওমা তোর বদনখানি মলিন হলে- আমি নয়ন জলে ভাসি।’ বাংলাদেশের বড় বড় শহর সংলগ্ন নদ-নদীর পানি শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য কারণে দূষিত হয়ে বাংলা মায়ের বদন মলিন করে দিয়ে আমাদের নয়ন জলে ভাসার অবস্থায় নিয়ে এসেছে।

আজ থেকে ৫০-৬০ বছর পূর্বে এদেশের বেশির ভাগ মানুষ পুকুর, নদী খালের পানি পান করেই বেঁচে থাকত। তারা প্রাকৃতিক পানি অনেকটা বিশুদ্ধ ছিল বলেই মানুষের তেমন অসুখ-বিসুখ হতো না। বর্তমানে পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের বেশির ভাগ পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার পানি পান করে থাকে। তারা এখনো মোটামুটি ভাল আছে। জাতিসংঘ এক হিসাবে বলছে, ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষ বিশুদ্ধ পানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ১৯৯৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২৮টি দেশ পানির সংকটে জর্জরিত, যা ২০২৫ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হতে পারে পানিসংকটের প্রেক্ষাপটে আগামী ২০৫০ সালে ৯৩০ কোটি জনসংখ্যার ৭০০ কোটিই ভুগবে পানিসংকটে। যথাযথ মানের পানির অভাবে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ দূষিত পানিজনিত রোগে মারা যায়। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের ২০০০ সালের সমীক্ষামতে, ৭০ শতাংশ পানি কৃষির জন্য, ২০ শতাংশ শিল্প আর মানুষ ১০ শতাংশ গার্হস্থ্য প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে পানির সংকট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সংঘাতের মূল কারণ। কনভেনশন টু কনভার্ট ডিজার্টিফিকেশনের খতিয়ান অনুযায়ী, তীব্র খাদ্য চাহিদার বিপরীতে যথেচ্ছভাবে পানীয় জলের ব্যবহারের কারণে ইতিমধ্যেই চীনের ২০ শতাংশ ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর দুই হাজার ৪৬০ বর্গমাইল এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। প্রায় ৪০ কোটি জনসংখ্যা এই মরুপ্রবণ এলাকায় বাস করছে পানিস্বল্পতাকে নিয়তি মেনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দিন দিন বাড়ছে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা। সুপেয় পানির অভাবে দিন যাপন করে বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৪৭ শতাংশ মানুষই তীব্র পানির সংকটে পড়বে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘এনভায়রনমেন্টাল আউটলুক টু ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যে জনসংখ্যা, শিল্প-কারখানা আর বাড়তি চাহিদার কারণে বিগত অর্ধশতকে ভূগর্ভস্থ পান উত্তোলন বেড়েছে তিনগুণ।

আর পড়ুন:   এইচ এম এরশাদ আর নেই

পানিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে সংগঠিত হয়েছে যুদ্ধ। ৪ হাজার ৫০০ বছর আগের টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিতকায় তখন নগর রাষ্ট্র লাগা ও উমার যুদ্ধে জড়িয়েছিল। আধুনিক সময়েও পানি নিয়ে আরও দুটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। একটি ১৯৬৭ এবং অপরটি ১৯৮৯ সালে। সাবেক ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট অ্যারিয়েল শ্যারন ওই সময় ১৯৬৭ সালে আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর প্রসঙ্গে পানিকেই উল্লেখ করেছিলেন। আর সেনেগাল নদীর আধিপত্য পেতে ১৯৮৯ সালে সেনেগাল ও মৌরিতানিয়া যুদ্ধে জড়ায়। জাতিসংঘের মতে, ২০২৫ নাগাদ ৩০টি দেশ পুরোপুরি পানির সংকটে পড়বে। গত শতাব্দীর ৯০ দশকে এ ধরনের দেশের সংখ্যা ছিল ২০। এসব দেশগুলোর কেন্দ্রবিন্দু মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা। বলা হচ্ছে, পরবর্তী পানি যুদ্ধটি দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেনের মধ্যেই হওয়ার সম্ভাবনা। আবার মিসরের নীল নদ হতে পারে এ সংঘাতের আরেকটি কেন্দ্র। এ অঞ্চলগুলো ছাড়াও এশিয়ার একটা অংশ এবং আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পানির সংকট থাকায় সেখানে এ ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এখনও অনেক দেশই পানি আমদানি করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায়। আবার অনেকে পরোক্ষভাবে পানি আমদানি করে দেশের প্রকৃত পানির চাহিদা নি¤œমুখী রাখে। দেশগুলো নিজস্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে এ কৌশল নেয়। সিঙ্গাপুরে সমুদ্র থেকে মাটি তুলে ছোট্ট একটি দ্বীপকে সাজিয়ে-গুছিয়ে তৈরি করেছে পানি শোধনাগার। এ মহাযজ্ঞটি ১৯৬০ এর দশকে শুরু করেন আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ান ইউ। ১৯৯০ এর দশক থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করতে সিঙ্গাপুরের নেতৃত্ব দেন গো চোক তং। ৭১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ দেশটির চারিদিকে শুধু জল আর জল। তারপরও দেশটিকে মালয়েশিয়ার জোহর নদী থেকে পাইপ দিয়ে বিশুদ্ধ পানি এনে জীবন-জীবিকা পরিচালনা করতে হয়। সিঙ্গাপুরের মোট পানি চাহিদার ৪০ শতাংশ আসে এই জোহর নদীর জলাধার থেকে। মেক্সিকো, জাপান, চীন, ইতালী, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ ফ্রেশ পানি আমদানি করে। তেলের মতো পানিও জাহাজ দিয়ে, বোতলজাত করে বা আন্তঃদেশীয় পাইপ লাইন স্থাপন করে আমদানি-রপ্তানি হয়। বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম পানি আমদানিকারক ব্রিটেন। দেশটি নিজস্ব উৎস থেকে মোট চাহিদার মাত্র ৩৮ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে পারে। ৬২ শতাংশ পানির চাহিদাই স্পেন, মিশর, মরোক্কো, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান থেকে আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো বিশুদ্ধ পানি আমদানি করে কানাডা থেকে। পানি আমদানি শুধু যে বোতলজাত করে বা পাইপ দিয়ে সরাসরি আমদানি করতে হবে তা কিন্তু নয়। কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্য আমাদানির মাধ্যমেও প্রকারান্তরে পানি আমদানি করা হয়। বিশ্বের সর্বাধিক শুকনো অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো খাদ্য আমদানি বাড়াতে হয়েছে পানি সংক্রান্ত চাষাবাদ সংকটে।

এমন একটা দিন অপেক্ষা করছে, যখন আমরা দেখবো চারদিকে মরুভূমি। গাছ নেই, পানি নেই। একবিন্দু বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চলছে। উদ্ভূত যে কোনও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার মতো নানা কৌশল উদ্ভাবন এবং সেগুলো প্রয়োগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নোনা পানি থেকে ফসলি জমি রক্ষা করা; অধিক সংখ্যায় মানুষ যাতে বাস্তুচ্যুত না হয়, তার ব্যবস্থা নেয়া। নোনা পানিসহনশীল কৃষিপদ্ধতি উদ্ভাবনে মনোনিবেশ ঘটানো।

এই ব্যাপারে বাংলাদেশ কাগজে কলমে অনেকটা এগিয়ে। দেশে রয়েছে একটি স্বতন্ত্র পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড পানি গবেষণা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি। এইসব পথ দেখিয়ে গেছেন আমাদের জাতির পিতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের অল্প কিছুদিন পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজ শুরু করেন। তাঁর দূরদর্শিতায় সমুদ্র বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয় (The Territorial Water and Maritime Zones Act 1974)|  স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্রে জাতির পিতাকে আমরা দ্রুত হারিয়ে ফেলি। তাঁর অনেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এরপর দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক সমুদ্র সম্পদ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য অর্জিত হয়নি। সমুদ্র সীমানা নিয়ে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যে বিরোধ ছিল, তার নিষ্পত্তি না হওয়ায় সমুদ্র সম্পদ ব্যবহারে কোন জোরালো পদক্ষেপও নেয়া সম্ভব হয়নি। অবশেষে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অসাধারণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তাঁর সরকার দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সমুদ্র নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করেন। আদালতের রায়ে মার্চ ২০১২ মিয়ানমার, জুলাই ২০১৪ ভারতের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি হয়। পানি নিয়ে ভাবনার একপ্রস্থ নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। সমুদ্রে আমাদের একচ্ছত্র অধিকার নিশ্চিত হয়। এখন দরকার, প্রয়োজন এই সম্পদকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। যেহেতু পানির প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্র সীমাহীন। পানি সম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, পানি সম্পদের পরিমাপ, পানি সম্পদ ও জলীয় প্রতিবেশ-ব্যবস্থা সুরক্ষা, খাবার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, পানি ও টেকসই বিধি উন্নয়ন, টেকসই খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ উন্নয়নে পানির ব্যবহার এবং পানি সম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ে অধিক সচেতন হওয়া।

ধনী ও দরিদ্র ভেদে সবার জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সকল ক্ষেত্রে পানি ব্যবহারকারী সমান ও নিরাপদ সুযোগের অঙ্গীকারের প্রতি দৃষ্টি প্রদান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। পানির গুণ ও পরিমাণ সংরক্ষণ আজ বিশ্ববাসীর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। পানির চলমান উন্নয়নকে বহাল রাখার জন্য প্রয়োজন বিশ্ব জনসচেতনতা। মানুষকে পানিচক্র সম্পর্কে হতে হবে জ্ঞানসম্পন্ন। তাদের থাকতে হবে সকল ও সীমিত পানির ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে হতে হবে জ্ঞানসম্পন্ন। সীমিত পানির ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দক্ষতা। মানুষের জ্ঞানই সৃষ্টি করতে পারে এরকম একটি সাংস্কৃতিক চর্চার জগৎ যাকে বলা যাবে ‘নীল বিপ্লব’। বিশ্ব পানি দিবসের এটিই আন্তর্জাতিক ভাবনা।

বিশুদ্ধ পানির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিশ্বব্যাপী পানিকে ‘নীল স্বর্ণ’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য আছে। আছে ঐতিহাসিক অধিকার। এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এতে বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে এই পানির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই। এইজন্য দরকার পানি বিষয়ে নিবিড় গবেষণা ও বিশেষায়িত শিক্ষা। পানি বিষয়ক একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে জাতির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ বাতলে দিতে পারে। বাংলাদেশে-তো প্রতিটি জেলায় নানাপথ, মত ও কিসিমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক আছে। এখানে হোক না জনগুরুত্বের বিশ্বপ্রেক্ষাপটে একখানা আন্তর্জাতিক মানের ‘পানি বিশ্ববিদ্যালয়’।

লেখকঃ সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক

khanaranjanroy@gmail.com