৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

খন রঞ্জন রায়  *

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশের প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদ-নদী ও তার শাখা প্রশাখা। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের সেচ কাজের জন্য নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নদীকে উপজীব্য করে হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। নদী ও তার আশেপাশের মানুষের জীবনযাত্রার ছবি তুলে ধরে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিকের কলমে রচিত হয়েছে তাদের জীবনগাঁথা। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কাঁদো নদী কাঁদো, ‘পদ্ম নদীর মাঝি’ উপন্যাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হক তার আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে এ দেশের নদীর কথা বলেছেন কবিতায়- ‘আমি জন্মেছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি, আমি বাংলার আলিপথ দিয়ে হাজার বছর চলি। চলি পলি মাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে। তেরো শত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে? কবির হিসাব ধরলে তেরো শত নদীর এ বাংলাদেশ। মঙ্গলকাব্যে চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যের কথা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐতিহ্য হাজারো নদী এ দেশের ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ। নদীগুলো এ দেশকে করেছে সৌন্দর্যময়, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা। শ্যামল মাটির অঙ্গে এ নদীগুলো এ দেশের প্রাণ। হাজারো গানের উপজীব্য নদী।  ‘এই পদ্মা এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমানদী তটে/ আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়/ এ আমার দেশ / এ আমার প্রেম/ আনন্দ বেদনা মিলন বিরহ সংকটে…….। নদীকে কেন্দ্র করে এমন সমৃদ্ধ গানের সংখ্যা অনেক। কবিতা তো নদীকে আরেক রূপ দিয়েছে।

চিত্রশিল্পে নদী, নদীর বুকে পাল তোলা  নাও, নদীর ঢেউ, নদী ও নারীর ছবি এঁকেছেন চিত্রশিল্পীরা। এ দেশের নদীর পাড়ের দৃশ্য পর্যটকদের মন কাড়ে। নদীর কাছে প্রেরণা আছে, অফুরন্ত রূপ আছে, রূপের মহিমা আছে। তাই তো নদীতে নৌকার মাঝি আপন মনে গেয়ে ওঠেন ভাটিয়ালি, মারফতি আর মুর্শিদি গান। পদ্মা নদী নিয়ে বিখ্যাত গান রচনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম- ‘পদ্মার ঢেউ রে / মোর শূণ্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যা রে…….। বিখ্যাত গানের শিল্পী আবদুল আলীম গাইলেন- সর্বনাশা পদ্মা নদী/ তোর কাছে শুধাই / বল আমাদের তোর কিরে আর / কূলকিনারা নাই।’

ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যবাহী, প্রাণস্পন্দনের নদী আর খালবিলের অনেকগুলোই এখন মৃত। প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানুষের কারণে এসব মৃত। অবশিষ্ট আছে যে সব ধারা বা জলা সেগুলো কেবল বর্ষাকালে জেগে ওঠে, হাঁটুজল থাকে। বৈশাখে তারা একেবারেই মৃত। অথচ সহস্র সহস্র বছর ধরে বাঙালির জীবন-সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও অর্থনীতিতে নদীই প্রধান ভূমিকা পালন করে। বাঙালির গ্রাম-গঞ্জ শহরগুলোও নদীর পাড়ে পাড়ে, বারো মাসে তেরো পার্বণের রসদ বয়ে নিয়ে আনে নদী। নদী যাতায়াতের পথ ও নদী মাল পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অর্থনীতিকে রাখে সচল। নদী কেবল আমাদের দেহের খাদ্যই দেয় না; মনের খাদ্যের জোগানও দিয়ে থাকে। নদীর স্নেহ-মমতা, ভালবাসা, শাসন-শোষণ জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষের শৈশব-কৈশোরে, জীবন-যৌবনে। নদীর চোখের সামনেই বেড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষ। নদী থেকে প্রাপ্ত সম্পদ মাছ আমাদের প্রধান খাদ্য।

আর পড়ুন:   মগবাজারে বিস্ফোরণে নিহত ৬,অর্ধশতাধিক আহত

বাঙালির মাছে- ভাতে জীবন। এ মাছ ও ভাত উভয়ই আনে নদী। বাঙালি তাই জ্ঞান হওয়ামাত্র সবার আগে যাকে চেনে সে নদী। বাংলাদেশে এমন কিছু নদী আছে যার তুলনা নেই সারা বিশ্বে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। এই তিনটি নদীর বিশালত্ব পুরো বাংলাকেই আলাদা অঞ্চলে ভাগ করে দিয়েছে। পদ্মার পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণে দক্ষিণবঙ্গ, উত্তরে উত্তরবঙ্গ। যমুনার পূর্বে মধ্যবঙ্গ, মেঘনার পূর্বে পূর্ববঙ্গ। অতীতে এসব এলাকার নানা নাম ছিলো যথা রাঢ়, গৌড়, বরেন্দ্র, বঙ্গ, বঙ্গাল, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি। এখন এসব এলাকা ভারত ও বাংলাদেশের অংশ। কিছু অংশ রাজ্যেও বিভক্ত।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের প্রায় ৬৪টি জেলাই একটি আরেকটির সঙ্গে ছোট-বড় নদী দ্বারা সংযুক্ত। বাংলাদেশের প্রায় ২৫ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। স্বাধীনতার পর বিআইডব্লিউটিএ যে জরিপ করে, তাতে বাংলাদেশে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। দেশের মোট আয়তনের ৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য হচ্ছে মাত্র চার হাজার কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে তা আরও নিচে নেমে আসে। ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার নদীপথ। নদী বোবা। তাদের ভাষা নেই। তারা তাদের দুরবস্থার কথা বলতে পারে না। মানুষই মেরে ফেলছে নদীগুলোকে। দেশের প্রতিটি নদীই মানুষের আক্রমণের শিকার। দখল, ভরাট, আবর্জনা নিক্ষেপে নদী তার গতি ও ছন্দ হারিয়ে ফেলছে। এগুলো স্রোতহীন আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। রূপসী বাংলার অমর কবি জীবনান্দ দাশের অমর কবিতা ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।’ সেই ধানসিঁড়ি নদীটি কেবল কবিতায় আছে। চর  পরে ভরাট হয়েছে তার দেহ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদও অধিকাংশ স্থানে তার নাব্য হারিয়েছে। নদীগুলোর উজানে মানবসৃষ্ট বাধার জন্য নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে, নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে অনেক নদীতে সেতু নির্মাণ করে নদী প্রবাহে বাধা দেয়া হচ্ছে, আর তাতেই ভরাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পৃথিবীর উন্নত, স্বল্পোন্নত, মধ্যউন্নত প্রতিটি দেশে জাতীয়, আঞ্চলিক নির্বাচনে বয়ে আনে কল্যাণ। আমাদের দেশে নির্বাচনে সস্তায় জনপ্রিয়তা অর্জনে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নদী-নালায়, খালে-বিলে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। পারলে নদীতে কার্পেট/লালগালিচা বিছিয়ে ভোটে জয়লাভ করতে দ্বিধাবোধ করেনা। ১৯১২ সালে পাবনার পাকশি ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মধ্যে ১৮০০ মিটার দৈর্ঘ্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণকালে নদী শাসন প্রকল্পে দুই পার্শ্বে ৪২৭ মিটার নদীর কূল ভরাট করা হয়। সংকুচিত করা হয়েছিল প্রমত্তা পদ্মাকে। নদীশাসনের নামে দুই পার ভরাট আর স্লুইস গেট বসানোতে ভারত থেকে শুষ্ক মৌসুমে কাঁদতে থাকে জলবিহীন চোখে পদ্মা। তার বুকে জমা পড়েছে বালু আর পলি। কোথাও কোথাও হারিয়েছে নাব্য। নৌযান চলাচল বিঘ্নিত প্রায়। আবার কোথাও কোথাও ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতি, স্থাপনা কলকারখানা। অববাহিকার প্রায় এক কোটি লোকের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকির মুখে। পদ্মা শুকিয়ে যে জমি উঠেছে, তা এখন নানাজনের দখলে। বিভিন্ন নদীর মরণদশা হলে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লাভ। দুর্বল হয়ে গেলে নদী ক্রমাগত জমিতে রূপান্তরিত হয়। তখন তা দখল করা সহজ। নদী বাঁচলে তার মূল্য টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। কিন্তু মরলে তার থেকে উঠে আসা জমির দাম শত হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। সে জন্যই নদী বিধ্বংসী উন্নয়ন ধারা বহাল রাখতে অনেকেই আগ্রহী। খোদ রাজধানীতে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদীর মৃতপ্রায় কাহিনী এখন রাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ। ভৌগলিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় নদীর পানিপ্রবাহের ওপরই বদ্বীপ বাংলাদেশের জন্ম, নদী বিপন্ন হলে বাংলাদেশের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। নদী হারানোর সর্বনাশ ১-২ বছরে, ১-২ দশকে বোঝা যায় না। এর প্রভাব মহাকালের।

আর পড়ুন:   পরিকল্পিত পারিবারিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করবে নিরাপদ বিশ্ব

সাম্প্রতিক সময়ে খালে, বিলে নদীতে সেতু নির্মাণ করায় পানিসম্পদ ব্যবস্থায় মানবসৃষ্ট পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক পানি চক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পানির গুণগত মান ও প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে; লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। মিঠা পানির স্বল্পতা ক্রমেই বাড়ছে। এক্ষেত্রে নদী বা জলাশয়ে অপ্রয়োজনীয় সেতু নির্মাণ করতে দেয়া যাবে না। কারিগরিভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব হয় কিন্তু প্রশাসনিকভাবেই এর নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর ক্রমে চাপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে দেশের উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তার জন্য সরকারের আন্তরিকতায় প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০।

কানাডার নদী বিষয়ক আইনজীবী ১৯৮০ সালে যখন বিশ্ব নদী দিবস পালনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তখন এগিয়ে আসে সেখানের ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। নদীর অনেক জল ঘোলা করে ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটিকে অণুসমর্থন করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা সারা বিশ্বে যখন এই দিবস পালন শুরু করে তখন বাংলাদেশও এগিয়ে আসে সেটি ২০১০ সালে। ততক্ষণে বাংলাদেশের নদী, নদীপথ, মানুষের জীবনজীবীকার গতিপথ অনেকখানি বদলে গেছে। হারিয়ে গেছে প্রাচীন ঐতিহ্য। ইতিহাস হয়েছে নদী সম্পর্কিত গল্প আর কল্পকাহিনী। এরপরও মন্দের ভালো, আমরা শুরু করতে পেরেছি। নদীর গতিপথ ফিরে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। মরাকে ভরাতে না ফেলে সেপ্টেম্বরের শেষ রবিবার সারাদিন অন্তত কল্পনা করি নদীর রূপ স্বরূপ নিয়ে। বিশ্ব নদী দিবসের প্রত্যাশা এর বেশী কিছু নয়।

লেখকঃটেকসই উন্নয়নকর্মী

khanaranjanroy@gmail.com