৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের আমির, দেশের কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম শাহ আহমদ শফীর নামাজের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টায় হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

এতে ইমামতি করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফীর বড় ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ।

জানাজাপূর্ব  দেয়া বক্তব্যে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বাবা এতিম করে চলে গেছেন আমাদের । সবাই দোয়া করবেন আমার বাবার জন্য । বাবা দীর্ঘ ৮০ বছর হাটহাজারী মাদ্রাসার খেদমত করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন।

স্মরণকালের সবচেয়ে বড় এ জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, আলেমসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে অংশ নেন কয়েকলাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা ও আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। রাত ১১টার দিকে গেন্ডারিয়ার আসগর আলী হাসপাতাল থেকে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদে আল্লামা শফীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে গোসল এবং কাফন শেষে ভক্ত অনুসারীদের তার মরদেহ দেখার সুযোগ দেয়া হয়। মধ্যরাতে তার মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা দেয়। শনিবার সকালে সাড়ে ৯টার দিকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের(র‌্যাব) পাহারায় হাটহাজারী মাদ্রাসায় এসে পৌঁছায় আল্লামা শফীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স। এরপর তার মরদেহ ভক্ত ও অনুসারীদের দেখার জন্য হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে রাখা হয়।

আল্লামা শফীর মৃত্যুর সংবাদ শুনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে শুক্রবার রাত থেকেই তার ভক্ত অনুসারীরা তাকে শেষবারের মতো দেখতে এবং তার জানাজায় অংশ নিতে হাটহাজারী আসতে শুরু করেন। শনিবার সকালে হাটহাজারীতে মানুষের ঢল নামে। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কে মানুষের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।

একপর্যায়ে হাটহাজারী বাস স্ট্যান্ড থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। হাটহাজারী থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেকে তীব্র রোদের মধ্যে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে জানাজায় অংশ নেন লাখো মানুষ।

আর পড়ুন:   বর্ষার প্রথমদিনেই বৃষ্টি, জনমনে স্বস্তি

দেশের কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জানাজায় অংশ নিতে আসা বিপুল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ এবং  র‌্যাবের‌ পাশাপাশি বিজিবি এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়।

হাটহাজারীতে উপস্থিত হন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন, র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল, পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিট্রেট ড. বদিউল আলমসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা।

পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক  জানান, শফী হুজুরের জানাজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে হাটহাজারীতে পুলিশ, র‌্যাব‌ এবং গোয়েন্দা সংস্থার ৫ শতাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা পুরো এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছেন।

অতিরিক্ত জেলা মাজিস্ট্রেট ড. বদিউল আলম  জানান, জানাজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি হাটহাজারীসহ চট্টগ্রামের ৪ উপজেলায় ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯১৬ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তার বাবার নাম বরকম আলী এবং মায়ের নাম মেহেরুন্নেছা বেগম। তিনি দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। বড় ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ পাখিয়ারটিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক। ছোট ছেলে আনাস মাদানী হাটহাজারী মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক ছিলেন।

রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু হয় আল্লামা শফীর। এরপর পটিয়ার আল জামিয়াতুল আরাবিয়া মাদ্রাসায় (পটিয়া জিরি মাদ্রাসা) পড়াশোনা করেন তিনি। পরে হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা এবং ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন।

১৯৮৬ সালে হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মহাপরিচালক (মুহতামিম) হিসেবে দায়িত্ব নেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

বৃহস্পতিবার একদল শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর ধরে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

আর পড়ুন:   সর্বজনীন স্বাস্থ্য নিরাপত্তা অর্জনে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ

দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এবং বড় মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসার মহাপরিচালক হিসেবে কওমি মাদ্রাসাগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর শীর্ষ সংগঠন আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া, বেফাকুল মাদারিসের চেয়ারম্যান ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যে সংগঠনের আমির হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

বাংলায় ১৩টি ও উর্দুতে নয়টি বইয়ের রচয়িতা আল্লামা শাহ আহমদ শফী। আলেমদের বড় একটি পক্ষের কাছে খুবই শ্রদ্ধার পাত্র তিনি। তবে নারীবিরোধী নানা বক্তব্যের জন্য বিভিন্ন সময় সমালোচিত হন এই আলেম।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে দেশব্যাপী আন্দোলন করে তিনি আলোচনায় আসেন। তার প্রচেষ্টায় কওমির সনদের স্বীকৃতি এবং সুপ্রিম কোর্ট থেকে ভাস্কর্য অপসারণের ঘোষণা দেয় সরকার।

বার্ধক্যজনিত কারণে অনেক দিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। গত কয়েক বছরে তিনি বেশ কয়েকবার দেশ ও দেশের বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শুক্রবার তার অবস্থার অবনতি হলে বিকেলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ হাসপাতালেই দেশের কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।