৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

এমডি পদে একই ব্যক্তিকে বারবার চুক্তিভিত্তিক  নিয়োগ দেয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসা নিয়ে জনমনে ধোঁয়াসা তৈরি হয়েছে। ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিসহ নানান অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ৭৯বছর বয়সী প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ’র মেয়াদ আরও তিনবছর বাড়ানোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা বোর্ড। ওয়াসা বোর্ড বিতর্কিত একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে আরও ৩বছর মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় চট্টগ্রামের সর্বমহলে সমালোচনার ঝড় বইছে। “আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত”- ওয়াসাভবনের দেয়ালে এ স্লোগানসম্বলিত পেস্টুন সাঁটিয়ে অবাধে দুর্নীতির মহোৎসবে মেতে আছেন প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ।
চট্টগ্রাম ওয়াসার গ্রাহকস্বার্থের চেয়ে এমডি’র ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত রয়েছেন বোর্ড সদস্যরা। বোর্ডের অনলাইন সভায় ১৩ সদস্যের মধ্যে ১২জন উপস্থিত থেকে সকলেই অন্ধভাবেই এমডির মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেন। চতুর্থদফায় এমডির মেয়াদ বৃদ্ধির সুপারিশ করে থেমে নেই বোর্ড সদস্যরা, তা বাস্তবায়নের জন্যেও তাঁরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে তদবির শুরু করেছেন- এমন খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে গত ৯বছরে হাজার কোটি টাকা লোপাট হলেও ওপরমহলের আর্শিবাদ ও বোর্ড সদস্যদের সম্মিলিত সহযেগিতায় এমডি প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হন।
প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ চট্টগ্রাম ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় কর্তব্যে অবহেলার জন্যে বরখাস্ত হন । চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার জন্যে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদ থেকে অবসর নেন। অবসরগ্রহণের পর তিনি সোস্যাল সেভিংস এন্ড কো- অপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হন। এখানে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১/১১ এর সময় দুদফা গ্রেপ্তার হয়ে জেলের ঘানি টানেন। জনগণের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এখনো চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ৬টি মামলা রয়েছে। দুর্নীতিদমন বিভাগেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে- যা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন। চট্টগ্রাম ওয়াসায় কর্মরত দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫%-৮% টাকা ঘুস নিয়ে আমেরিকায় পাচারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর কাছে আমেরিকার গ্রীনকার্ড আছে, আছে সেকেন্ড হোম, তাই প্রায়ই তিনি আমেরিকা সফর করেন।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তদের ১০লাখ টাকা করে দেয়ার কথা বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়-এমন অভিযোগ ওপেন-সিক্রেট। এছাড়া জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিলাসবহুল গাড়ি উপঢোকন নেয়ার অভিযোগ সকলের মুখে মুখে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর স্বজনকে কয়েকহাজার কোটি টাকার কাজ অবৈধভাবে পাইয়ে দিয়ে নিজআসন আমৃত্যু ধরে রাখতে চাইছেনএমডি ফয়জুল্লাহ। তাঁর দুর্নীতির একমাত্র সহযোগী ওয়াসার শ্রমিকনেতা তাজুল ইসলাম- যিনি সকল অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি ওয়াসা’র অঘোষিত এস্টেট অফিসার।নিয়মনীতি ছাড়া কর্মচারিদের বাসা বরাদ্দ দেয়া,পানির অবৈধ লাইনসংযোগ সবকিছুই তাজুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে। তিনি ইতোমধ্যে দু’শতাধিক কর্মচারি নিয়োগ দিয়েছেন-যাদের অধিকাংশের বাড়ি কুমিল্লা ও নোয়াখালী। মন্ত্রী-এমপি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামভাঙ্গিয়ে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ ‘র বোর্ড সদস্যদের ওপর এমনই প্রভাব তৈরি করেছেন যে, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই খেয়ালখুশি মতো যেকোনো কিছু করতে পারেন। নিয়মানুযায়ী বোর্ডের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও তা অনুসরণ না করে এমডি প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ ক্যাব প্রতিনিধি ছাড়া ঠিকাদারদের টাকায় “ওয়াসা নাইট’ উৎসব পালন করেছেন। রাজকীয়ভাবে রেডিসন ব্লুতে আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে গ্রাহক সমাবেশের নামে আমোদফূর্তি করার খবরও পত্রপত্রিকায় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম ওয়াসার জন্যে ১৩হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দিলেও নগরবাসী তার সুফলের বদলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পাইপলাইনের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি, বিভিন্ন রাস্তা একাধিকবার খোঁড়াখুঁড়ি, পানি উৎপাদনের অসত্য তথ্য প্রচার, ভুয়া ও ভুতুড়ে পানির বিল দিয়ে গ্রাহক হয়রানিসহ নানান অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা লেগেই আছে। পানি শোধানাগার ও পাম্পহাইজগুলোতে ডিজিটাল মিটার স্থাপন করা হয়নি। ফলে এখানে পানি উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। প্রতিদিন ৩০/৪০ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের মনগড়া তথ্য পরিবেশন করা হয়।
চট্টগ্রাম ওয়াসার কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির ব্যাপারে “শূন্যসহিষ্ণুতা” নীতি বাস্তবায়নের জন্যে একজন সৎ ও গতিশীল লোককে এমডি পদে পদায়ন করা হোক-এটিই চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা।
এদিকে চট্টগ্রাম ওয়াসার অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বিষয়ে বোর্ড সদস্য সাংবাদিক মহসিন কাজীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সরকারি সার্কুলার অনুযায়ী আমরা যে যা জানি তার বাইরে বলার সুযোগ নেই।বোর্ডসভায় যা সিদ্ধান্ত হয় তা নিয়ে বলতে পারি কিন্তু অন্য বিষয়ে আমার কথা বলার এখতিয়ার নেই। আপনারা তো ওয়াসার ‘হয়রানিমূলক সেবা’ নিয়ে কিছু লেখেন না। ওযাসার পানি যে অবাধে চুরি হচ্ছে, তিনভাগের একভাগ পানি যে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, পানির ভুয়াবিল নিয়ে গ্রাহকেরা যে প্রতিনিয়ত হয়রানি হচ্ছে- তানিয়ে তো লেখেন না। আমি এ নিয়ে ৭২/৭৩হাজার গ্রাহকের পক্ষে ভেতরে বসে সংগ্রাম করছি। আমি এখন অটোমেশন নিয়ে আছি, আমার প্রস্তাবে ওয়াসার সেবামূলক কার্য়ক্রম ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। তখন আর কেউ মিটারের কান মুচড়ে পানির বাইপাস লাইন নিতে পারবে না। মিটার রিডিংয়ের বিল মিটারমালিক ও ওয়াসার মোবাইল স্ক্রীনে চলে আসবে, ভুতুড়ে বিল ও পানি চুরির রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এমডির মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারে জানতে চাইলে সাংবাদিক মহসিন সিডিএসহ দেশের অন্যান্য প্রকল্পের দৃষ্টান্ত তোলে ধরে বলেন,ওয়াসার বড় দুটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, আরও দুটি প্রকল্পের কাজ মাঝামাঝিতে; স্যুয়ারেজের কাজ শুরু হচ্ছে, মীরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে ওয়াসার পানি যাবে। ফলে এসব প্রকল্পের কাজ যিনি শুরু করেছেন, তিনিই যদি শেষ না করেন তাহলে কাজে জটিলতা তৈরি হবে। ওয়াসার চলমান সকল প্রকল্পের কাজ যেহেতু বর্তমান এমডির হাত দিয়ে শুরু হয়েছে, এর শেষও তাঁর মাধ্যম হওয়া প্রয়োজন মনে করছি বলেই আমি এমডি প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ’র মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ।”
৭৯বছর বয়সী চট্টগ্রাম ওয়াসা এমডি প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ’র চাকরির মেয়াদ আরও তিনবছর বাড়ানোর ব্যাপারে চট্টগ্রাম গণঅধিকার চর্চাকেন্দ্র এর চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান চাটগাঁরবাণীডটকমকে বলেন, “সত্যিকারঅর্থে চট্টগ্রাম ওয়াসা এমডি’র বর্তমান বয়স যদি ৭৯বছর হয়. তাহলে তো তিনি দক্ষতার সাথে এ গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারার কথা নয়। তাঁকে তো স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া উচিত। সরকার তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় কমবয়সী যোগ্য ও অভিজ্ঞ কাউকে এ দায়িত্ব দিতে পারে।”
চট্টগ্রাম গণঅধিকার চর্চাকেন্দ্র এর মহাসচিব মশিউর রহমান খান চট্টগ্রাম ওয়াসা’র এমডি’র অনিয়ম-দুর্নীতি সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে যেয়ে চাটগাঁরবাণীডটকমকে বলেন, “ দুর্নীতির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করলেও চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী ফজলুল্লাহ তাঁর বিপরীত শিবিরে অবস্থান নিয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে পৈত্রিক তালুকদারিতে রূপান্তর করে ইচ্ছেমতো ভোগ করছেন। ওয়াসার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থাকে এভাবে চলতে দেয়া যায় না;এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত।”
অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ’র প্রতিক্রিয়া জানতে বারবার তাঁর মুঠোফোনে (০১৮১৯৩৪৫২১৫) কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম