৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের সমালোচনার আগে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধী দলের এ-সংক্রান্ত বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা সমালোচনা করব, কিন্তু যারা কাজ করে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে। মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশকে আগে ডাকে। এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে তারা ভীত হয়ে কাজের উৎসাহটা হারিয়ে ফেলে। সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে।’

বৃহস্পতিবার (১০সেপ্টেম্বর) একাদশ সংসদের নবম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল ১১টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশের করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এবং এ বিষয়ে তার সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন। করোনা মোকাবিলায় সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘টিকার ব্যাপারে বিভিন্ন দেশ গবেষণা করছে। সব দেশেই আমরা আবেদন দিয়ে রেখেছি। এর জন্য টাকাও বরাদ্দ করে রেখেছি। যেখান থেকে আগে পাওয়া যায়, আমরা সেটাই নেব। দেশের মানুষকে করোনা থেকে মুক্ত করার জন্য যা যা ব্যবস্থা নেয়ার দরকার, তা নেয়া হয়েছে।’

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সবাইকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অক্সফোর্ডের টিকা নিয়ে আশাবাদী হলেও পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ল। আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছি। তারপরও আমাদের প্রচেষ্টা আছে। যেখানেই আবিষ্কার হোক, আমাদের দেশের মানুষের জন্য তা সংগ্রহ করতে পারব। এ বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন।’

তিনি বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছি বলেই মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। যতদূর সম্ভব সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। এর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ছিল না, তারপরও যে যেভাবে পেরেছি সহায়তা করেছি।’

করোনাকালে চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সরকারপ্রধান বলেন, ‘চিকিৎসাসেবা যাতে দিতে পারি তার জন্য হাসপাতাল প্রস্তুত, চিকিৎসাসামগ্রী কেনাসহ সব ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। এ জন্য পানির মতো টাকা খরচ হয়েছে। আমরা টাকা-পয়সার দিকে তাকাইনি। এখানে হয়তো কেউ খুঁজে খুঁজে দুর্নীতি দেখতে পারে। যে মুহূর্তে এ ধরনের একটি দুর্যোগ মোকাবিলার চিন্তা করতে হয়েছিল, তখন টাকা-পয়সা কী হবে, কত খরচ হলো, কতটুকু সিস্টেম লস, তা বিবেচ্য ছিল না। আমাদের বিবেচ্য ছিল মানুষকে বাঁচানো। কীভাবে মানুষকে রক্ষা করব, সেই ব্যবস্থাটা নেয়ার চিন্তা ছিল। সেটা করেছি বলেই পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি, যেখানে এখনও বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ হিমশিম খাচ্ছে। আমাদের দেশের মতো ঘনবসতির দেশে এই কাজগুলো করা অত্যন্ত কঠিন। উন্নত বিশ্বে এই সমস্যাটা ছিল না।’

আর পড়ুন:   দেশে ১কোটি ৬৫ হাজার ১২ ডোজ টিকা দেয়া শেষ

এর আগে সমাপনী ভাষণে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে জাতীয় পার্টির অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা জিয়াউর রহমানের আমল থেকে শুরু। আমাদের বহু নেতাকর্মীর লাশ পাওয়া যায়নি। তারপর একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলো। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। কীভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করব, আমরা সেই চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমাদের মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সন্ত্রাস নির্মূল করতে হবে। জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। তারা যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটা করছে। সেগুলো করতে গিয়ে যদি কিছু দুর্ঘটনা ঘটে- এটা খুব অস্বাভাবিক নয়। তবে আমরা কাউকে ছেড়ে দিচ্ছি না। যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। এটা কেউ বলতে পারবেন না যে অন্যায় করলে কাউকে আমরা ছেড়ে দিচ্ছি। সেটা কিন্তু দেয়া হচ্ছে না।’

করোনাকালে নেয়া সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজগুলো তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘২১টি প্যাকেজে এক লাখ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। এটা জিডিপির ৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এর বাইরেও নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আমার বিশেষ তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। প্রতিটি মসজিদ-মাদ্রাসায় টাকা পাঠিয়েছি। সরকারের প্রণোদনার বাইরেও আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। কোনো মানুষ যেন কষ্টে না থাকে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখেই আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছি। অর্থনীতির চাকা যাতে গতিশীল থাকে আর সাধারণ মানুষ যেন কষ্ট না পায়, তার জন্য এ ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। কারণ, দেশের মানুষের জন্যই আমাদের রাজনীতি।’

তিনি বলেন, ‘করোনার মধ্যেই এলো ঘূর্ণিঝড় আম্পান। তারপর এলো দীর্ঘমেয়াদি বন্যা। একটার পর একটা আঘাত এসেছে। আমি চেষ্টা করেছি দেশের মানুষের যেন কষ্ট না হয়। আল্লাহর রহমতে সেটা আমরা কাটাতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের প্রচেষ্টা মানুষের জন্য কাজ আর সেটাই আমরা করে যাচ্ছি।’

আর পড়ুন:   নুসরাত হত্যায় ব্যবহৃত বোরকা উদ্ধার

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো মানুষের পাশে আছি। মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কিছুদিন থমকে যেতে হয়েছিল। সব কিছু প্রায় বন্ধ ছিল। সব কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যেও সরকার বসে থাকেনি। এ কারণে আমরা রিজার্ভ ৩৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে পেরেছি। মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৬৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। মাঝখানে কিছুদিন রপ্তানি একটু থমকে গেলেও তা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশি ক্রেতারা আমাদের রপ্তানি যেন বাতিল না করে, সেজন্য আমি নিজেও অনেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইতিমধ্যে দেশের ৯৭ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ মুজিববর্ষে আমরা শতভাগ বিদ্যুৎ দিতে পারব। এর সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চালন লাইন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। যেহেতু করোনাভাইরাসে সবার জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে, এ জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শিক্ষার্থীদের আমরা এক হাজার করে টাকা দেব, যাতে করে তারা কাপড়চোপড়, টিফিন বক্সসহ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে।’

নারায়ণগঞ্জে বিস্ফোরণ ঘটা মসজিদটি নির্মাণের কোনো অনুমতি ছিল না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়াতে নীতিমালা মেনে স্থাপনা নির্মাণের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারায়ণগঞ্জে সমজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আমরা অনেক মুসল্লিকে হারিয়েছি। নামাজ পড়া অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, মসজিদ নির্মাণ হয়েছে এমন একটি জায়গায়, যেখানে গ্যাসের লাইন ছিল। ওই গ্যাসের লাইনের ওপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ নির্মাণের কোনো অনুমোদন ছিল না। জায়গাটাও কমিটির ছিল না। এভাবে অনুমোদন না নিয়ে করার ফলে এই দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল। কতগুলো জীবন ঝরে গেল। ভবিষ্যতে কেউ যদি কোনো স্থাপনা করেন, অন্তত নীতিমালা মেনে করবেন, যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় আমাদের পড়তে না হয়।