৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

নগরবাসীকে সেবা দিতে যা যা করা প্রয়োজন বা যেভাবে কাজ করলে নগরবাসী সন্তুষ্ট থাকবেন এবং নিরাপদ থাকবেন, তার সবটুকুই করবে নগর পুলিশ। নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও যেকোনো পরিস্থিতিতে নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে সিএমপিকে ঢেলে সাজানো হবে। পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে ডিজিটালাইজড করা হবে। এ ডিজিটালাইজড করা হলে সহজেই নগরবাসী পুলিশের সকল ইউনিট থেকে সহজেই সেবা পাবেন।

আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মাল্টিপারপাস সেডে চট্টগ্রাম নগরীতে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) নবাগত কমিশনার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর এসব কথা জানান।

সিএমপির কমিশনার হুশিয়ারি উচ্চারণ  করে বলেন, অপরাধী সে যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। সে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হয়, তাকেও ছাড়া হবে না বলে

সিএমপি কমিশনার বলেন, চট্টগ্রাম বার আউলিয়ার দেশ, পূণ্যভূমি। আমি ইতোপূর্বে এখানে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমাকে আবার সুযোগ দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরবাসীর সেবা করার। আমি কৃতজ্ঞ।

তিনি বলেন, আমাদের ইন্সপেক্টর জেনারেল মহোদয় দুর্নীতি, মাদকসহ পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা সিএমপি এর বাইরে বিট পুলিশিং, কোয়ালিটি ইনভেস্টিগেশন কাজ করবো। আমরা পরিকল্পনা করেছি- প্রশিক্ষণ বাড়ানো, সুপারভাইজিং নিবিড় করা, মনিটরিং বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে তদন্তের মান উন্নয়ন।

টেকনাফের মতো কোনো ঘটনা যাতে সিএমপিতে ঘটতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ এর মধ্যেই দেয়া হয়েছে জানিয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করবে না। যে অপরাধ করবে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য হলেও কিছু তথ্য দিয়ে দেখুন, আমরা অথেনটিক ওয়েতে কাজ করি কি না। অপরাধ করে কেউ আনটাচেবল থাকবে না। পুলিশ সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করবে।

                               চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) নবাগত কমিশনার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর

ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না উল্লেখ করে সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, প্রত্যেককে প্রত্যেকের ভুল-ত্রুটির দায় নিতে হবে। পদায়নের ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয় অনেক সময় হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে আমি কিছুই বলবো না, আমি আপনাদেরকে বলবো, আপনারা পর্যবেক্ষণ করুন। আমার কাজ আমার হয়ে কথা বলবে। এখানে আমি আমাকে ফোকাস করতে চাচ্ছি না। এটা টিম সিএমপি।

সিএমপি কমিশনার সালেহ্ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে আমি নিয়মিত বসবো। আপনারা পর্যবেক্ষণ করবেন, এরপর মতামত দেবেন। আমার চাকরি ২৩ বছর চলছে, আমার পেছনে নিশ্চয় একটা কর্ম এরিয়া রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেছি। আমার কর্মপদ্ধতি নিয়ে আপনারা ওই এলাকার সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনারা জানতে পারবেন। নিজের বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। শুধু বলবো, আমার কথা নয়, আমার কাজই আমার কথা। আপনারা (সাংবাদিকদের) তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আমাকে দেবেন, এরপর দেখবেন কাজ হয় কি না।

আর পড়ুন:   এমবিএ এসোসিয়েশন চবির সদস্যদের “কনভেনশন এবং পহেলা বৈশাখ”উদযাপনের কর্মসূচি

থানায় থানায় দালালচক্র, পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ কমিশনার বলেন, আমার কাজের মাধ্যমেই আপনারা এর উত্তর পেয়ে যাবেন। প্রতিটি থানায় ৩/৪টি ক্যামেরা বসিয়ে পুলিশ কমিশনার দপ্তর থেকে থানার কর্মকাণ্ড মনিটরিং করা হবে। পুলিশি কর্মকাণ্ডে যাতে কোনো ব্যাক্তি বিশেষের হস্তক্ষেপ না থাকে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, মাদকের মাধ্যমে নানা অপরাধ হয়। প্রতিটি মাদকের আগে ও পরে নানা লিংকআপ থাকে। আমরা শুধু যিনি মাদক বহন করবেন তাকেই নয়, এর পেছনে যারা থাকবেন তাদেরও আইনের আওতায় আনবো। কিশোর গ্যাং একটি বাইপ্রোডাক্ট সমস্যা। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকে। প্রতিটি কিশোর গ্যাংয়ের মাথায় একজন ছাতা ধরে থাকেন, শেল্টার দেন। এরকম যারা থাকবেন তারাও পার পাবেন না। কিশোর অপরাধী এবং যারা তাদের ছায়া দিয়ে থাকে তাদেরকেও খুঁজে বের করা হবে। কেউই আনটাচেবল থাকবেনা। পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করবে। কেউ আইন ভাঙলে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

‘সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যটা না দিলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, এটাকে মাথায় রেখে, প্রথমে যে তথ্যটি আমরা জানবো, আমাদের কাজ হবে সেটা সাংবাদিকদের জানিয়ে দেয়া।’

সিএমপি কমিশনার বলেন, আমার প্রথম কাজ ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। আপনি যেন সঠিক সময়ে বাড়িতে যেতে পারেন। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। আমরা ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট নিয়ে কাজ করি। এনফোর্সমেন্টের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে চাচ্ছি। যেসব মোড়ে ট্রাফিক জ্যাম বেশি হয় সেসব মোড় চিহ্নিত করে দুর্ভোগ লাঘবে পরিকল্পনা করছি। চট্টগ্রামে নানা জায়গায় উন্নয়ন কাজ চলছে, এর ফলেও ট্রাফিক জ্যাম হয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবো। ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এটা শুধু স্বচ্ছতার জন্য নয়, আমাদের নিরাপত্তার জন্যও সহায়ক হবে। পুলিশি হয়রানি বন্ধে আমাদের আলাদা প্রোগ্রাম আছে। আমরা কমপ্লেইন সেলগুলোকে আরও কার্যকরী করবো।

তিনি বলেন, আমরা তদন্তের মান আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবো। প্রশিক্ষণ বাড়ানো, তদারকি আরও নিবিড় করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তদন্তের মান বৃদ্ধি করবো আমরা। মানবিক পুলিশিংসহ সিএমপির যতগুলো অর্জন আছে, আমি দৃঢভাবে এই অর্জনগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করবো। এবং যে সকল ক্ষেত্রে কিছু উন্নতির সুযোগ আছে সেগুলোকে উন্নয়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আমার সহকর্মীরা দৃঢ প্রতিজ্ঞ এই মান ধরে রাখার জন্য। আগামীতে সিএমপিকে আরও প্রফেশনাল, জনবান্ধব এবং মিডিয়াবান্ধবে পরিণত করার চেষ্টা করবো।

আর পড়ুন:   চট্টগ্রামে আরও ২জন করোনা রোগি  শনাক্ত

সিএমপি কমিশনার বলেন, পুলিশি সেবার মূল কেন্দ্র হচ্ছে থানা। আমরা থানাকে আমাদের নিবিড় মনিটরিংয়ে নেব। সেবা প্রদানের সামর্থ্যের সুযোগ বাড়ানোর আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করবো। থানার কিছু অংশের কাজকে আমরা ডিজিটালাইজেশন করবো। তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে আমরা তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবো।

তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক মহানগরীতে ‘সেফ সিটি’ কনসেপ্ট নিয়ে একটা কথা আছে। চট্টগ্রামবাসীর সহযোগিতায় আমরা এটা শুরু করতে চাই। আমাদের যে কার্যক্রমগুলো আছে সেগুলোকে আরও আধুনিকায়ন, আওতা আরও বৃদ্ধি করা- এগুলো আমাদের পরিকল্পনায় থাকবে।

সিএমপিতে পূর্নাঙ্গ মিডিয়া সেন্টার স্থাপন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, মিডিয়ার সহকর্মীদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে এই উইংটিকে আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছি। এই বিষয়ে আগামীতে আশা করি, আপনারা সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে আরও সহজ, সাবলীলভাবে ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে কাজ করতে পারবেন।

‘বিট পুলিশিংয়ের পাশাপাশি সিএমপির আরেকটি বড় অর্জন হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং। এই দুটি কার্যক্রম অতীতেও ছিল, আমরা এটিকে আরও জোরদার, বেগবান, আরও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং পরিধি বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো।’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুলিশের কর্মকাণ্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে জানিয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন, ট্রাফিক আইন জানানো থেকে শুরু করে মাদকের কুফল, জঙ্গিবাদ, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক শৃঙ্খলা- এসব বিষয়ে আমরা তাদের সাথে মতবিনিময় করবো। আমাদের ইচ্ছা আছে, বিভিন্ন গঠনমূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদেরকে বিভিন্ন ভালো কাজে সংযুক্ত করা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা আমরা করবো।

এ সময় সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) আমেনা বেগম, অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) এসএম মোস্তাক আহমেদ খান, অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।