৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

খন রঞ্জন রায় *

১৯৬৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলনে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ১৯৬৬ সাল থেকে দেশে দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকেট অবমুক্তকরণ, ক্রোড়পত্র ও স্মরণিকা প্রকাশ, পোস্টার-ফেস্টুনসহ শোভাযাত্রা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়কদ্বীপ সজ্জিতকরণ, গোলটেবিল বৈঠক, টেলিভিশনে টকশো ইত্যাদির আয়োজন করা হয়।

স্বাক্ষরতার প্রথম শর্ত ভাষা, বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩ টি দেশের অধিকাংশ মানুষ বহুভাষিক। বর্তমান বিশ্বে ৭,০৯৭টি ভাষা মৌখিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২৩টি ভাষা বেশি ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ এ ২৩টি ভাষায় কথা বলে। স্বাক্ষরতাই শিক্ষার প্রথম সোপান। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের এ বিশ্বে স্বাক্ষরতার বিকল্প নেই, যে জাতি যতো শিক্ষিত, সে জাতি ততো উন্নত ও ক্ষমতাবান। স্বাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, মানুষ সচেতন হয়, স্বনির্ভর হয়, দেশে জন্মহার কমে, স্বাস্থ্য সূচকের উন্নয়ন ঘটে, গড় আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান প্রণীত হয় এবং এ সংবিধানে ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্বাক্ষরতা বিস্তারে আন্তর্জাতিক ফোরামের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো স্বাক্ষরতা দিবস উদযাপিত হয়। ১৯৭৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ঠাকুরগাঁওয়ে স্বাক্ষরতা অভিযান শুরু হয়। এ অনুষ্ঠানে ঠাকুরগাঁও এর কচুবাড়ী-কৃষ্টপুর গ্রামকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম নিরক্ষরতামুক্ত গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেন।

স্বাক্ষর শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। এখন সাধারণ অর্থে স্বাক্ষর বলতে পড়া, লেখা ও হিসাব করায় দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে মনে করা হয়। স্বাক্ষর ব্যক্তি যেন মাতৃভাষায় সহজে লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে, মনের ভাব শুদ্ধ ভাষায় বলতে ও লিখতে পারে; দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ করতে ও লিখে রাখতে পারে। বিগত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে স্বাক্ষর ও স্বাক্ষরতার সংজ্ঞায় নানা পরিবর্তন ও বিবর্তন হয়েছে। ১৯০১ সালে ছিল মাতৃভাষায় নাম স্বাক্ষর করতে পারার ক্ষমতা; ১৯৫১ সালে স্পষ্ট ছাপার অক্ষরে লেখা যে কোনো বাক্য পড়তে পারায় ক্ষমতা; ১৯৬১ সালে যিনি বুঝে কোনো ভাষা পড়তে পারতেন, তিনিই ছিলেন স্বাক্ষর; ১৯৭৪-এ যে কোনো ভাষা পড়তে এবং লিখতে সক্ষম ব্যক্তিকে স্বাক্ষর হিসেবে গণ্য করা হতো; ১৯৮১ সালে কোনো ভাষায় চিঠি লিখতে পারার ক্ষমতা থাকলে তাকে স্বাক্ষর বলা হতো; ১৯৮৯ সালে তা হয় মাতৃভাষায় কথা শুনে বুঝতে পারা, মৌখিক ও লিখিতভাবে তা ব্যক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন হিসাব করা ও লিপিবদ্ধ করে রাখার ক্ষমতা লাভ। বর্তমানে স্বাক্ষরতার পরিধি শুধু মাতৃভাষা চর্চা ও হিসাব-নিকাশ আয়ত্ত করার মধ্যে সীমিত নেই। কম্পিউটার স্বাক্ষরতা, আর্থিক স্বাক্ষরতা, সাংস্কৃতিক স্বাক্ষরতার মতো বিভিন্ন নাগরিক প্রসঙ্গ; সর্বোপরি উন্নত জীবনের জন্য অপরিহার্য মানসম্মত দক্ষতা অর্জন, দেশাত্মবোধ, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরির সোপান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

আর পড়ুন:   আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিতে জার্মানির পথে প্রধানমন্ত্রী

আমাদের দেশের শিক্ষার বেলায় রয়েছে নানাঘাটতি। একদিকে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদের অভাব, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত বেকারের আধিক্য। পোশাক শিল্পসহ বহু শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রে উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বহু দেশের দক্ষ লোকবল আমাদের কলকারখানায় কাজ করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত দক্ষতাহীন লাখ লাখ সাধারণ ডিগ্রিধারী বেরোচ্ছে। এতে দিনে দিনে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সমাজে বিক্ষুব্ধতা বাড়ছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে শিক্ষা আর ভিক্ষা একসাথে চলতে পারে না। দুটি শব্দ পরষ্পর বিপরীতমুখী। অথচ আমাদের দেশের সাংবিধানিক ধারামতে দায়বদ্ধতা গ্রহণ করেছে যে, ‘বৈধ সব নাগরিককে ন্যূনতম মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র নির্ধারিত একটি সময়সীমার মধ্যে’। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে বহু আন্তর্জাতিক প্রত্যাশা ও চুক্তিপত্রে।

বাংলাদেশে সবার জন্য শিক্ষা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা ২টি পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে। তার অধীনে অধিদপ্তর, দপ্তর, ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৩১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্ডেন, মাদ্রাসা, হাইস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক রয়েছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার ১৮০ জন। প্রতিবছর বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্ধ করা হয় নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, মেরামত, শিক্ষকমণ্ডলীর বেতন, বিনামূল্যে বই বিতরণ ইত্যাদি বাবদ। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্র বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের এক বৃহৎ ভূমি দখল করে আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। স্বাক্ষরতার হার বাড়ানো নিয়ে পূর্বাপর সরকার একের পর এক প্রকল্প নিয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু সেসব প্রকল্প সফল হয়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে স্বাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ এখনো নিরক্ষরতার অভিশাপ বহন করে চলেছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর গবেষণা বলছে, প্রকৃত স্বাক্ষরতার হার ৫৭ শতাংশ। সর্বজন স্বীকৃত যে, দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরক্ষরতার গভীর সর্ম্পক রয়েছে। আমাদের নিরক্ষরতা ও দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশ। যে মানুষকে পরিবারের সদস্যদের ভাত কাপড়ের জোগাড় করতে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়, তিনি সন্তানকে বিদ্যালয়ে ভর্তি না করে কাজে পাঠান বাড়তি উপার্জনের জন্য।

আর পড়ুন:   আরও ৬ মাস বাড়ছে খালেদার মুক্তির মেয়াদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলে স্বাক্ষরতাসম্পন্ন ধরা হয়। যদিও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে পঞ্চম শ্রেণি পাস করা অনেক শিক্ষার্থী স্বাক্ষরজ্ঞান হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাটুকুও অর্জন করতে পারে না। স্বাক্ষরতার সঙ্গে যেমন উন্নয়নের সম্পর্ক আছে, তেমনি আছে দারিদ্র্যের সঙ্গেও। যে দেশের মানুষ নিয়মিত তিন বেলা তিন মুঠো খাবার পায় না, তাদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া দুষ্কর; অসুখ-বিসুখ অভিশাপ। বিশ্বব্যাপী হাজারো সমস্যা এ বিশ্বে সুবিধাভোগী আর সুবিধাবঞ্চিত দুটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি তৈরি করে বৈষম্যের বেড়াজাল তৈরি করছে। এসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে  উন্নত দেশে পরিণত করতে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা অনেক আগেই উন্নত দেশের কাতারে চলে যেতাম যদি আমরা নিরক্ষতা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে পারতাম।

একবিংশ শতাব্দীতে একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দর্শন হওয়া উচিত একটি জ্ঞাননির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রগামী হওয়া। সেই বিবেচনায় আমরা এখনও যুদ্ধ করছি শতভাগ স্বাক্ষরতা অর্জনের জন্য। আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক কখনও বা বেসরকারি ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান সর্বমুখী প্রচেষ্টা চালিয়েও আমরা পৌঁছাতে পারিনি আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। আজকের স্বাক্ষরতা দিবসের মূল অঙ্গীকার হোক দেশের আপামর জনগণের সার্বিকমুক্তি ও কল্যাণে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।

লেখকঃ টেকসই উন্নয়নকর্মী

khanaranjanroy@gmail.com