৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

সন্তানহারানোর ঘটনা যেকোনো মা-বাবার জন্যে বড়ই দুঃখের ও সীমাহীন বেদনার। একমাত্র সন্তানের যখন অকালে জীবনপ্রদীপ নিভে যায়, তখন তা সারা জীবন মা-বাবাকে কাঁদায়। ঠিক তেমনিভাবে আদরের একমাত্র কন্যাসন্তানকে সড়কদুর্ঘটনায় হারিয়ে এখনো মানসিক যাতনায় ভোগছেন হতভাগ্য বাবা-মা মৃণাল কান্তি বিশাস ও অসীমা বিশ্বাস। ২০১০সালের ২২আগস্ট মর্মান্তিক এক সড়কদুর্ঘটনায় সীতাকুণ্ড কলেজ রোডসংলগ্ন বড়বাজারের বাসিন্দা, সাবেক জীবনবীমা কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড উপজেলা বিআরডিবি’র চেয়ারম্যান মৃণাল বিশ্বাসের একমাত্র শিশুকন্যা অমৃতা বিশ্বাস অমা পরলোকগমন করে। আজ অমার ১১তম প্রয়াণদিবস। দশম প্রয়াণবার্ষিকীতে আমি প্রয়াত অমা’র বিদেহী পরমাত্মার প্রশান্তি কামনা করছি। সীতাকুণ্ড পৌরসভাসদরে প্রতিবছর জন্মাষ্টমি উদযাপন পরিষদ র‌্যালির আয়োজন করে। জন্মাষ্টমির এ র‌্যালিতে শাড়িপড়ে অংশ নেয়ার বাসনা জেগেছিলো অমা’র মনে। তাই মা-বাবাকে নতুন শাড়িকেনার আবদার। অমাকে নিয়ে শাড়িকিনতে চট্টগ্রামশহরে যান মৃাণাল বিশ্বাস ও তার সহধর্মিনী অসীমা বিশ্বাস। কেনাকাটা শেষ করে ওরা সিএনজি অটোটেক্সিযোগে শহর থেকে সীতাকুণ্ডসদরের বাড়ি ফিরছিলেন। টেক্সিটি সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মছজিদ্দা এলাকার সুলতানা জুট মিলের সামনে দুর্ঘটনাকবলিত হয়। বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি মালবাহী কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় টেক্সিটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় অমা। মারাত্মকভাবে আহত হন মৃণালদম্পতি। তাদের প্রথমে চমেক হাসপাতালে এরপর চন্দ্রঘোনা খ্রিস্টান মিশনারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীঘদিন চিকিৎসাশেষে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ২২আগস্ট এলেই মৃণাল বিশ্বাস ও তার সহধর্মিনীর ঘুম হারাম হয়ে যায়। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার দুঃসহ স্মৃতি তাদের এখনো নিদারুণ কষ্ট দেয়। মেয়ের সাথে তারাও মরণযাত্রার সহযাত্রী ছিলেন। তাদের বহনকারি টেক্সিটি যেভাবে মুচড়ে গিয়েছিল, তাতে তারা বেঁচে থাকার কথা নয়। একটি সড়ক দুর্ঘটনা মৃণাল পরিবারের স্বপ্নসাধ ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। পরিণতবয়সে তাঁরা একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের মুখ দেখেছিলেন। সীতাকুণ্ড সরকারি উন্নয়ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো অমা। প্রথম শ্রেণিতে একটি বেসরকারি বৃত্তি লাভ করেছিলো সে। মেধাবী শিশুকন্যা অমাকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন ছিলো কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! তাদের সেই স্বপ্ন আর আলোর মুখ দেখেনি। মৃণাল পরিবারের সাথে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশ্বাসভবনে আমার প্রায় যাওয়া আসা হতো তখন। কাছ থেকে দেখা অমা’র কথা বেশ মনে পড়ে। ওদের বাসায় গেলে ক্ষুদে এ মেয়েটির হাতজোড় করে নমস্কার দেয়ার দৃশ্যটি এখনো চোখের সামনে ভাসছে। অমা’র আদবকায়দা ও আচার-আচরণই ছিলো আলাদা; কথাবার্তায় মনকেড়ে নিতো আত্মীয়স্বজনসহ সকলের। অমা’র ব্যবহৃত সেই জিনিসপত্র, হারমোনিয়াম-তবলা তার স্মৃতি আজও বহন করছে। প্রতিবছর জন্মাষ্টমি এলেই অমা’র স্মৃতি মা-বাবাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম