৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আগস্টই যেন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশ যেন কেঁপে ওঠে। ইতিহাস যেন ভীতিকর অবস্থায় পড়ে যায়। মরিয়া হয়ে ওঠে খুনিচক্র। মর্মস্পর্শী কালো কলঙ্কিত আগস্ট আসলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাতি শোকবিহ্বল হয়ে ওঠে। হৃদয়ের ভেতর বারবার আঁতকে ভেসে ওঠে বাঙালি জাতির বিশুদ্ধ ঠিকানা ধানমন্ডি-৩২। কুখ্যাতদের গুলিতে বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশের ছবি। চোখের কিনারায় মুহূর্তেই পানি জমতে থাকে। টপ টপ করে পড়তে পড়তে ভেসে উঠে ভয়ানক নৃশংস একুশে আগস্ট এর ভয়াল ছবি।

পাহাড় সমান হৃদয় ধারণ করা বঙ্গবন্ধুকে খুনি মোশতাক, মেজর জিয়ারা হত্যা করে সফল হয়েছিল। শুধু সফলই হননি, তাদের যে মনবাসনা লক্ষ্য উদ্দেশ্য তা পুরোপুরি আদায় করতে পেরেছিল। পাকিস্তানি ধারায় বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ রুপ দেয়া….,জাতির পিতাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা, এরকম হাজারো ইতিহাস বিকৃত করে ২১ বছর বাংলাদেশকে ছিন্নভিন্ন করে ভাগবাটোয়ারা করে খেয়েছিল। সফল হয়নি একটি জায়গায়। দুই কন্যার বেলায়। আল্লাহ পাক বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সুসম্পন্ন করার জন্যই যাদেরকে বেঁচে রেখেছেন। কিন্তু খুনিদের উত্তরসূরিরা বসে থাকেনি। খুনি চক্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একুশে আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে পুরোপুরি সফল হতে চেয়েছিল। ভাবুন তো একবার খুনি চক্র সফল হলে আজকের বাংলাদেশ কোথায় থাকত?

জীবন বাজি রেখে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করে অসীম আস্থা মনোবল নিয়ে সংগ্রামের সাধনায় এগিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কারিশমেটিক নেতার নাম বঙ্গবন্ধু। যাত্রাপথটা অনেক কঠিন ছিল। কিন্তু তিনি বিচলিত হননি। নতি স্বীকারও করেনি। কাল্পনিকতায় ভরা দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয় পাকিস্তান। সাম্প্রদায়িক শক্তি ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত। সাম্প্রদায়িক ভাগবাটোয়ারার বেড়াজাল তাকে কখনো ছুঁতে পারেনি। তিনি যা করেছেন সেটাই অন্যের কাছে স্বপ্ন। তা বাস্তবায়ন করেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র বারবার তাকে নির্যাতনে নির্যাতনে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হার মানেনি। নিজেকে বাঙালি জাতির জন্য, বাঙালি জাতির জীবনের সাথে এমন ভাবে মিশিয়ে ছিলেন জেলে থাকুক আর ঘরের বাহিরে থাকুক সময়ের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে উঠেছিল।

বাংলা, বাঙালি, বঙ্গবন্ধু এক সুর। আত্মসুখ বিসর্জন দিয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সবার থেকে এখানেই আলাদা বঙ্গবন্ধু। জেলের পর জেল। এত প্রতিকূলতা তাকে দমাতে পারেনি। তিনি বরং জেদি হয়েছেন এবং বাঙালির মধ্যে লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি করেছেন বলিষ্ঠভাবে। গণমানুষের ত্রাতার আসনে। কখনও তিনি কোনো ফাঁকা আওয়াজ দেননি। যে আওয়াজ দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করেছেন। ছয় দফার লক্ষ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যে উত্তাল ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু নিখুঁত নিশানার বলিষ্ঠ তীর ছুঁড়ে দিলেন। আবেগ দীপ্ত, সংযত, সাহসী বাস্তবতা। “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। একক নেতৃত্বে সমগ্র জাতিকে এক করে ভাষা দিলেন, দেশ দিলেন বঙ্গবন্ধু। যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

যে মানুষটি কখনও বাঙালি জাতিকে ভালোবাসার ছোঁয়া থেকে আলাদা করেনি সেই তাঁকেই কিনা কুলাঙ্গার সন্তানেরা হত্যা করল। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়? একটি জাতিকে, একটি রাষ্ট্রকে, একটি রাষ্ট্রের আদর্শকে হত্যা করা হয়েছিল। একটি জাতির যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করে লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করেছিল। বাঙালি জাতির ঠিকানার প্রতিষ্ঠান ৩২ এ যখন প্রবেশ করি। সবকিছুই ভুলে যাই। সিঁড়িতে পড়ে থাকা সেই রক্তাক্ত বাংলাদেশের দিকে তাকাতেই চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি ঝরে। বারবার মনে পড়ে কুলাঙ্গারদের কথা। এরা কোন জাতি? এরাই বুঝি ফেরাউন, নমরুদ এর বংশধর..।

আর পড়ুন:   করোনা চিকিৎসায় ঢাকায় হচ্ছে চীনের মতো হাসপাতাল

বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪৫ বছর অতিবাহিত হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে কত কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ সময় ইতিহাসের উপর বেচর্চা হয়েছে। অপচর্চা হয়েছে। বিকৃত হয়েছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে প্রকৃত ইতিহাস। কতটুকু উদ্ধার হল ইতিহাস? কতটুকু চর্চা করতে পারলাম ইতিহাস? কতটুকু বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করতে পারলাম যুগ যুগ ধরে বহন করার জন্য? ভুল ইতিহাস চর্চা করা প্রজন্মকে কি মুল রাস্তায় আনতে পেরেছি? খেয়াল করুন তো জাতীয় শোক দিবস কিভাবে পালন হচ্ছে? উৎসাহ উদ্দীপনা, কাঙ্গালি ভোজ, নেতাকর্মীদের হই হুল্লোই যেন জাতীয় শোক দিবসের আকর্ষণ। শোক, ভাবগাম্ভীর্যতা কোনোটিই যেন চোখে পড়ে না। ব্যানার-ফেস্টুনে বঙ্গবন্ধুর ছবির চেয়ে নিজের ছবি বড় করে দিয়ে ফুল দেয়ার প্রতিযোগিতায় ধাক্কাধাক্কিতে ব্যস্ত নেতাকর্মীরা। আর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি নামে-বেনামে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হওয়ার খোলস গায়ে মাখার জন্য নিয়ম রক্ষার অনুষ্ঠানে ফুল নিয়ে, আলোচনা সভা নিয়ে উপস্থিত।

শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে হবে শ্রদ্ধার সহিত। এটাই মুখ্য বিষয়। কাকে হারিয়েছেন সেটি অনুভব করতে হবে হৃদয় দিয়ে? মুখ দিয়ে নয়। জাতীয় শোক দিবসের তাৎপর্য হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে চর্চা করে শুদ্ধভাবে বিশ্ববাসী ও জাতির সামনে তুলে ধরাই শোক দিবসের মূল লক্ষ্য। এজন্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীরা দেশে বিদেশে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা,বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতই একাডেমিক সেমিনার ও গবেষণা প্রবন্ধের কাজ করবে। মুজিব বর্ষ চলছে। মুজিব বর্ষে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে হাজার-হাজার কাজ হচ্ছে। শুধু শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে না থেকে এই সব কাজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। এগুলোই বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখবে যুগ যুগ ধরে। যদি ব্যক্তি মানুষের মনে প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুকে প্রবেশ করানো যায় তবেই আওয়ামী লীগ আদর্শিক কারণে যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকবে। বঙ্গবন্ধুর খুনির প্রজন্ম হয়তো ছদ্মবেশে মুজিবপ্রেমী হয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে গেছে। আজ সবাই আওমী লীগ। এখানেই ভয়। তাই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা শঙ্কিত হয়ে বলেন, “এত উৎসাহী থাকলে’ ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর লাশ সেখানে পড়ে থাকত না। আমার মা (বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) এবং পরিবারের সদস্যদের রেড ক্রিসেন্টের শাড়ি দিয়ে দাফন করা লাগত না। এখন আমি মারা গেলে কী হবে, তা-ও জানি। কাজেই কোনো বাড়াবাড়ি নয়।” [বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ]

ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ে বাংলাদেশের হাল ধরেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। কত প্রতিকূলতা? কত ভয় ভীতি? হত্যার হুমকি নিয়মিত। দেশ থেকে। দেশের বাহিরে থেকে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দেশের মাটিতে ফিরেছেন। বঙ্গবন্ধুকে যাতে দ্বিতীয়বার হত্যা করতে না পারে সেজন্য বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনার যুদ্ধে লিপ্ত হন। সফলও হয়েছেন। একাত্তরের পরাজিত শক্তি, দেশীয় শক্তি, বিদেশি শক্তি, দলের ভেতরের অপশক্তি সকল বাধা পেরিয়ে দূরদর্শী নেতৃত্বে চতুর্থবার জনগণের প্রত্যাশিত রায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। যা ছিল বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধ। বিশ্ব রাজনীতিতেও কূটনৈতিকভাবে শতভাগ সফল বঙ্গবন্ধু কন্যা। জনগণের জন্য কোটি কোটি টাকার কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। হাজার হাজার প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রেখেছেন। বিভিন্নরকম ভাতাসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

আর পড়ুন:   কারখানা মালিকরা বিধিনিষেধেও খোলা রাখতে চান, শনিবার সিদ্ধান্ত

৬৩টি জেলায় একসাথে বোমা হামলার মাধ্যমে দেশকে জঙ্গিদের কারখানা বানিয়েছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকার। এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। মৌলবাদী, একাত্তরের পরাজিত শক্তিদের টার্গেট শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারলেই তাদের মিশন সফল। বাংলাদেশ আবার পূর্বের কায়দায় পাকিস্তানি প্রদেশে পরিণত হবে। সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের মৃত্যু ঘটবে। উন্নয়নের মৃত্যু ঘটবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মৃত্যু ঘটবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মৃত্যু ঘটবে।

তথ্য প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশ। ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার নাম শেখ হাসিনা। করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং বিভিন্ন খাতকে একীভূত করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। দেশের উন্নয়নের চাকা, গণতন্ত্র ,অর্থনীতি সচল রাখতে সময় উপযোগী সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ব ইতিহাসে মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। সবাই তোয়াজ করে। মাথা নুয়ে সম্মান করে। তারপরও ভয়। যেভাবে ষড়যন্ত্রকারীরা আওয়ামী লীগের লেবাস নিয়ে দলের ভেতরে ঢুকে অপকর্ম করে যাচ্ছে, যদি সময় মতো কঠোর হস্তে ঠেকানো না যায় তাহলে ষড়যন্ত্র বারবার হতেই থাকবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। কিন্তু বাকিরা সহযোগিতা না করলে একার পক্ষে সম্ভব হবে না।

একুশে আগস্টের সেই বিকেলের গ্রেনেড হামলার বীভৎসতা কি ভয়ানক ছিল, বঙ্গবন্ধু কন্যার হতভম্ব হওয়া ছবিটি কি নিরুপায় ছিল, কিভাবে লাশের উপর লাশ পড়েছিল তা কি ভাবা যায়? রক্ত আর রক্ত এই ছিল খুনিদের কর্মকাণ্ড। যখনই বাংলাদেশের ওপর আঘাত এসেছে তখনই হাল ধরে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের হাল ধরেছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

খেয়াল করুন তো কি সুপরিকল্পিতভাবে মেজর জিয়া ঠাণ্ডা মাথায় মোশতাকসহ ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছিল? খুনিদের যাতে বিচার না হয় সেজন্য কালো আইন জারি করেছিল। খুনিদের পুরস্কৃত করেছিল জিয়া- যা অব্যাহত রেখেছিল বেগম খালেদা জিয়া। আবার সত্য ইতিহাস মুছে ফেলার জন্যই একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায় সেই খুনিরা। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না করে যেভাবে নাটক সাজিয়েছিল খুনিরা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারের নাটকও একই ভাবে সাজানো হয়েছিল। সেই নাটকের পরিচালক ছিল বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া। যদি মেজর জিয়ার মরণোত্তর বিচার হত তাহলে একুশে আগস্ট নৃশংস হামলার শিকার হতে হতো না বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে। বারবার হত্যা ষড়যন্ত্র করার দুঃসাহসও দেখাত না খুনিরা। ১৫ আগস্ট ও ২১শে আগস্ট দুই কলঙ্কিত অধ্যায়ই একই সূত্রে গাঁথা। তাই এই দুই অধ্যায়কে কলঙ্ক মুক্ত করা হোক।