৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘাতকের বুলেটে জীবন দিতে হয়েছে, সেই স্বপ্ন পূরণ ও মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তনে সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণ করে যাবেন। এদেশে সব মানুষ যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সব মানুষ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে, ন্যায়পরায়ণতা যেন সৃষ্টি হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত যেন বৃথা না যায়। মুজিববর্ষ উপলক্ষে ৫০ হাজার বার কোরান খতম এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদফতরে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, মানুষ একটা শোক সইতে পারে না। আর আমরা কি সহ্য করে যাচ্ছি। শুধু একটা চিন্তা করে যে, এই দেশটা আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তিনি এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চান। কাজেই আমার যতটুকু সাধ্য, সেইটুকু আমরা করে দিয়ে যাব যেন তাঁর (বঙ্গবন্ধু) আত্মা শান্তি পায় এবং এই রক্ত যেন বৃথা না যায়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, তাঁকে (বঙ্গবন্ধু) যারা হত্যা করেছে, তারা ঘৃণ্য। তাদের বিচার করেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেই শক্তি দিয়েছেন আমাদের। ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে দিয়ে তাদেরকে বিচার করতে পেরেছি। এতে আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করি।

আওয়ামী লীগকে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রেখে দেশ সেবার সুযোগ করে দেয়ায় দেশের মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের জনগণকে, যারা আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন এবং আমার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ সকল সহযোগী সংগঠনকে, যারা সব সময় আমার পাশে থেকে আমাকে শক্তি জুগিয়েছে, একটা পরিবারের মতো আমি পেয়েছি।

শোষিত বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতার আজীবন সংগ্রামের কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় শোক দিবস। আর জাতি হারিয়েছে তাঁর নেতাকে। আর আমরা হারিয়েছি আমাদের পিতাকে।

মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ২০২০ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ সময়ের মধ্যে সমাজসেবা অধিদফতরের আওতাধীন ৮৫ সরকারী শিশু পরিবারের এতিম শিশু এবং ক্যাপিটেশন গ্র্যান্টপ্রাপ্ত ৩৯২৮ প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক এতিম শিশুদের মাধ্যমে বর্ষব্যাপী এক লাখ বার কোরান খতমের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ১৫ আগস্টের মধ্যে ৫০ হাজার বার কোরান খতম হয়ে গেছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

দোয়া মাহফিলে উপস্থিত সরকারী শিশু পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা ছোটবেলা থেকে তোমাদের বাবা-মাকে দেখতে পাওনি। অনেকে পিতাকে পাওনি বা মাকে পাওনি। আবার অনেকে কাউকেই পাওনি। কারও আদর, স্নেহ, ভালবাসা সেটা যে কি জিনিস, সেটা তোমরা উপলব্ধি করতেই পারনি।’ এ সময় নিজের মায়ের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমার মা (বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) মাত্র তিন বছর বয়সে তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন এবং মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতাকে হারান। ছিলেন দাদার কাছে। ৭ বছর বয়সে দাদাও মারা যান। আমার দাদি আমার মাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন।’

আর পড়ুন:   রাউজানে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীর স্থান নেই: ফজলে করিম

ঘাতকের বুলেটে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানো শেখ হাসিনা এতিমদের উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা (এতিম) যেন কখনও নিজেদের অসহায় মনে না করে, কারণ তিনি সব সময় তাদের পাশেই আছেন। এতিমদের কষ্ট কেমন, তা নিজে উপলব্ধি করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই কষ্টটা আমরা বুঝি। এই কষ্টটা আরও বুঝলাম ১৫ আগস্ট। একদিন সকালে উঠে যখন শুনলাম আমাদের কেউ নেই। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠ ভারি হয়ে ওঠে, পুরো অনুষ্ঠানে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই খুনীরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য এবং কিছু উচ্চপদস্থ ছিল, যারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সেই রাতে বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেলকেও যে খুনীরা রেহাই দেয়নি, সে কথা মনে করে আবেগাপ্লুত শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার ছোট্ট ভাইটি- আমি এখনও এই প্রশ্নের উত্তর পাই না, তার মাত্র ১০ বছর বয়স। তার জীবনের স্বপ্ন ছিল সে একদিন সেনাবাহিনীতেই যোগদান করবে। আর নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস, তাকে এই সেনাবাহিনীর সদস্যরাই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করল। তার অপরাধ কী জানা নেই আমার।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড যখন চলছিল, তখন দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এরপর ছয় বছর তাঁদের নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাবা-মায়ের লাশও দেখতে পাইনি। কবরও জিয়ারত করতে পারিনি। দেশে আসতেও পারিনি। এভাবে আমাদের বাইরে পড়ে থাকতে হয়েছিল। এতিম হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বিদেশের মাটিতে রিফিউজি হয়ে থাকার কি কষ্ট, এটা যারা আমাদের মতো ছিল তারা জানে।’

নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালে দলীয় নেতাকর্মী ও দেশের মানুষের সমর্থনে দেশে ফিরে আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমার বাবা সারাজীবন কষ্ট করেছেন, সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই আমার চেষ্টা ছিল যে, এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কিছু করে যাব। সেটাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য।’

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের রক্ষার জন্য তৎকালীন সরকারের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ একটা হত্যাকাণ্ড হলে সবাই বিচার চাইতে পারে, মামলা করতে পারে। আমরা ১৫ আগস্ট যারা আপনজন হারিয়েছিলাম, আমাদের কারও মামলা করার বা বিচার চাওয়ার অধিকার ছিল না। সেই অধিকার আদায়ের পথও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। খুনীদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। তাদেরকে বিভিন্ন দেশে-বিদেশে চাকরি দেয়া হয়েছিল। তারা পুরস্কৃত হয়েছিল এই খুন করার জন্য। নারী হত্যাকারী, শিশু হত্যাকারী, রাষ্ট্রপতি হত্যাকারী- তাদের পুরস্কৃত করা হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, সেই অবস্থার পরিবর্তন তিনি আনতে চেয়েছেন। দেশের সব মানুষ যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, ন্যায়পরায়ণতা যেন সৃষ্টি হয়, প্রত্যেক মানুষের যেন অধিকার থাকে- সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্মদিন ঘটা করে পালন না করার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কিন্তু বড় করে কোন দাওয়াত খাওয়াই না, পার্টিও করি না। আমরা খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের মতন যারা অসহায় শিশু আছে, সেখানে আমরা চেষ্টা করি জন্মদিনের উৎসবটা তোমাদের মতো শিশুদের নিয়ে করতে। সেখানে আমরা যতটুকু পারি, বেছে বেছে মিষ্টি পাঠাই, খাবার পাঠাই। কারণ আমরা উপলব্ধি করি, বাইরে কোন পার্টি করে তো লাভ নেই। তিনি বলেন, আমরা যদি এতিমদের মুখে কিছু খাবার তুলে দিতে পারি, সেটাই সব থেকে বড় এবং সেখাবে আমরা করে যাচ্ছি। আমার মাও তাই করতেন। আমাদের সকলের জন্মদিনে তিনি এতিমখানাতেই খাবার পাঠাতেন এবং সাহায্য পাঠাতেন। তাই আমরা এইটুকুই বলব, তোমরা এতিম না। তোমরা অসহায় না। আমাদের আওয়ামী লীগ সরকার সরকারে আসার পর থেকেই আমরা সকলের পাশে আছি। আমি যতক্ষণ আছি, তোমাদের পাশেই থাকব। কারণ তোমরাই আমার আপনজন, সব থেকে আপন। তোমাদের জীবন সুন্দর হোক, সফল হোক। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে তোমরা কাজ করবে। নিজেরা বড় হতে পারলে তোমরাই একদিন এই রাষ্ট্রের উপকার করতে পারবে। অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিজড়া এবং বিভিন্ন অনগ্রসর জাতিকেও আমরা সহযোগিতা করছি। যারা হিজড়া তারাও তো কোন না কোন মায়ের সন্তান। কেন তাদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়, কেন তাদের রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়। তারাও পরিবারের সন্তান, তারাও পরিবারেই বড় হবে।

আর পড়ুন:   গণধর্ষণের প্রতিবাদে উত্তাল এমসি কলেজ

৫০ হাজার বার কোরান খতম করল এতিম শিশুরা

মুজিবর্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসার নিদর্শন এবং তিনিসহ সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় এক লাখ বার পবিত্র কোরান খতমের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারী শিশু পরিবার এবং বেসরকারী এতিম খানার শিশুরা। এরই মধ্যে ৫০ হাজার বার কোরান খতম করেছে তারা। এতে অংশ নিয়েছে প্রায় ৭১ হাজার শিশু।

স্মারক ডাকটিকেট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার জাতীয় শোক দিবস এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকেট, উদ্বোধনী খাম এবং একটি ডেটা কার্ড অবমুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে তার সরকারী বাসভবন গণভবনে একটি অনুষ্ঠানে ১৮ স্ট্যাম্প (প্রতিটি পাঁচ টাকা) সম্বলিত একটি ৯০ টাকা মূল্যমানের স্ট্যাম্প শিটলেট, ১০ টাকা ও ১০০ টাকা মূল্যের দুটি উদ্বোধনী খাম এবং ৫ টাকা মূল্যের একটি ডেটা কার্ড উন্মোচন করেন