৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য নিজ নিজ এলাকায় উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর ৫ কোটি টাকার থোক বরাদ্দকে তাদের একাংশের জন্য স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা, নির্বাচনে ভোট নিশ্চিত করার চেষ্টা ও অনৈতিকভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

টিআইবির মতে, এই প্রকল্পের কার্যকর তদারকি, প্রকল্পের সার্বিক মূল্যায়ন এবং সংসদ সদস্যের সততা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট আচরণবিধির অনুপস্থিতি অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে আরও উৎসাহিত করছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে।

আজ বুধবার (১২ আগস্ট) প্রকাশিত ‘অনৈতিকভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পথ হিসেবে সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দ : অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণপত্রে এসব কথা জানায় টিআইবি।

২০১৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণার তথ্য সংগ্রহ এবং ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গবেষণাটি ৫০টি নির্বাচনী এলাকায় চালানো হয়। এই ধরনের গবেষণাপত্র অন্যান্য সময় সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হলেও এবার করোনার কারণে গবেষণাপত্রটি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের ইচ্ছানুযায়ী কাজ নির্বাচন ও বাস্তবায়ন হওয়ার কারণে স্কিমের সম্ভাব্যতা যাচাই, কারিগরি ও আর্থিক বিশ্লেষণের সুযোগের অনুপস্থিতি বিদ্যমান এবং বাস্তবায়নের সময় অর্থ অপচয়ের ঝুঁকিসহ কাজের স্থায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে পল্লী এলাকার উন্নয়নের জন্য এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রতিবেদনও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এবং মাঠ পর্যায়ে দুটি প্রকল্পের কিছু স্কিমের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে স্কিম বাস্তবায়নের কাজে চ্যালেঞ্জ ও অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। তবে আইএমইডি ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত কোনো প্রকল্পেরই পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেনি।

এছাড়া প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, জবাবদিহিতার অভাব, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার অকার্যকরতা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, মানসম্মত সামগ্রী ব্যবহার না করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছার ঘাটতি, অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার, ট্যাক্স ফাঁকি, আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রভাব, কার্যাদেশ বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, বাস্তবায়িত স্কিমের নিম্নমান এই প্রকল্পের সমস্যা হবে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়।

গবেষণা বলছে, কোনো কোনো এলাকায় সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে বছরে ২০-২৫% কাজ বিক্রি (অবৈধভাবে সাব-কন্ট্রাক্ট) হয়, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে সাব-কন্ট্রাক্টের কোনো প্রমাণ রাখা হয় না। তদারকি প্রতিষ্ঠানও এই বিষয়টি সম্পর্কে জানেন। বাস্তবে তারা দরপত্রপ্রাপ্ত প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মাঠ পর্যায়ের যেকোনো পরামর্শ বা পর্যবেক্ষণ অবহিত করেন এবং তাদের নামে বিল দেয়া হয়।

মাঠ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সার্বিকভাবে ৭৭.৮ শতাংশ সম্পূর্ণ এবং ১৭.৮ শতাংশ স্কিমে আংশিক কাজ হলেও ৪.৪ শতাংশ স্কিমের কোনো কাজ হয়নি। কাজ হয়নি এমন স্কিমের মধ্যে রাস্তার স্কিম ১৮টি, ব্রিজ/কালভার্ট স্কিম ১টি এবং রাস্তা ও কালভার্ট/ড্রেন স্কিম ৭টি। যেসব স্কিমের সম্পূর্ণ এবং আংশিক কাজ হয়েছে তাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ স্কিমের কাজের মান ভাল ছিল না।

আর পড়ুন:   ৩১মার্চ পর্যন্ত খেলার সব ধরনের ইভেন্ট বন্ধ

ঠিকাদাররা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা তার দলের কর্মী/পরিচিত/আত্মীয় হলে কাজ চলাকালীন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে তদারকির ঘাটতি দেখা যায়। ঠিকাদারের থেকে কমিশন/লভ্যাংশ প্রাপ্তি এবং দলীয় নেতাকর্মী/আত্মীয়-পরিচিত যারা ঠিকাদার তাদের মাধ্যমে ভোটের সময় ও ক্ষমতাসীন থাকাকালীন এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ফলে সংসদ সদস্যের একাংশ কর্তৃক তদারকির ঘাটতি লক্ষ্য  যায়।

আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ঠিকাদার অর্থের বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ করে লাভবান হন এবং বাস্তবায়নকারী ও তদারকি কর্তৃপক্ষ নিয়ম বহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে কাজের অনুমোদন দেন এবং জনপ্রতিনিধি, দলীয় ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব ও আর্থিক লাভ বজায় রাখেন। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট হারে কমিশন বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি মূলত অংশীজনদের মধ্যে পারস্পরিক সুবিধার সমঝোতা সম্পর্কের প্রতিফলন।

মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়, স্কিম বাস্তবায়নকালীন কাজের মান সম্পর্কে অভিযোগ থাকলেও ৭৭.৬ শতাংশ ক্ষেত্রে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিযোগ দিলে তার নিষ্পত্তি না হওয়া, প্রতিবাদ বা সরাসরি অভিযোগ করলে হুমকি ও হয়রানির সম্মুখীন হওয়া এবং ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আত্মীয়/পরিচিত/দলীয় কর্মী হলে ভয়ে কোনো অভিযোগ করতে আগ্রহী না হওয়া।

নমুনার ৫০টি নির্বাচনী আসনে সার্বিকভাবে ৩৪ শতাংশ স্কিমের ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চাহিদা/মতামত নেয়া হয়েছে। এই ৫০টির মধ্যে ২৯টি নির্বাচনী আসনের মোট স্কিমের ২৮.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য এলাকা পরিদর্শনের সময়ে সরাসরি এলাকাবাসীর চাহিদা/মতামত নিয়েছেন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সমন্বয় কমিটিতে এলাকার সাধারণ জনগণের তুলনামূলক কম প্রতিনিধিত্ব এবং কমিটিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার কারণে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণসহ তাদের মতামত দেয়ার সুযোগের ঘাটতি লক্ষ করা যায়।

স্কিমের দরপত্র পাওয়া থেকে পুরো কাজ শেষ করে চূড়ান্ত বিল ও জামানতের টাকা উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন অংশীজনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে (কখনো কখনো এককালীন) নিয়ম বহির্ভূত কমিশন বাণিজ্য বিদ্যমান। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ই-টেন্ডার পদ্ধতিতে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রবর্তন হলেও তদারকি প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার, সংসদ সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অনিয়ম রয়েছে। আইনি প্রতিবন্ধকতা, মিথ্যা মামলার ভয় ও হয়রানির আশংকায় অনিয়মের তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ ও আগ্রহের ঘাটতিসহ প্রতিবাদ এবং অভিযোগ না করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।

রাস্তা তৈরির সামগ্রী (ইট, রড, বালি, সিমেন্ট ইত্যাদি) ব্যবসার সাথে জড়িত স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশ থেকে নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়ে ঠিকাদারদের বাধ্য করা হয় এবং ক্রয় না করলে কাজে বাধা প্রয়োগসহ ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে ঠিকাদাররা নিম্নমানের ও পরিমাণে কম উপকরণ নিয়ে বাধ্য হয়ে সমঝোতা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঠিকাদার পূর্ণাঙ্গ কাজ ও মানসম্মত কাজ না করে বিল উত্তোলনের জন্য রাজনৈতিক প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তদবির করে থাকে। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ সম্পন্ন হওয়ার অনুমোদনসহ বিলের অর্থ ছাড় করাতে বাধ্য করা হয়।

আর পড়ুন:   বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণে দুই নৌ সদস্য নিহত

এসব দূর করতে টিআইবির সুপারিশগুলো হলো-

১. ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত সংসদীয় আসনে থোক বরাদ্দের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পৃথকভাবে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে এগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ করতে হবে ও কার্যকরতা বৃদ্ধির সুযোগগুলোর বিস্তারিত বিবরণ তৈরি করতে হবে এবং এই তথ্য পরবর্তী প্রকল্প পরিকল্পনায় ব্যবহার করতে হবে।

২. এ প্রকল্পের আইনি কাঠামো বা নীতিমালা সুনির্দিষ্ট করতে হবে, যেখানে স্কিম নির্বাচন প্রক্রিয়া, ভৌগোলিক অবস্থান এবং উপযোগিতা অনুযায়ী স্কিমের নকশাসহ এলাকা ও চাহিদা ভেদে বরাদ্দ বণ্টনের পূর্বশর্ত এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্দেশনা থাকবে।

৩. প্রকল্পের অধীনে স্কিম পরিকল্পনা ও তালিকাভুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট আসনের ভৌগোলিক অবস্থান এবং উপযোগিতা অনুযায়ী তার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।

৪. স্কিম তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে এলাকার জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সমন্বয় কমিটিতে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস করতে হবে।

৫. স্কিম এলাকায় কাজ চলাকালীন তথ্য বোর্ড স্থাপন করতে হবে যেখানে স্কিমের বিবরণ, বাজেট, সময়সীমা, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের নাম ও যোগাযোগের নম্বর ইত্যাদি থাকতে হবে।

৬. এই প্রকল্পের সব ধরনের তথ্য (নীতিমালা, আসনভিত্তিক স্কিমের তালিকা, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন, বাজেট, স্কিম বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিবরণ) একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

৭. কৃষি ও অকৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানসহ বিপণন সুবিধা বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ স্কিম পরিকল্পনা করতে হবে ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

৮. জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক শুদ্ধাচার চর্চার পাশাপাশি দুর্নীতির প্রবণতা ও সুযোগ হ্রাস করার জন্য কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা (জনপ্রতিনিধিদের আচরণ বিধি, তাদের কর্মকাণ্ডসহ আর্থিক হিসাবের বিবরণ উন্মুক্তকরণ, তাদের সম্পৃক্ততায় বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এলাকাভিত্তিক গণশুনানি ইত্যাদি) প্রবর্তন করতে হবে।

৯. স্কিম বাস্তবায়নকালীন স্থানীয় উপকারভোগীদের সমন্বয়ে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা (কমিউনিটি মনিটরিং) প্রবর্তন করা যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, সিটি করপোরেশন এলাকা সংশ্লিষ্ট ১৬টি আসন ছাড়া ছাড়া ২৮৪টি সংসদীয় আসনের এমপিরা প্রতিবছর এলাকার উন্নয়ন কাজের জন্য ৫ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ পেয়ে থাকেন। তবে এ বরাদ্দ পান না সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা।