৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার প্রথমদিনেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে আলহাজ্ব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সুজন বলেন, “না পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দেবো তবুও দুর্নীতিবাজদের সাথে কোনো ভাবেই আপোস করবো না। যারা এতোদিন অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছেন, তারা বিসমিল্লাহ করে তওবা করে ফেলুন, যাতে ভবিষ্যতে আর দুর্নীতি না করেন “

দায়িত্ব পালনে কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে তাঁদের উদ্দেশে প্রশাসক সুজন বলেন, “ যারা ঘুস খাবেন, অনিয়ম-দুর্নীতি,ষড়যন্ত্র ও দায়িত্বের সাথে বেঈমানি করে নগরবাসীকে কষ্ট দেবেন,তাদের আমি ক্ষমা করবোনা। আমি সাবেক মেয়র চট্টলবীর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও ছায়াসঙ্গি ছিলাম।এ কর্পোরেশনের সবকিছু আমার নখদর্পণে’, আমাকে ফাঁকিদেয়া চলবে না, ১৮০দিন আমি মাঠেই থাকবো।”

আজ (৬আগস্ট)সকাল সাড়ে ৯টায়  খোরশেদ আলম সুজন নগরভবনের প্রশাসক এর চেয়ারে বসেন। সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন চসিকের দায়িত্ব প্রশাসক সুজনের হাতে হস্তান্তর করেন।এবংতিনিকর্পোরেশনের সকল কাজে নবনিযুক্ত প্রশাসক সুজনকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

উল্লেখ্য, চসিকের বিভিন্ন বিভাগে অনিয়ম-দুর্নীতি লেগেই আছে।সিভিল প্রকৌশল বিভাগে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি ওপেন-সিক্রেট। টেন্ডার ও যাচাই বাছাইয়ে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ পুরোনো। রাস্তার নির্মাণ ও উন্নয়নকাজের পরিদর্শন ও তত্ত্ববধানে ঘাপলা-অনিয়ম, পরিমাপে অনিয়ম কারচুপি নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। রাস্তার কার্পেটিংয়ে পরিমাপ ও টেন্ডার সিডিউল অনুযায়ী হয় না। বিশেষত বর্ষার একটু আগে রাস্তা মেরামত-অর্থ অপচয়ের কারণ ও গোঁজামিলের জন্যে বিষেশভাবে দায়ী। অনেক সময় প্রয়োজনের নিরিখে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ না করে তদবির ও তোষামোদিতে কম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

চসিকের রাজস্ববিভাগে হোল্ডিংট্যাক্স দিতে গিয়ে নগরবাসী নানামুখি হয়রানির শিকার হতে হয়। করনির্ধারণে কর্পোরেশনের নীতিমালা মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। এলাকাভিত্তিক বর্গফুট অনুযায়ী অ্যাসেসমেন্ট করার কথা থাকলেও করআদায়কারী/নির্ধারণকারীরা তা অনুসরণ করেন না।করআদায়ে সর্বক্ষেত্রে গাফিলতি লেগেই আছে।

আর পড়ুন:   সোমালিয়ায় আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় হতাহত অর্ধশত

অন্যদিকে বিগত সময়ে (মেয়রমঞ্জুর আমলে) কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মচারির মদদে আকৃষ্ট হয়ে রাজস্ব সার্কেল বিভাজন করে দুর্নীতির পালে বাতাস বেগবান করা হয়েছে।কর্পোরেশনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আশির্বাদ নিয়ে কিছু অসাধু কর্মচারি কর-আদায়কারী থেকে সরাসরি করকর্মকর্তা পদে আসীন হয়ে প্রচুর আর্থিক সুবিধে আদায় করেছে। এতে করে রাজস্ব বিভাগে দারুণ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষাবিভাগে মেয়র মঞ্জুর আমলে প্রচুর অনিয়ম-দুনীতি হয়েছে। স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে অযোগ্য ও অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কর্পোরেশনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান মস্তবড় বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।প্রধান শিক্ষাকর্মকর্তা আর নেপথ্যে থাকা প্রশাসন জোটবেঁধে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা দিয়ে কর্পোরেশনকে বিরাট আর্থিক ক্ষতিতে ফেলে দেয়।শিক্ষকদের পদোন্নতি-পদায়নে মেধা ও যোগ্যতার মুল্যায়ন না করে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে।প্রয়োজনেরনিরিখে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদায়ন করা হয় নি।শিক্ষকদের টাইমস্কেল, সেলেকশান গ্রেড ও পদায়নে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধিমালা মানা হয়না- যদিও তাদের নিয়োগ,বেতনস্কেল, পদোন্নতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধিমালা অনুসরণ করা হয়ে থাকে।

চসিকের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগে রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে হয় না।জ্বালানী ব্যবহারে ব্যাপক কারচুপির ‘প্রকৌশল’ হয় এখানে।গাড়িমেরামত না করেও বিলতোলার অভিযোগ সর্বজনবিদিত।নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রাধিকার ও যোগ্য নন তারাও পৃথকপৃথক গাড়ি (বেবিটেক্সি) ব্যবহার করেন।এতেকরে প্রচুর অর্থের অপচয় হচ্ছে।

চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সুপারভাইজারদেরযোগসাজসে কাজ না করে হাজিরা দেখিয়ে বেতন ওঠিয়ে নেয়। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সময়মতো কাজে আসে না।এদের তত্ত্বাবধান সঠিকভাবে হয় না বলে এমনটা হচ্ছে।আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যবহৃত গাড়ির ট্রিপে গোঁজামিল ও জ্বালানী আত্মসাতের অভিযোগ সকলের মুখেমুখে। এছাড়া মশানিধনের ওষুধ ও ব্লিচিংপাউডার ক্রয়, মজুদ ও ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়ম ও গোঁজামিল রয়েছে।

বিদ্যুৎ প্রকৌশল বিভাগকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্রয়, মজুদ ও ব্যবহারে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। জেনারেটরের রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানী ব্যবহারে এখানে কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই।

আর পড়ুন:   বিশ্বে করোনায় একদিনে মৃত্যু ১০ হাজার ২৯২, আক্রান্ত ৭ লাখ ৯,৭৭৪ জন

স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে নগরবাসী ঠিকমতো স্বাস্থ্যসেবা পান না।জনগণের চেয়ে এখানে বেশি সুযোগ-সুবিধে পান কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারি ও তাদের পরিবার পরিজন। যে বিভাগ নাগরিকদের কোনো কাজে আসবে না, সেই বিভাগ রাখা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।তারপরওস্বাস্থ্যবিভাগকে ঢেলে সাজালে অবশ্যই নগরবাসী স্বাস্থ্যসেবা পাবে।স্বাস্থ্যবিভাগের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিতি ও সেবাদান অফিস সময় পর্যন্ত নিশ্চিত করতে হবে।মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়, মজুদ ও রক্ষণাবেক্ষণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধান-সম্পাদক, চাটগাঁর বাণী