৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী   মৃণাল ভট্টাচার্য্য শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গেল দিবাগত রাত ৩টায় চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন। সকাল থেকে  মরদেহ চট্টগ্রামের জে এস সেন হলে রাখা হয় তার সংগীতভক্ত, বন্ধু-বান্ধব ও সেই ৭১এর রণাঙ্গনের সাথীরা শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেসব সংগীতশিল্পী তাদের সংগ্রামী গানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে উজ্জীবিত ও সাহস যুগিয়েছিলেন,মৃণাল ভট্টাচার্য্য তাদেরই একজন। স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

মৃণাল ভট্টাচার্য্য ১৯৪৮ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার মহাদেবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম প্রয়াত ডা. নীরদ বরণ ভট্টাচার্য্য ও মা প্রতিভাময়ী ভট্টাচার্য্য। তিনি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটিয়ে ১৯৬৪ সালে সীতাকুণ্ড মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বিএ পাস করেন।

মৃণাল ভট্টাচার্য্য বাল্যকালে প্রতিবেশী মৃণাল ভট্টাচার্য্যরে কাছে সংগীতে প্রথম তালিম নেন। এরপর আবদুল আলীম চৌধুরী, মোহনলাল দাস, সৈয়দ আনোয়ার মুফতি, ওস্তাদ মকসুদ আলী, মিহির লালা, ওয়াহিদুল হক প্রমুখের কাছে তালিম নিয়ে তিনি সংগীতভূবনে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন।

১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন মতিনের নেতৃত্বে মৃণাল ভট্টাচার্য্য ইপিআর বাহিনীতে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি’র সদস্য হিসেবে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প, শরণার্থীশিবির ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সংগীত পরিবেশন করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জীবন্ত দলিল ‘মুক্তির গান’ ছায়াছবিতে সংগীত পরিবেশন ও অভিনয় করে তিনি কালের সাক্ষী হয়ে আছেন। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনবাংলা বেতারে অংশগ্রহণ করেন এবং নিয়মিত সংগ্রামী গান গেয়ে মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন।১৯৭১ সালের ১৬ডিসেম্বর নিয়াজীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে পরিবেশিত ‘ বিজয় নিশান উড়ছে ঐ, খুশির হাওয়ায় ঐ উড়ছে’- গানটিতে মৃণাল ভট্টাচার্য্য সহশিল্পী ছিলেন।  তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী, সংগীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন।

আর পড়ুন:   দেশে করোনায় আরো ৯৪ জনের মৃত্যু, শনাক্ত কমে ৩৭২৪

তিনি ১৯৭৩ সালে অগ্রণী ব্যাংকের অফিসার পদে যোগদান করেন। ২০০৫ সালে ম্যানেজার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

মৃত্যুকালে  বীর সৈনিক মৃণাল ভট্টাচার্য্য তার সহধর্মিনী রত্না ভট্টাচার্য্যকে রেখে যান।তাদের  দু’পুত্রসন্তানের মধ্যে  বড়ছেলে সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে জিএম পদে চাকরি করেন। ছোটছেলে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

মৃণাল ভট্টাচার্য্য সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্যে বিভিন্ন সংগঠন থেকে সম্মাননা স্মারকে ভূষিত হয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম আইনজীবী বিজয়া সম্মিলন পরিষদ সম্মাননা-২০১১, চট্টগ্রাম লায়ন্স ক্লাব সম্মাননা-  ২০১১, চট্টগ্রাম সংগীত পরিষদ সম্মাননা- ২০১২, চট্টগ্রাম একাডেমি সম্মাননা- ২০১২, চট্টগ্রাম উদীচী সম্মাননা- ২০১২, বাংলাদেশ টেলিভিশন শিল্পী সংস্থা সম্মাননা- ২০১৪, চট্টগ্রাম বিজয় দিবস উদযাপন পরিষদ সম্মাননা- ২০১৬, চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী স্কোয়ার্ড সম্মাননা- ২০১৬, বর্ণালী কাব সম্মাননা-২০১৬, চট্টগ্রাম আনন্দী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সম্মাননা-২০১৭,চট্টগ্রাম শ্রুতি অঙ্গন সম্মাননা- ২০১৭, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী সম্মাননা- ২০১৮, সীতাকুণ্ড মেঘমল্লার খেলাঘর আসর সম্মাননা-২০১৮ স্মারকে ভূষিত হন।

মৃণাল ভট্টাচার্য্য বর্তমানে চট্টগ্রাম আর্য্য সংগীত সমিতি’র সভাপতি ও চট্টগ্রাম নজরুল সংগীত শিল্পী সংস্থার সভাপতি হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সংগীতজগতে অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায়

প্রয়াত মৃণাল ভট্টাচার্য্যকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সম্মাননা জানানোর পর নিজ জন্মস্থান সীতাকুণ্ডের মহাদেবপুর কেন্দ্রীয় শ্মশানে দাহ করা হবে আজ।বিদায়কালে জাতির এ শ্রেষ্ঠসন্তানের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।