৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার/মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার নানারকম জিনিস আর আসবাব দামিদামি/সবচেয়ে কমদামি ছিলাম একমাত্র আমি/ ছেলে আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভম / আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম’। বর্তমান সমাজ সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বাস্তবতার নিরেট নিষ্পেষণে ‘নচিকেতা’র মর্মস্পর্শী জনপ্রিয় এই গান আজকের ‘বাবা’ দিবসে প্রাসঙ্গিক কিনা তা ভাবনার সংকটে ফেলেছে। অথচ ছোটবেলায় ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা পড়তে গিয়ে মুখস্ত করে পরীক্ষা দিতে হতো- ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহী পরমং-তপঃ, পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা’ অর্থাৎ পিতা সবদেবতার ঊর্ধ্বে। শ্রদ্ধার, ভক্তি, প্রণাম নিবেদনের সর্বোত্তম ছায়া। পিতার তুলনা একমাত্র পিতাই। অন্য কোনো কিছুর সাথে সম্ভব নয়। তিনি বটবৃক্ষ। সন্তানের অমল-শীতল ছায়া, বাবারা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন। বাবার অর্থ দাঁড়ায় নিঃসীম নিরাপত্তা আর নির্ভরতার আকাশ-যা বিশাল ব্যাপৃত।

সন্তানের প্রতি বাবার ভালবাসা নিখাত, স্বার্থহীন, দ্ব্যর্থহীন। কোনো কোনোক্ষেত্রে রাশভারী চেহারার আড়ালে আবডালে রাগ-শাসন দেখালেও বাবার কোমল হৃদয়ের গভীরতা অতলান্ত-অসীম। সন্তানের ভালোর জন্য মঙ্গঁলের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য বাবারা জীবনের স্বাদ-আহ্লাদ, ভোগ-বিলাস সবকিছুই নির্দ্ধিধায় ত্যাগ করেন, অনায়াসে অবলীলায়। সন্তানেরও শাসন-আদর আর বিশ্বস্ততার নির্ভরশীল জায়গা হলো বাবা। জীবনের সূচনালগ্নে যে আদর্শ  নিয়ে প্রতিটি মানবশিশু তাঁর নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করতে শুরু করে, সেই আদর্শের আকাঙ্ক্ষার দিকনির্দেশনার প্রথম পুরুষ কিন্তু ‘বাবা’। বাবা, আব্বা, আব্বু, আব্বাজান, বাবাই, পিতা, পিতাজি ইত্যাদি নানাশব্দের মাধ্যমে সন্তান তাঁর অস্তিত্বের আপনত্বকে প্রকাশ করে। তাঁর নিখাদ আশ্রয়স্থল, ভরসাস্থলকে, নির্ভরতার, বিশ্বস্ততার আপন আলোয় উদ্ভাসিত করে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া বাবা নিয়ে বিখ্যাত গানটি খুব মনে পড়ছে ‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতে / বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না / জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা/ মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না / আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়………’। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অতি প্রাসঙ্গিক এই গানের কলিটি। করোনাকাণ্ডে সারা পৃথিবী যখন গভীর অসুখে নিমিজ্জিত, তখন বিশ্বের সব বাবারাই কিন্তু সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে ভয়ার্তের এই অসুখ, নিষ্ঠার সাথে মোকাবিলা করছে। আক্রান্ত হচ্ছে, আক্রমণের শিকার হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, আর পরিবার থেকে আলাদা থাকতে হচ্ছে। কখনো বাসার ভেতর কিন্তু স্পর্শহীন। নিঃশ্বদ্ধের যতনা সহ্য করতে হচ্ছে। বাবা-সন্তানের খোলামেলা ভাববিনিময়ের মাধ্যম সব রুদ্ধ, তখনই দুই পক্ষের মনের আকুতি হৃদয়ের বাসনা, আকাঙ্ক্ষা কামনা না অতি বেদনায় বর্হিপ্রকাশ হচ্ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো মাধ্যমে ছিঁটেফোঁটা ২/১টি বেদনার দৃশ্যকাব্য কেউ না কেউ তুলে ধরছে। আমরা পৃথিবীর সব বাবারা এই করুণ আকুতি কাহিনী প্রত্যক্ষ করে হৃদমন্দিরে অনুকম্পন অনুভব করি। আক্ষেপ করি, মনে মনে সমবেদনা জানাই কখনো বা ভারি হয়ে আসে গলার স্বর, মুক্তার মতো স্বচ্ছ দু’ফোটা অশ্রু বির্সজন করে সমব্যথি হই।

আর পড়ুন:   মেঘনায় জাহাজ ডুবি

সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসার মনের গহিনের, শর্তহীন আনন্দ অনুভবের ভোগবাদী মানসিকতার সামাজিক এই সময়ে কোনো কোনো সন্তান পিতার প্রতি নৈতিক দায়িত্বে অবজ্ঞা অবহেলার নির্মম নিদর্শন রাখছে। নরাধম অল্প কিছু সন্তানের দ্বারা বৃদ্ধ বাবারা যখন নিগৃহীত হয় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, চরম অবহেলার শিকার হয় তখন কুলাঙ্গার সেই সন্তানের দ্বারা বৃদ্ধ বাবারা যখন নিগৃহীত হন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন, চরম অবহেলার শিকার হন তখন কুলাঙ্গার সেই সন্তানের অপরাধে নিজেকেও অপরাধী মনে করি। নিজের শৈশবের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করি, নিজেদের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে আমাদের বাবারা কত মায়া-মমতা দিয়ে পরম যত্নে লালন-পালন করেছেন সন্তানদের। দুমুঠো খাবার তুলে দেয়ার জন্য, আমাদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য সকাল-সন্ধ্যা কত না পরিশ্রম করেছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। শতকষ্টেও কিন্তু আমাদেরকে শিশু আশ্রমে পাঠাননি। কালপরিক্রমায় বাবারা যখন বৃদ্ধ তখন তিনি আবার শিশুতে পরিণত হন। আমরা তা ভুলে যাই। বার্ধক্যকে দ্বিতীয় শৈশব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কবি ও দার্শনিক ‘শেক্সপিয়র’। তখন হয়তো মেজাজ খিটখিটে হয়, আচরণ সামান্য পরিবর্তন হয়, সমান্যতে তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতে পারে, জীবদ্দশার এই আচরণ সমাজে সর্বাধিক স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে ধর্মের বাণীতেও সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ অলরাউন্ডার আমাদের বাবারা যেন জীবনভর সন্তানের পাশে থাকতে পারে, সন্তানকে যেমন আগলে রেখেছিলেন, সন্তানও যেন কর্মক্ষমহীন বয়সে বাবারা প্রতিকূলতায় না পরে সে দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতেই বাবা দিবসের উদ্ভব। পৃথিবীর সব বাবাদের তাঁর দায়িত্বশীল কর্মের প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রকাশের জন্য ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় কোয়ারমন্টের এক গীর্জায় প্রথম পালন করা হয়। এরপর নানা মত-পথ-ধাপ-মন্তব্য, বিরোধীতা, টানাপাড়েন মোকাবিলা করে চলতে থাকে এই উদ্যোগ। শেষে ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের বিশেষ উদ্যোগে মার্কিন সংসদে বিল পাশের মাধ্যমে নির্ধারণ হয় প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার হবে শুধুই বাবাদের। এই দিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভালবাসা সম্মান মর্যাদার আসনে বাবাদের অধিষ্ঠিত করে সন্তানদের আলোকিত হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করে পুরো বিশ্ব। বিভিন্ন দেশ তাদের ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক কৃষ্টির সাথে মিল রেখে আন্তরিক নিষ্ঠার সাথে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এখানে বাণিজ্যিক বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। ফুল, কেক, কার্ড, গিফট বিবিধ উপকরণ বিন্দুমাত্র দ্বিধাহীন চিত্তে স্বার্থহীন ভালবাসা প্রকাশের মূল্যবান সুযোগ মনযোগের সাথে ক্রয় করে সমর্পন করে, নিবেদন করে। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক দেশের সাথে বাংলাদেশেও অতি গুরুত্ব দিয়ে অন্তরের অন্তঃস্থল নিংড়ানো শ্রদ্ধা জানিয়ে পিতৃ দিবসের নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে পালন করে। বাবাদের যে অপরিসীম গুরুত্ব তা আলাদাভাবে তুলে ধরাই এই দিবস পালনের মূল লক্ষ্য।

আর পড়ুন:   খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ

লেখকঃখন রঞ্জন রায়, টেকসই উন্নয়ন কর্মী, khanaranjanroy@gmail.com