৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আলী আদনান *

ছোটবেলা থেকেই ইপসা ও আরিফুর রহমান- এ দুটি নামের সাথে আমি ও আমরা পরিচিত। প্রশ্ন ওঠতে পারে, ‘আমরা’ মানে কারা? আমরা মানে আমাদের সমসাময়িক সীতাকুণ্ড প্রজন্ম। ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ার সময় কোনো এক কুইজ প্রতিযোগিতার ফরম আনার জন্যে প্রথম ইপসা অফিসে গিয়েছিলাম। সীতাকুণ্ড কলেজ রোডের রেলগেটসংলগ্ন সেই বেড়াঘরের অফিস। অফিসটি এখনো আছে। সীতাকুণ্ডের মাটিতে সময়ের ব্যবধানে আরো অনেক সংগঠনের জন্ম হয়েছে। অনেক সংগঠন সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়ে বিকশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে কালের ব্যবধানে যে সংগঠনটি জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থানকে গৌরববোজ্জ্বলভাবে তোলে ধরতে সক্ষম হয়েছে সেটি হচ্ছে স্থায়ীত্বশীল সমাজ উন্নয়নের জন্যে সংগঠন ইপসা।

শুরু থেকে ইপসা কখনো গতানুগতিক ধারায় হাঁটেনি। নিছক আড্ডাবাজি, মাঝে মধ্যে পিকনিক করা, গল্পগুজব করার জন্যে সংগঠন করা- এমন মানসিকতায় ইপসা নেতৃত্ব কখনোই বিশ্বাসী ছিলেন না। বরং শুরু থেকেই ইপসা চেয়েছে কিছুএকটা করতে। কিছুএকটা করা। বিভিন্ন কমিউনিটির চাহিদাকে মাথায় রেখে প্রকল্প তৈরি করা, সেই প্রকল্পকে বাস্তবে রূপদান করা ছিল ইপসা’র গত ছত্রিশ বছরের বড় সাফল্য। একটা সংগঠনকে মানুষ চিনে তার নেতৃত্বের মাধ্যমে। সংগঠনটির সফলতা ব্যর্থতাও নির্ভর করে নেতৃত্বের সততা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শীতার ওপর। ইপসা এক্ষেত্রে ভাগ্যবান। ইপসা নেতৃত্ব এ গুণগুলোর ব্যাপারে কখনো আপোস করেনি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে এখানে সংগঠনের স্বার্থ সবসময় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। হঠাৎ করে বিষয়টি কারো কারো জন্যে পীড়াদায়ক হলেও- সামগ্রীকভাবে এতে লাভবান হয়েছে সংগঠন তথা ইপসা।

সীতাকুণ্ড একটি ছোট্ট মফস্বল শহর। এখানে সবাই সবাইকে কমবেশি চিনে। যারা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের ব্যস্ত রাখে তাদের পরিচিতির বহরটা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কাজ করতে গেলে সবসময় সবার কাছে প্রশংসিত হওয়ার সুযোগ নেই। নানা রকম কানাঘুষা, পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য গায়ে এসে পড়বেই। কিন্তু সীতাকুণ্ডের মাটিতে যারা দীর্ঘদিন বসবাস করছেন তারা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন- ইপসা কে নিয়ে কখনোই কোনো বিতর্ক বা নেতিবাচক মন্তব্যের সুযোগ কারোই ছিল না, এখনো নেই। ইপসা’র শুরু একটি সাধারণ যুবসংগঠন থেকে। পথপরিক্রমায় সংগঠনটি সমাজউন্নয়ন সংগঠনের স্তর অতিক্রম করে  এখন এটি স্থায়ীত্বশীল সমাজ উন্নয়ন সংগঠন। এ যাত্রা ইপসা নেতৃত্বের জন্যে ছিল কঠিন পরীক্ষার। একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবীর হাত ধরে ইপসা’র যাত্রা শুরু হলেও আজকের ইপসা’য় শুধুমাত্র নিয়মিত কর্মী কাজ করে ৩,২০০ জন। যার বড় একটি অংশ নারী। নারীর ক্ষমতায়নে বা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইপসা যে সুযোগ তৈরি করেছে শুধুমাত্র সেটির জন্যে ইপসা অনেকের কাছে আজ উদাহরণ। ইপসা’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল কর্মী পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, সবাই একই শৃংখলার সূত্রে গাঁথা। সংগঠনটিতে সবার জন্যে একই নীতিমালা। ইপসা’র প্রতিটা কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে স্বয়ং প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমানও জবাবদিহিতায় বাধ্য। যা দেশের অন্য অনেক সংগঠনে কল্পনা করা যায় না। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিই, ইপসা পরিবারে কোনো কর্মী ধূমপান করেন না। ইপসা’র হেড অফিস থেকে শুরু করে প্রতিটা শাখা অফিস এমনকি ইপসা সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো ধূমপানমুক্ত। ইপসার প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান, পরিচারনা পর্ষদ থেকে শুরু করে পুরো কাঠামোটির সকলেই অধূমপায়ী। ইপসা’র বেশ কয়েকজন নারী কর্মকর্তার সাথে আমার পারিবারিক যোগাযোগ আছে। অনেকেইে আমাকে বলেছেন, ইপসায় কাজ করা অবস্থায় তারা অন্য লোভনীয় চাকরীর প্রস্তাব পেলেও তারা ইপসা’র চাকরি ছাড়তে চান না। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, ইপসা তাদের জন্যে নিরাপদ। দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ইপসা হয়ে ওঠেছে তাদের ঘরবাড়ি। একজন আবেগাক্রান্ত হয়ে আমাকে বলেই ফেললেন, আমার নিজের পরিবারের স্বার্থ আর ইপসা’র স্বার্থ আমার কাছে এক সমান। একটি প্রতিষ্ঠান যখন তার সকল কর্মীর স্বার্থ সমান চোখে দেখতে বা মূল্যায়ন করতে পারে অর্থাৎ কর্মীদের কর্মোপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে সক্ষমতা দেখায় তখন সেই প্রতিষ্ঠানটির পথ রুদ্ধ করার ক্ষমতা কারো থাকে না। যদিও একদিন হাতেগোনা কয়েকজন যুবকের স্বপ্ন হিসেবে ‘ইয়ং পাওয়ার’ ক্লাব ( ইয়ং পাওয়ার পরবর্তীতে হয় ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশান যা সংক্ষেপে ইপসা নামে পরিচিত) যাত্রা শুরু করেছিল তথাপি আজ ইপসা শুধু গুটিকয়েক যুবকের স্বপ্ন নয়। বরং ইপসা’র সম্মানের সাথে জড়িয়ে আছে ইপসা’র সকল কর্মজীবীর সম্মান। ইপসা’র সম্মানের সাথে জড়িয়ে আছে সীতাকুণ্ডবাসীর সম্মান। কারণ একদিন এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিল ইপসা। ইপসা’র সম্মানের সাথে জড়িয়ে আছে সকল সমাজকর্মী ও উন্নয়নকর্মীদের সম্মান। কারণ, ইপসা তাদের অনুপ্রেরণা। সর্বোপরি ইপসা’র প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে জড়িয়ে আছে সকল উপকারভোগীর সম্মান। অস্বীকার করার উপায় নেই, সেই তালিকায় আপনি, আমি আমরা সবাই পড়ছি।

আর পড়ুন:   সিটি মেয়রের সাথে এডটকো বাংলাদেশ’র প্রতিনিধি দলের মতবিনিময়

সাম্প্রতিক সময়ে একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে গেছে। ঘটনার শুরু গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে। একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তার বাসভবন থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় এক শিশু গৃহকর্মীকে উদ্ধার করা হয়। সেই শিশুগৃহকর্মী গৃহকর্তার ( ইপসা পরিচালক) বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে নানা ধরনের তদন্ত শেষে পরিচালক মাহবুবুর রহমানকে গ্রেফতার করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনী। ঘটনার দিন সাথে সাথেই ইপসা কর্তৃপক্ষ পরিচালক মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়। তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এবং কয়েকদিনের মধ্যে গঠণতন্ত্র অনুসারে মাহবুবুর রহমানকে ইপসা’র কার্যনির্বাহী পরিষদ ও সাধারণ পরিষদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমানের ভাষায়, তিনি (মাহবুব) আমাদের কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু যে কাজটি করেছেন সেটি সংস্থার নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

ইপসা’র শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ও জেন্ডার নীতিমালা অনুসারে এবং ইপসা সাধারণ পরিষদ ও কার্যকরী পরিষদের অনুমোদনক্রমে মাহবুবুর রহমানের  বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে একবছর। বেশকিছুদিন আগে অভিযুক্ত মাহবুবুর রহমান জামিনে বেরিয়ে আসেন। গণমাধ্যমে যে বিষয়টি এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত তা হলো, নির্যাতনের শিকার সেই শিশুটির পরিবারকে মামলা তোলে নেয়ার জন্যে নানাধরনের চাপ দেয়া হচ্ছে। চাপ দেয়া হচ্ছে ইপসা কর্তৃপক্ষকেও যেন সেই পরিচালককে স্বপদে বহাল করা হয়। এ নিয়ে বহিষ্কৃত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নানা ধরনের হুমকি দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ এনে গত ৭ মার্চ চাঁন্দগাঁও থানায় জিডি করা হয়েছে। জিডি নম্বর ৪০১। এ সমাজে রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় নেমেছে এমন উদাহরণ কম নয়। এবার সেই তালিকায় নাম লেখালেন মাহবুবুর রহমান। যিনি গতবছর পর্যন্ত ইপসা’র মতো একটি সম্মানজনক ও পরিচ্ছন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মাহবুবুর রহমান কেমন শাস্তির মুখোমুখি হবেন- সেটা আইনের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের আলোচনার বিষয় একটু অন্যদিকে। প্রথমত, একজন ব্যাক্তির নৈতিক স্খলন ঘটলে সে তার প্রতিষ্ঠানকে কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। ইপসা কর্তৃপক্ষ সেটা ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ও সমাজের স্বার্থে দীঘদিনের সম্পর্ককে প্রশ্রয় না দিয়ে মাহবুবুর রহমানকে সাথে সাথে বহিষ্কার করেছেন এবং তা সকল প্রকার নিয়ম কানুন মেনেই। কোনো ব্যাক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের দায়ভার প্রতিষ্ঠান কেন নেবে? না বললেই, নয়। মাহবুবুর রহমানের অপকর্মের কিছুটা খেসারত ইপসা’কে ইতোমধ্যে দিতে হয়েছে। দায়ভার বহন করতে হয়েছে শতাধিক ইপসাকর্মীকে। সংস্থাটির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এরকম অপকর্মে জড়িত থাকায় ইউনিসেফ’র সহযোগিতায় ইপসা’র বাস্তবায়িত শিশুসুরক্ষা ও শিশুউন্নয়নবিষয়ক দুটি বড় প্রকল্প বন্ধ করে দেয় এবং ইপসা’র সাথে পার্টনারশীপ বাতিল করে।আজকের দিনে এই যে শতাধিক কর্মী বেকার হলো তার দায়ভার মাহবুবুর রহমান এড়াতে পারেন না। নির্যাতিত শিশুটিকে ও তার পরিবারকে মামলা তোলে নেয়ার জন্যে যারা চাপ প্রয়োগ করছেন- তাদের স্পর্ধা সীমাহীন। সহজেই বোঝা যায়, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। নির্যাতিত শিশুটিকে যদি কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় বা যদি ইপসা’র সম্মান নিয়ে কোনো ধরনের ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা হয়, তাহলে সকল সংবাদকর্মী, উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকারকর্মীরা নিজ নিজ জায়গা থেকে সোচ্চার হতে বাধ্য হবে। মহামান্যে আদালতের রায়ের মাধ্যেমে বিষয়টির সুন্দর সমাধান হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত শিশুটির পরিবারকে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দেবে এবং সকল চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ইপসা অতীতের ন্যায় গৌরবদীপ্তভাবে এগিয়ে যাবে- সেটাই প্রত্যাশা।

আর পড়ুন:   এমবিএ এসোসিয়েশন চবি’র  কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও ইফতার মাহফিল

লেখকঃ সংবাদকর্মী ও তথ্যচিত্রনির্মাতা।