৭ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

গতকাল দিনভর চট্টগ্রামের এমন কোনো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল নেই যেখানে যোগাযোগ করেনি কিন্তু আইসিইউ বেড খালি পাওয়া যায়নি।পর্যান্ত অক্সিজেনের অভাবে ভোররাতেই (২০জুন) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রোটারিয়ান নাথুরাম নাথ (৭০)।
রোটারি ক্লাব অব চিটাগং হিলটাউনের সদস্য রোটারিয়ান নাথুরাম নাথ কোভিট-১৯সহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিনদিন আগে ইউএসটিসি’র বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হন।নাথুরাম বাবুর ছেলে নারায়ণ ও মেয়েজামাই চন্দনের বারবার অনুরোধে অনেক চেষ্টা করেও আইসিইউ সুবিধা করে দিতে ব্যর্থ হই।সময়মতো আইসিইউ সুবিধা পেলে রোটারিয়ান নাথুরামের এ করুণ পরিণতি হতো না। আজ শনিবার বিকেলে
প্রয়াত রোটারিয়ান নাথুরাম এর শেষকৃত্যানুষ্ঠান সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের নডালিয়া গ্রামে সম্পন্ন হয়েছে।
আমি বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক প্রয়াত রোটারিয়ান নাথুরাম নাথের বেদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছের এবং রাখছেন এমন ১৪জন ব্যক্তিত্বকে  চাটগাঁর  বাণীর দেড়যুগপূর্তি উপলক্ষে এবছরের প্রথমদিকে  মরণোত্তর পদক ও গুণিজন সংবর্ধনা দেয়া হয়। এতে নাথুরাম নাথও সংবর্ধিত হন।

নাথুরাম নাথ নীরবে-নিভৃতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় ধরে দান-অনুদান দিয়ে আসছেন, দল-মত-নির্বিশেষে সর্বমহলে রয়েছে যার সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা, সেই সমাজহিতৈষী পরোপকারী ব্যক্তি  ।তিনি আমৃত্য চট্টগ্রামের সেলিম এন্ড ব্রাদার্স লিমিটেডে এর এস্টেট ম্যানেজার, সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা নারায়ণ আশ্রমের সভাপতি বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী নাথুরাম নাথ।

                                                                                         ডেইলী সান এর সম্পাদক এনামুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে চাটগাঁর বাণী পদক নিচ্ছেন নাথুরাম নাথ

নাথুরাম ১৯৫০ সালের ১০এপ্রিল সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের দক্ষিণ মাহমুদাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা চপলা বালা দেবী, বাবা শ্রী হরিনাথ। ষাটের দশকে তাঁর মা বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন। বাবা ছিলেন একই ইউনিয়নের মেম্বার। ১৯৬৮ সালে তিনি মসজিদ্দা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৭১ সালে সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টামিডিয়েট পাশ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতে চলে গেলে প্রতিবেশি একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের জায়গাজমি দখলে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে নাথুরাম দখলকৃত সহায়সম্পদ উদ্বার করতে যেয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে যান। এতে করে তাঁর আর লেখাপড়া হয়ে ওঠেনি। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। সীতাকুণ্ড কলেজ ছাত্রলীগের তিনি সহ-সম্পাদক ছিলেন। ৬৯এর গণঅভ্যুথান থেকে শুরু করে ৭০এর নির্বাচন,পরবর্তীতে জাতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখেন। বিশেষকরে সীতাকুণ্ডের বিগত প্রতিটি এমপি-উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের ক্ষেত্রে অর্থ-শ্রম-মেধা দিয়ে অবদান রেখেছেন। বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের তিন-তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান রহমত উল্যাহ যখন বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তখন (১৯৮৩) তিনি ওই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ওইসময়ে নাথুরাম ছিলেন রহমত উল্লাহ চেয়ারম্যানের পরিষদে মেম্বার। দলে বড়কোনো পদ-পদবীতে না থাকলেও আওয়ামী লীগ ও এর ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।

আর পড়ুন:   ‘গোলাগুলিতে’ ২ যুবক নিহত লক্ষ্মীপুরে

নাথুরাম সনাতনধর্মী হলেও মনেপ্রাণে তিনি অসাম্প্রদায়িক, উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সাধুপুরুষ। দান-অনুদানের ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে কোনো বাছ-বিচার নেই। মসজিদ-মন্দির সবখানেই সমানে তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন। বহু মুসলিম পরিবারের সন্তান-সন্ততির লেখাপড়া ও বিয়েশাদিতে তিনি নিরবে সহায়তা  দিতেন। নডালিয়ার জনৈক হাফিজুর রহমানের আমৃত্য পারিবারিক যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করেন। এছাড়া এলাকার আরও অনেকে বিপদে পড়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এসে আর্থিক সহায়তা নিয়েছেন। তিনি যে বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক তা কিন্তু নয়। তবে তাঁর কাছে যা আছে- তা থেকে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত গরীব-দুঃখী মানুষকে তিনি সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। অসহায় ও নিরীহ মানুষের জন্যে কিছুএকটা করতে পেরে তিনি মানসিক প্রশান্তি খোঁজে পেতেন।

শুধু সীতাকুণ্ড নয় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক-সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তিনি  সাধ্যতম আর্থিক সহযোগিতা করতেন। ১৯৮৯ সালে বরিশালের সুবল গোস্বামী ‘শ্যামরাই প্রভুর আশ্রম’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে নাথুরাম তাঁর নিজএলাকা চারালকান্দিতে জমি ও অর্থ দিয়ে তা প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহায়তা করেন। শ্যামরাই প্রভুর আশ্রম এর পাশে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দুর্গামন্দির।বাড়বকুণ্ডের নডালিয়া কামিল জমাদার ফোরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাসহ ভুলাইপাড়া জামে মসজিদ স্থাপনে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন-যা ডা. আমজাদ হোসেনসহ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এছাড়া বাড়বকুণ্ডের সাহাপাড়া রক্ষাকালী বাড়ি,বাড়বকুণ্ড বাজার জামে মসজিদ, দাড়ালিয়াপাড়া জামে মসজিদ, মীরসরাইয়ের আবুতোরাব জগন্নাথ মন্দির, ফেণীর রক্ষাকালী বাড়ি, পটিয়ার উত্তর ভাটিখাইন নাথপাড়া জগদীশ মহাজনের বাড়ির শ্রী শ্রী লোকনাথ সেবাশ্রম, দক্ষিণ কাট্টলী’র হরিমন্দির, নডালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অলিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাউজানের চিকদাইর আলীমুদ্দিন সওদাগর জামে মসজিদ, ফটিকছড়ির সুন্দরপুলের ইঞ্জিনিয়ার মুস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী জামে মসজিদ ও বাড়বকুণ্ড উচ্চবিদ্যালয়কে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন। বাড়বকুণ্ডের নডালিয়া সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকও তিনি জমি দিয়ে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।

নাথুরাম এলাকার বাড়বকুণ্ড সি সি সি উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি, শ্রী শ্রী নায়ায়ণ আশ্রম পরিচালনা পর্ষদের কার্যকরী সভাপতি, সীতাকুণ্ড টোল কমিটির সদস্য, সীতাকু- সমিতি-চট্টগ্রাম ও বাড়বকুণ্ডের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াসংগঠন কাকলী’র আজীবন সদস্যসহ বহু সমাজসেবী সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

আর পড়ুন:   ছেলেসহ আওয়ামী লীগ নেতা আটক সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে

নাথুরাম একজন মানবদরদী মানুষ। সমাজের অবহেলিত মানুষের চিকিৎসাক্ষেত্রেও তিনি অবদান রাখতেন। বিশেষকরে বারৈয়াঢালা নারায়ণ আশ্রমের সভাপতি হিসেবে তাঁরই উদ্যোগে লায়ন্স ক্লাব ও অন্যান্য সমাজসেবী সংগঠনের সহায়তায় প্রতিবছর চক্ষুশিবির করে বিপুলসংখ্যক মানুষকে তিনি চিকিৎসাসেবা দিতেন ।এছাড়া তিনি আশ্রমে একটি মাতৃসদন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে সকল ধর্মের মানুষকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার চিন্তাভাবনা ও ছিল।

তাঁর সহধর্মিনী মিনতিপ্রভা দেবী একজন গৃহবধূ। তাঁরা চারকন্যা ও এক পুত্রসন্তানের জনক-জননী। কন্যারা হলেন- লিপিকা রাণী দেবী (গৃহবধূ), শিল্পী রাণী দেবী (গৃহবধূ), বাণি প্রভা দেবী (গৃহবধূ) ও প্রিয়াঙ্কা রাণী দেবী। প্রিয়াঙ্কা স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিডেটে জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করেন। একমাত্র ছেলে নারায়ণ দেবনাথ ইউএসটিসিতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করছে।