৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

সীতাকুণ্ডে শিক্ষা ও সমাজসেবায় যিনি আমৃত্যু কাজ করেছেন সে-ই শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক হলেন মরহুম আলহাজ্ব মুহাম্মদ এলাহী বক্স সওদাগর। আজ ১৭জুন তাঁর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। গণমানুষের জন্যে যারা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেন,আত্মমানবতার সেবায় যারা নিজেদের উৎসর্গ করেন তাঁরা মরেও অমর হয়ে থাকেন। ঠিক একইভাবে সমাজসংস্কারক ও কর্মবীর এলাহী বক্সও তাঁর সৃজনশীল কাজের মধ্যে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। মৃত্যুদিবসে ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব মরহুম এলাহী বক্স এর বিদেহী পরমাত্মার প্রশান্তি কামনা করছি।

এলাহী বক্স ১৯২৩ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার দক্ষিণ ইদিলপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মুহাম্মদ আবদুল খালেক ও মা জোবেদা খাতুন এবং  সহধর্মিণীর নাম মঞ্জুরা বেগম। তিনি ছিলেন একজন গুণধর ব্যক্তিত্ব, বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী। মনের বিশালতা, চিন্তার গভীরতা ও সুনিপুণ কর্মপরিকল্প্নার মাধ্যমে তিনি একটি সুষ্ঠু সমাজবিনির্মাণের জন্যে যুগ যুগ ধরে অবদান রেখেছেন। একনিষ্ঠ সাধনা, পরিশ্রম, দক্ষতা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যক্তিজীবনে তিনি সাফল্যের শিখরে পোঁছেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সৎ, অমায়িক ও আদর্শ ব্যক্তি।

বাল্যকালে বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাহী বক্স মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। সংসারজীবনে মা ও বড়বোনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ম্যাট্রিক না দিয়েই বার্মায় চলে যান। সেখানে তিনি ১৩বছর অতিবাহিত করেন ও কালক্রমে একজন ভালো ব্যবসায়ী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তীতে মাতৃভূমির আকর্ষণে তিনি ১৯৬১ সালে দেশে ফিরে চট্টগ্রাম শহরের কদমতলীতে ব্যবসা শুরু করেন। এখানে তিনি ইসলামিয়া অটোমোবাইল্স নামে মোটরপার্টস ব্যবসার সূচনা করেন। এটি-ই চট্টগ্রামে মোটর পার্টস ব্যবসার প্রথম প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে তাঁরই উদ্যোগে চট্টগ্রাম মোটর পার্টস ব্যবসায়ী সমিতি গঠিত হয় এবং ওই সংগঠনের তিনি একাধারে বেশ কয়েকবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এলাহী বক্স সওদাগর কর্মজীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি সীতাকুণ্ড সদরের শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে থাকা অবহেলিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ইদিলপুর গ্রামে শিক্ষার আলোর-মশাল প্রজ্জ্বলিত করেন। বিশেষকরে নারীশিক্ষা প্রসারে তিনি এ এলাকায় যুগান্তকারী বিল্পব সাধন করেন। ছেলেদের পাশাপাশি নারীদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে মায়ের নামে একটি মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম যুবাইদিয়া ইসলামিয়া মহিলা আলিম মাদ্রাসা। ১৯৮৬ সালে ৯শতক জমির ওপর মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থানসংকুলান না হওয়ায়  এলাহী বক্স নিজের ৪৮শতক জমির ওপর নতুন মাদ্রাসাভবন নির্মাণ করেন।শিশুদের কোরান শিক্ষার জন্যে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন যুবাইদিয়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসা।

আর পড়ুন:    ‘নারীসদস্য যুক্ত করা হবে রেলের নিরাপত্তাবাহিনীতে’

এলাহী বক্স সওদাগরের দৃঢ় প্রত্যয় ও বাসনা ছিল, নিজএলাকায় একটি মহিলা মাদ্রাসা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, মহিলা কলেজ, দাতব্য চিকিৎসালয়, হেফজ ও এতিমখানা ও সমাজউন্নয়নমূলক বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা। মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য সন্তানেরা বাবার স্বপ্নপূরণের জন্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে মঞ্জুরা এলাহী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশান, আলহাজ্ব এলাহী বক্স স্মৃতি সংসদ, হযরত কালুশাহ (রা.) ও মঞ্জুরা এলাহী হেফজ ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন।

এছাড়া এলাহী বক্স  বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে এলাকায় যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা লাভের জন্যে বৃত্তিপ্রদান, অভাবী রোগীদের চিকিৎসা ও অনাথ মেয়েদের বিয়েশাদিতে সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তিনি গণমানুষের দরদী বন্ধু, নিষ্ঠাবান সমাজসেবী ও দানবীর ছিলেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এলাহী বক্স একাধারে একজন সমাজহিতৈষী, আদর্শসচেতন, সফল ব্যবসায়ী ও প্রাজ্ঞ সমাজপতি ছিলেন। তিনি কখনো ব্যক্তিপূজারী ছিলেন না ; সবসময় গেয়েছেন আদর্শের গান। আত্মস্বার্থকে পদদলিত করে একটি আদর্শ সমাজবিনির্মাণে তিনি সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। সততা ও সত্যনিষ্ঠা তাঁর জীবনকে দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র মহিমা। ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজগঠনের স্বপ্ন তিনি সর্বদা লালন-পালন করতেন। ইতিহাসের গোপন অন্ধকারে আলো ফেলে তিনি সমাজকে নিয়ে যান স্বপ্নের কাছাকাছি। তিনি একজন সৎ, ত্যাগী, কর্মঠ, পরিশ্রমী, পরোপকারী, নীতিবান ও খোদাভীরু ফরহেজগার মানুষ ছিলেন। সাদাসিধে চালচলনে অভ্যস্ত এ মানুষটির তুলনা তিনি নিজেই।

এলাহী বক্স সওদাগর ব্যক্তিগত জীবনে ছয় সন্তানের জনক। ছেলেরা সকলেই বাবার মতো ব্যবসায়ী, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক। সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। বড়ছেলে শিল্পোদ্যোক্তা আলহাজ্ব মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম ইসলামিয়া অটো ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের অন্যতম পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান। দ্বিতীয় ছেলে আলহাজ্ব মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ইসলামিয়া অটো সাপ্লাই ও তৃতীয় ছেলে আলহাজ্ব মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ইসলামিয়া অটো সার্ভিস এর স্বত্বাধিকারী। চতুর্থছেলে আলহাজ্ব মুহাম্মদ মফিজুল ইসলাম, পঞ্চম ছেলে আলহাজ্ব মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ইসলামিয়া অটো মোবাইল্স এর মালিক। ষষ্ঠ ছেলে মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তাঁরা সকলেই যুবাইদিয়া মহিলা আলিম মাদ্রাসার দাতা সদস্য।

আর পড়ুন:   সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ গঠনই হোক অঙ্গীকার

এলাহী বক্স ব্যবসায়িক কাজে ভারত, বার্মা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ১৯৯৬ সালের ১৭জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম