১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ || ১লা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

গেল বছর সার্বিকভাবে দেশের ৬৫.৫ শতাংশ খানা (পরিবার বা ছোট গোষ্ঠী বিশেষ) দুর্নীতির শিকার হয়েছে বলে দাবি করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের অভিযোগ, খানার শিকার হওয়ার বিবেচনায় দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত তিনটি খাত হচ্ছে- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা (৭২.৫ শতাংশ), পাসপোর্ট সেবা (৬৭.৩ শতাংশ) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ- বিআরটিএ (৬৫.৪ শতাংশ)।

একটি জরিপ শেষে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি, জাতীয় খানা রিপোর্ট-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে টিআইবি। বৃহস্পতিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিষদের উপদেষ্টা ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি’র পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। এছাড়া মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম, একই বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা রহমান ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরে আলম।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত বছর সার্বিকভাবে ঘুষের শিকার (ঘুষ দিতে বাধ্য) হওয়া খানার হার ৪৯.৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঘুষগ্রহণকারী তিনটি খাত হচ্ছে- বিআরটিএ (৬৩.১ শতাংশ), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা (৬০.৭ শতাংশ) ও পাসপোর্ট সেবা (৫৯.৩ শতাংশ)।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৭ সালে খানাপ্রতি গড়ে ৫ হাজার ৯৩০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে এবং সর্বোচ্চ ঘুষ আদায়কারী খাত হলো- গ্যাস (৩৩ হাজার ৮০৫ টাকা), বিচারিক সেবা (১৬ হাজার ৩১৪ টাকা) ও বিমা খাত (১৪ হাজার ৮৬৫ টাকা)। সেবার মোট ঘুষের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৮৮.৯ কোটি টাকা। যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ৩.৪ শতাংশ ও দেশের জিডিপি’র ০.৫ ভাগ। ২০১৫ সালের তুলনায় এই ঘুষের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে গ্যাস, কৃষি ও বিচারিক খাতে। আর কমেছে শিক্ষা, পাসপোর্ট ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান খাতে। এছাড়া ২০১৫ সালের তুলনায় সেবা খাতে ঘুষের শিকার খানার হার কমলেও ঘুষ আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে।

আর পড়ুন:   নর্থ সাউথের শিক্ষার্থী পায়েল হত্যা মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার খানার মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের সংখ্যা ও তুলনামূলক অর্থের সংখ্যা বেশি উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, আর্থ-সামাজিক অবস্থানভেদে ২০১৭ সালে খানার দুর্নীতির প্রকোপ শহরাঞ্চলের (৬৫ শতাংশ) চেয়ে গ্রামাঞ্চলে (৬৮.৪ শতাংশ) বেশি। আবার ঘুষের শিকার খানার হার শহরাঞ্চলের (৪৬.৬ শতাংশ) চেয়ে গ্রামাঞ্চলে (৫৪ শতাংশ) বেশি। গ্রামাঞ্চলে এ হার বেশি হওয়ার মূল কারণ নিরক্ষর বা স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন খানাপ্রধান থাকার কারণে। অর্থাৎ চাকরিজীবী বা শিক্ষিত ব্যবসায়ীদের চেয়ে কৃষক, শ্রমিক, জেলে, পরিবহন শ্রমিক বা সাধারণ পেশার মানুষরাই বেশি দুর্নীতির শিকার হয়।  এছাড়া যুবক বা ৩৬ ও তদূর্ধ্ব বয়সের সেবাগ্রহীতারা বেশি দুর্নীতির শিকার হয়। কেননা এর চেয়ে কম বয়স্ক মানুষরা প্রতিবাদী হয়। আবার উচ্চ আয়ের মানুষদের তুলনায় নিম্নআয়ের মানুষদের ঘুষ ও দুর্নীতির বোঝা বেশি বইতে হয়। সেবা নিতে গিয়ে উচ্চবিত্তরা তাদের বার্ষিক আয়ের ০.১২ শতাংশ এবং নিম্নবিত্তরা ২.৪১ শতাংশ ঘুষ দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দুর্নীতি বাড়ছে এমন কোনো তথ্য সঠিক নয়। তবে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা থাকলে দুর্নীতি কমানো এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর বর্তমানে ঘুষ বা দুর্নীতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। যেমন কেউ জামিন পেলে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেই আমরা। কিন্তু যদি বিচারিক কাজকে আমরা এই ধন্যবাদটা দিতাম তাহলে পরিস্থিতি সুন্দর হতো।

সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তরুণরা প্রতিবাদ করতে শিখছে বলে তাদের সঙ্গে দুর্নীতি কম হচ্ছে। সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও কিন্তু পেনশনসহ বিভিন্ন কাজে ঘুষ দিয়ে দুর্নীতির অংশীদার হচ্ছেন।

ফৌজদারি মামলায় কোনো সরকারি কর্মচারীকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গ্রেফতার করা যাবে না- মর্মে বিধান রেখে সম্প্রতি সরকারি চাকরি আইন, ২০০৮ এর খসড়া মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পাওয়ায় এর তীব্র প্রতিবাদ জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, আইনের চোখে সবার সমান হওয়া উচিত। আমাদের যা আইন আছে তা সময়োপযোগী এবং যথার্থ। তবে তার প্রয়োগের ক্ষেত্রেই আমাদের যত ঘাপলা।

আর পড়ুন:   বাংলাদেশ আজ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি সুপরিচিত নাম