বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আহসান উল্লাহ চৌধুরী স্মরণে

সাদিয়া তাজিন

হালকা কুয়াশায় মোড়া মাঘ মাসের বিকেল। চোখে হালকা কফি কালার ফ্রেমের চশমা, সাদা শার্ট – কালো প্যান্ট পরা সেই বিকেলের মতোই শান্ত চেহারার প্রবীণ ভদ্রলোক। তিনি এসে বসলেন ড্রয়িংরুমের সোফায়। সালাম দিলাম। সালামের উত্তর দিয়ে স্নিগ্ধ কন্ঠে জানতে চাইলেন,কেমন আছো?

- Advertisement -

বললাম, ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?

- Advertisement -shukee

তিনি মৃদু হেসে বললেন, আজ অনেকটা ভালো আছি। কতদিন পর দেখা! কথার প্রতিশব্দে ছড়িয়ে পড়ল উষ্ণতার স্পর্শ। বিকেলের রোদটা আরো মোলায়েম মনে হলো। আমাদের মাঝে জমে থাকা কথাগুলোর নিরবতার পর্দা ধীরে ধীরে সরতে লাগল। আমরা চাদগাঁও আবাসিক এ ব্লক উনার বাসায়। বহুদিন পর মুখোমুখি, অথচ যেন সময় থেমে আছে।

সেদিন আহসানউল্লাহ আংকেল দুপুরে লাঞ্চ টাইমের আগে ফোন দিয়ে আমাকে বলেন, আজ বিকেলে একটু এসো। গল্প করব। ফোন পাওয়ার  ঘণ্টা

দু’য়েকের মধ্যে হাজির হলাম। আমার সামনে একজন প্রিয়জন, একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ।

তিনি আমার সামনে একটি ডায়েরি দিলেন,নিজের হাতের লেখা, প্রিয় স্মৃতি, ভাবনা ও নোট দিয়ে ভর্তি।

সাথে দিলেন তাঁর প্রকাশিত দুটি বই

একটি ‘মুক্তিযুদ্ধ ও সহযোদ্ধার স্মৃতি’ সহযোদ্ধাদের সংগ্রামী জীবনের স্মৃতি সংরক্ষণ হিসেবে বিবেচিত।

অপরটি ‘চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলন: নানা রঙ ও পথ’ (১৯৫৭-১৯৬৬)। বইটি চট্টগ্রামে শ্রমিক আন্দোলনে ঘটে যাওয়া ঘটনার ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।

ড্রইং রুমের এক কোণে তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি,আলমারিতে সাজানো অসংখ্য বই, যেন এক জীবনের স্মৃতি ও সাধনার নিঃশব্দ দলিল। আলমারির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বললেন,এই বইগুলোই আমার সঙ্গী। জীবনে সুখে–দুঃখে, নিঃসঙ্গতায় ও ভাবনায় ওরাই আমার পাশে থেকেছে।

আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, গর্বাচেভের উত্থান পতন নিয়ে একটি বই লেখার কাজে হাত দিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ। সোভিয়েতে সমাজতন্ত্রের পতন হয়। গর্বাচেভেরও বিদায় হয়। ইয়েলেৎসিনের পুনরুত্থান, লাল পতাকা নামিয়ে ফেডারেল পতাকার বিজয় হয়। স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের শুরু। তাঁর মৃত্যু আসলে স্বাভাবিক ছিল না, ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে এক রাজনৈতিক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয়। সেখান থেকেই সোভিয়েত ব্যবস্থার ভিত নড়তে শুরু করে। পরে গর্বাচেভের উত্থান সেই দুর্বলতারই ধারাবাহিক ফল। গর্বাচেভ বা ইয়েলৎসিন কেউই মার্কসবাদের পুনর্জাগরণ ঘটাতে পারেননি। তবে সময় একদিন ঠিকই দেখাবে, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের চিন্তাধারার মূল্য ও সত্যতা।

ডায়েরি হাতে নাড়াচাড়া করি, পৃষ্ঠা উল্টাই, অনুভব করি, কতটা গভীরভাবে, কতটা নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে তিনি জীবনকে লিপিবদ্ধ করেছেন। বইগুলোও তাঁর সংগ্রামের ছবি, স্মৃতির দলিল।

তিনি বললেন, এগুলো তোমার জন্য। পড়ো, বুঝো, ভাবো। আমার জীবনের সব পাঠ এখানে লেখা আছে।

মুহুর্তগুলো ছিলো নীরব, অথচ হৃদয়ে যেন প্রবল আবেগের সুর বাজছে। অথচ কঠিন কথাগুলোও সহজসরলভাবে বলছেন। তিনি যেন ব্যস্ত হয়ে উঠছেন, আমাকে উনার জীবন, সংগ্রাম, স্মৃতি আদর্শ সবই যেন একসঙ্গে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

গল্পে গল্পে এগিয়ে যায় সময় আর প্রতিটি গল্পের ভেতর জেগে থাকেন তিনি ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রগতিশীল রাজনীতিক চিন্তক, প্রাবন্ধিক ও জনসেবক কমরেড আহসানউল্লাহ চৌধুরী। তাঁর জীবন যেন সময়ের ইতিহাসেরই এক চলমান অধ্যায়।

এক পর্যায়ে টেবিলে এলো গরম চা, ফ্রাইড রাইস, পুডিং ও নানা মুখরোচক নাস্তা। আন্টির শূন্যতা অনুভূত হলো,উনার ছায়া যেন মিশে আছে প্রতিটি পরিবেশনে। উপলদ্ধি করি, পরিবারের সদস্যরা আন্টির অবর্তমানে আংকেলকে কতটা ভালোবাসার আলিঙ্গনাবৃত্তে জড়িয়ে রেখেছেন।

মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অবদান

বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আহসানউল্লাহ চৌধুরী ও লেখক

 

কুশলাদির ফাঁকে পুরনো দিনের স্মৃতির দরজা খুলে  মহান মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরোধের দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিময় কথা শুরু করেন। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে পাকিস্তানি বাহিনী পিলখানা ও রাজারবাগে আক্রমণ চালায়। এর আগেই  পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রামে ‘সোয়াত’ নামের জাহাজে চালের নিচে লুকিয়ে আনা হয়েছিল অস্ত্র। বাঙালি নাবিকরা খবর দেয়, জনতা রাস্তায় নামে, ব্যারিকেড দেয়। জিয়াউর রহমান উপরিস্থ অফিসারের নির্দেশনায় অস্ত্র খালাস করতে ক্যান্টনমেন্ট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত গিয়ে জনতার প্রতিবন্ধকতায় আটকে যান। এই সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহসানউল্ল্যাহ্ চৌধুরীর অপরিসীম সাহসী ভূমিকা ছিলো। উনি তখন চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় তিন হাজার শ্রমিকদের সংঘটিত করেন এবং জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে বাঁধা দেয়ায় বিশেষভাবে ভূমিকা রাখেন।

সময়ের পলিজমা স্মৃতির মিছিল থেকে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়গুলোতে নিজ বাড়ি মিরসরাইয়ে আত্নগোপনে ছিলাম। হুলিয়া মাথায় নিয়েও মুক্তিকামী যুবকদের সংগঠিত করি। সে সময় স্বাধীনতার দাবীকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পার্টি থেকে আমি জনমত গঠন, প্রতিটি এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক ব্রিগেড গঠন , ছাত্র , যুব ও মহিলাদের সংগঠিত করে তাদের সামরিক ও গেরিলা ট্রেনিং এর আওতায় আনার জন্য কঠোর পরিশ্রম করি। এছাড়া যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা ও সামরিক প্রশিক্ষক খুঁজে বের করতাম। কমিউনিস্ট পার্টির যোদ্ধাদের সাথে গেরিলা ট্রেনিং এ অংশগ্রহণের জন্য ভারতে যাই ও ট্রেনিং শেষে ভারত থেকে ফিরে আসি। দেশে ফিরে ছাত্র যুবদের সংঘটিত করে ভারতের আগরতলায় নিয়ে যেতাম এবং প্রশিক্ষণ শেষে গেরিলা যোদ্ধাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ঝুঁকি নিয়ে নেতৃত্ব প্রদান করি।

পাকবাহিনী ও এ দেশীয় দোসররা আমাদের গবাদিপশুসহ সব গৃহস্থালী সামগ্রী লুঠ করে এবং এরপর ঘরবাড়ি সম্পূর্নরূপে জ্বালিয়ে দেয় ও আমার একমাত্র বড় ভাই আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে যা আজো আমাকে মর্মাহত করে।

দৃঢ় কণ্ঠে বলেন,যত বিপদ এসেছে, পিছু হটি নি। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনই ছিলো একমাত্র লক্ষ্য।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন দেয়। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধেও পুরো নেতৃত্ব প্রদান করে।

গেরিলা গ্রুপের নামের তালিকায়ও আমার নাম অন্তর্ভূক্ত আছে এবং সনদ প্রাপ্ত গেরিলা স্মৃতি কথাতে আমার কার্যক্রমের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। সম্প্রতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গেজেট এর মাধ্যমে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাকে স্বীকৃতি প্রদানসহ সনদপত্র প্রদান করেছে।

দুঃখ করে বলেন, এদেশ, এ জাতি এখনো সঠিকভাবে গণতন্ত্রের পথে এগুতে পারেনি। বলিষ্ট কোনো গণতান্ত্রিক দল আসেনি। যে দলই ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। অন্যদের জায়গা দেয় না, মতভেদ মেনে নিতে শেখেনি কেউ।

ভাষা সৈনিক হিসেবে অবদান

আ:চৌ: ২০১৫ সালে আমাকে জাতীয়ভাবে ভাষাসৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তিনি গর্বের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করেন, ১৯৫২ সালে আমি ফেনী কলেজের ছাত্র ছিলাম। সেখানে কলেজের ছাত্র সংসদে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক সবাই মিলে মিছিল করতাম। উক্ত মিছিলে দেওবন্দ থেকে পড়ালেখা করা আলেম ওলামাদের সংগঠন ওলামা হিন্দু এর কর্মীগণও যোগ দিতেন। কলেজে আমগাছতলায় সভা হতো ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে। ফেনীতে ভাষা আন্দোলনের সময় গণতান্ত্রিক যুবলীগের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী ইমাদউল্লাহ্ ফেনীর আমতলায় সভা করে গেছেন। পরবর্তীতে একই স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানও সভা করেছিলেন। ভাষার জন্য লড়াই করা মানে ছিল আমাদের আত্মমর্যাদার লড়াই।

আজ দেশ স্বাধীন। পরিস্থিতিও পরিবর্তন হয়েছে। আজও বাংলাভাষা জীবনের সকল স্তরে চালু হয়নি। অফিস, আদালত, সাইন বোর্ডগুলো এখনো বাংলায় চালু হয়নি। শিক্ষার পরিপূর্ণ মাধ্যম হয়নি বাংলা ভাষা। নিজের বিবেকের মুখোমুখি তাই দাঁড় করিয়ে দেয় একুশে ফেব্রুয়ারি। শহীদদের আত্নত্যাগ ও আমাদের সংগ্রাম তখনি সার্থক হবে, একুশ লাভ করবে তার যথার্থ মর্যাদা যদি বাংলা সাহিত্যসহ বাংলাভাষা সর্বত্র চালু করা হয়।

রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ

তিনি ছোট বেলায় তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তী নেত্রী ইলামিত্র ও ফরাসি উপনিবেশবাদ বিরোধী নেত্রী আলজেরিয়ার জামিলা বুপাশা সংগ্রামী ব্যক্তিত্বদের জীবনী পাঠ করেন আরো পরবর্তীতে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, ভিয়েতনামের হো চি মিন এইসব বিপ্লবী নেতাদের জীবনী পাঠ করে তাদের চিন্তা ও আদর্শের স্রোতধারায় নিজেকে গড়ে তুলতে উৎসাহী হন।

তাঁদের মতোই তিনি বিশ্বাস করতেন, অবহেলিত, উপেক্ষিত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তিই রাজনীতির মূল লক্ষ্য আর শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই একজন বিপ্লবীর চূড়ান্ত দায়িত্ব। এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত হন এবং জীবনের বড় অংশটি ব্যয় করেন এই সক্রিয় রাজনীতির ভেতর দিয়ে।

আ:চৌ:  আমি ফেনী কলেজে অধ্যয়নকালীন ইউপিপি (ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ পার্টি)’র সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হই ,পরে আমি কলেজ ছাত্র সংসদের সহকারী সম্পাদক (সাহিত্য – সংস্কৃতি) পদে নির্বাচিত হই। কাজী এবাদুল হক (পরবর্তীতে বিচারপতি ও প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান) আমার এক বছরের সিনিয়র ছাত্র ছিলেন, উনার অনুপ্রেরণায় আমি ছাত্র রাজনীতিতে আরো বেশি করে জড়িয়ে পড়ি। এই ছাত্র রাজনীতির কারণেই পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলনে যোগদান করার সুযোগ পাই। ১৯৫৯ সালে আমার বন্ধু নুরুল আবছার ও কমিউনিস্ট নেতা দেবেন শিকদারের অনুপ্রেরণায় কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হই। তখন পার্টির পক্ষে শ্রমিক ফন্টে কাজ করতেন দেবেন শিকদার ও  চৌধুরী হারুন অর রশিদ। ১৯৫৭ সালে চাকরিতে যোগদান করেই পার্টি থেকে আমাকে চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রেড ইউনিয়নের নেতা হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। একই বছরে আমি অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে ভয়হীনভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গঠন করি ‘চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক ইউনিয়ন’। ১৯৬৫ সালে বাম প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাম শ্রমিক নেতাদের নিয়ে গঠন করি ‘চট্টগ্রাম সংযুক্ত শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ’। সংগঠনটি শ্রমিক আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।

পরিষদের কার্যকরী কমিটি গঠিত হয় নিম্নরূপ

৫ জনের প্রেসিডিয়াম, ৫ জনের সেক্রেটারিয়েট, ১ জন কোষাধ্যক্ষ এবং ১২ জন সদস্য। পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ছিলো ২৩ জন। এছাড়া পরিষদের আওতায় একটি সম্পাদকমন্ডলীও গঠিত হয়, যার সদস্য ছিলাম আমি। উক্ত পরিষদে শ্রমিক নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, আবুল বাসার, এস.এম. হক, জামশেদ ও রেল শ্রমিক নেতা মাহবুবুল হক ছিলেন সক্রিয় সদস্য। আমরা একত্রে চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগঠিত সংগ্রামের পথে পরিচালিত করি।

১৯৬০ সালের প্রথম দিকে ট্রেড ইউনিয়ন সাব কমিটির  (জেলা) সদস্য এবং ১৯৬১ সালের মাঝামাঝি টিইউসি ‘র সাব কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ১৯৬৬ সালে চীন, সোভিয়েত আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে)র কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, একদল সোভিয়েত পন্থী (সোভিয়েত ঘরানা) অপর দল চীনপন্থী (মাওবাদী ঘরানা)। আমরা ছিলাম সোভিয়েতপন্থী। ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝিতে আমি প্রথমে পার্টির জেলা কমিটির সাংগঠনিক সদস্য, দু’মাস পর পূর্ণ সদস্য এবং ১৯৬৯ সালে কমরেড অমর সেনের মৃত্যুর পর সিপিবি’র চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য হই। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে সহ সম্পাদক, ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম নগর কমিটির সম্পাদক এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম নগর ও উত্তর জেলা নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা কমিটি হলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ১৯৮৬ সালে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হই। ১৯৭২ সালে আমাকে টিইউসি’র কেন্দ্রিয় পূর্নাঙ্গ কমিটির সহ সভাপতি করা হয়। একই বছরে আমি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ১৯৮৯ সালে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জাতীয় সম্মেলনের প্রস্ত্ততি পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম। তিনদিন ব্যাপি এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউট হল’ এ। সম্মেলনে দেশ-বিদেশের অনেক রাজনৈতিক প্রতিনিধি যোগদান করেছেন। আমি সাইফুদ্দিন মানিক এর সাথে ঘনিষ্টভাবে কাজ করি ও উনার সফর সঙ্গী ছিলাম।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করেন, বিশেষ করে সোভিয়েত ঘরানার দল। তিনি   গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে আমি ফিরিয়ে দিই। কেননা আমি ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নৈতিকতাকে সম্মান করি।

কমিউনিস্ট পার্টি ও আমার চাকরি জীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনকে জাতীয় স্বাধীকার আন্দোলনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করায় সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদান করি। আন্দোলনের ফলে ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতাল ও স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রমিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে আমাকে জেল, হুলিয়া, জুলুম, নির্যাতনসহ নানাভাবে দুর্ভোগ সইতে হয়েছে। এমনকি ১৯৬৫ সনে প্রথম কারাবরণ করি। ১৯৬৬ সালে কারামুক্ত হলেও ১৯৬৭ – ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত আবারও আমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ফলে পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়। দীর্ঘদিন গোপন জীবন শেষে আমি পুনরায় প্রকাশ্যে আসি।

১৯৮২ সালে রেল শ্রমিক কুনু মিয়ার নির্মম হত্যাকাণ্ড শ্রমিক সমাজে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এই হত্যার প্রতিবাদে এবং দায়ীদের বিচারের দাবিতে আমরা ‘কুনু মিয়া হত্যা প্রতিবাদ কমিটি’ গঠন করি। এই কমিটির উদ্যোগে সারা চট্টগ্রামজুড়ে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সমাবেশ ও ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। এর ফলে শ্রমিক আন্দোলন আরও তীব্র ও সংগঠিত রূপ নেয়, যা পরবর্তীকালে জাতীয় শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

কথার পিঠে বলেন, শ্রমিকের অধিকার মানে মানুষের অধিকার। আন্দোলন শুধুমাত্র মজুরির নয়, মর্যাদারও।

স্বাধীনতার পর জাতীয় শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রিয় সহ সভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করি।

স্থানীয় মানুষের প্রতি চেতনা ও স্নেহ

আলাপের মাঝেই তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,তোমার পরিবারের সকলে কেমন আছে?

বললাম, সবাই ভালো।

হেসে বললেন, তোমার বাড়ি ২ নম্বর গেট, তাই না! তোমার এলাকার লোকজন কেমন আছেন?

এই সাধারণ প্রশ্নের ভেতর ছিল গভীর স্নেহ ও দায়িত্ববোধ মিশ্র। কেবল আমাকে নয়, আমার পরিবার ও এলাকার মানুষদের প্রতি উনার আন্তরিকতা আগ্রহও ফুটে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, ব্যক্তিগত কথোপকথনও তাঁর কাছে এক ধরনের দায়িত্ব যেখানে মানুষ, জীবন ও সমাজের কুশলাদি জেনে রাখাও জরুরি।

আমার প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা ছিল অসীম। হেসে বললেন, ওই জায়গাটা আমার সংগ্রামের জায়গা। সেখানে অনেক স্মৃতি, আমার অনেক সহযোদ্ধা ছিল ওখানে। তাদের সাথে অনেক বৈঠক করেছি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন আংকেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্মরণ করলেন, মহিউদ্দিন ভাই’র বাড়িতে কত বৈঠক করেছি, কত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে শ্রমিক, সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য! তাঁর চোখের সেই আলোকচ্ছটা, কণ্ঠের উষ্ণতায় অসাধারণ মায়া ফুটে উঠে।

বইয়ের ভেতর দেখা মানুষটি

বইয়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো জীবনের মতোই গভীর। আর আমার সঙ্গে উনার সম্পর্কের সেতুবন্ধনও হয়েছিলো বইকে ঘিরে। ইপসা ডেভেলপমেন্ট রিসোর্স সেন্টার-ডিআরসি’তে তিনি নিয়মিত বই পাঠাতেন। কখনো ফোনে বলতেন, বইগুলো পৌঁছেছে তো? এখানে বই তাঁর কাছে কেবলি পাঠ্য নয়, একটি আলাপের সূচনা, একটি ভাবনার যাত্রা, একটি মানুষকে জানার জানালা। তিনিই ডিআরসি’র উদ্বোধন করেন, সাথে ছিলেন কমরেড তপন দত্ত। বলেন, এই জায়গা থেকে নতুন চিন্তার জন্ম হয়। আমার প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অপরিসীম। ফোনে বলতেন, সাদিয়া কাউকে পাঠিও। তোমার জন্য কিছু বই রেখেছি। এই আদান প্রদান শুধুমাত্র বইয়ের নয়, ছিলো ভালোবাসা, জ্ঞান ও প্রজন্মান্তরের সংলাপের। এই কেন্দ্রে আংকেলের উপস্থিতি ছিলো নীরব অথচ অমলিন আলোর মতো।

 জীবন দর্শন ও আদর্শ

১৯৯৭ সালে তিনি ও তপন দত্ত বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মকাণ্ড থেকে পদত্যাগ করেন। তবে উভয়ই ছিলেন ভাবনা, ধ্যান ধারনায় মুক্তচিন্তার এক অবিচল ধারক। যদিও আরো পরে আহসানউল্লাহ্ চৌধুরী পার্টির সদস্যপদ পুনরায় গ্রহণ করেন।

তিনি বলেন, কমিউনিষ্ট পার্টি যেন আমার জীবনের প্রগাঢ়তম প্রাপ্তির কাছে এক আলো ফেলা সুহৃদয় বন্ধুর মত। প্রতিটি সদস্য সম্পর্কের এতো গুরুত্ব দিয়ে ধরে রেখেছেন যে, তাইতো জীবনের উৎসবে তাদের ভালোবাসার কলরবে বার বার হারিয়ে যেতে ভালো লাগে। আমাকে ও আমার কার্যক্রমকে তারা সবসময় মনে রেখেছে। এজন্য তাদের কাছে আমি আজীবন  ঋণী।

সে সময় পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমে প্রচুর শ্রম ও শক্তি ব্যয় করেছি। দুঃখের বিষয়, পার্টির আদর্শচ্যুতির ফলে আন্ত:কলহ মেটাতে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে।

আমার সহযোদ্ধা, অনুসারীরা অনেকে বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কেউ কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। আমি তাদের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে কেউ কেউ দালালীও করছেন।

  সময়ের গায়ে লেখা সহযোদ্ধারা

তপন দত্ত, আবু তাহের মাসুদ ও খোরশেদুল ইসলাম ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী বা শিষ্য । ১৯৬৯ সালে তপন দত্ত তাঁর ছাত্র জীবন শেষ করে আহসানউল্ল্যাহ্ চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় ট্রেড ইউনিয়নে যোগ দেন। তপন দত্ত কর্মজীবনের শুরুতেই উজ্জীবিত ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার তাগিদে। ১৯৭২ সালে তপন দত্ত চট্টগ্রাম টিইউসি থেকে এক মাসের ট্রেড ইউনিয়ন প্রশিক্ষণে হাঙ্গেরিতে যান, তখন তিনি মূলত টিইউসির দায়িত্বে ছিলেন। পরে জয়েন্ট সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, সেক্রেটারীর দায়িত্ব প্রদান করা হয় আবু তাহের মাসুদকে।

১৯৬৯ সালের পূর্বে চট্টগ্রামে ‘শ্রমিক ইউনিয়ন যোগাযোগ কেন্দ্র’আত্মপ্রকাশ করে। এই সংগঠনের ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফলেই পরে টিইউসি’র জন্ম হয়।

১৯৭৬ সালে আবু তাহের মাসুদ গ্রেফতার হন। ৬ মাস পর জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পার্টি বা টিইউসির কার্যক্রমে কোনোদিন আর ফিরে এলেন না।

১৯৭৬ সালে আবু তাহের মাসুদ গ্রেফতার হলে তপন দত্ত তখন আত্মগোপনে চলে যান।

১৯৭২ সালে তপন দত্ত ‘চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়ন ‘গঠন করেন। ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তপন দত্ত, বাবুল বিশ্বাস ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। বাবুল বিশ্বাস ২৩টি চা বাগানের শ্রমিকদের সংগঠিত করতেন। তাই তাঁর কার্যক্রম চা বাগানেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তপন দত্ত মাঝে মাঝে সেখানে যেতেন।

এদিকে ১৯৭৬ সালে আত্নগোপন থেকে বের হয়ে টিইউসি সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তপন দত্ত।

বর্তমানে তপন দত্ত টিইউসি’র সভাপতি এবং অশোক দাশ চট্টগ্রাম জেলা সিপিবি’র সভাপতি ।

 শৈশবের স্মৃতির ভাঁজে

হঠাৎ শিশুকালের কিছু মন খারাপ করা ঘটনার কথা মনে পড়তেই তিনি বললেন,১৯৪৬ সালের কথা। মৌলভী গোলাম সরওয়ার নামে চাটখিলের এক ব্যক্তি এলাকায় দাঙ্গা লাগিয়ে হিন্দুদের বাড়িঘর দখল করে নেয়। এমনকি কোনো কোনো হিন্দু মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে, কারও কারও ওপর ধর্ষণেরও অভিযোগ ওঠে। সে সময় সেখানে মহাত্মা গান্ধী এসেছিলেন দাঙ্গা থামাতে ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তিনি একটি আশ্রম স্থাপন করেন আশ্রিতদের জন্য। দুঃখের বিষয়,মৌলভী গোলাম সরওয়ার আশ্রমে থাকা গান্ধীর আনা ছাগল চুরি করে নিয়ে খেয়ে ফেলেন। এই ঘটনার পর থেকেই আমার মনে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। তখন থেকেই আমি এ ধরনের অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজকে ঘৃণা করতে শুরু করি।

 নূর হোসেন থেকে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতির এক সাক্ষী

১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সাল। ঢাকার জিরো পয়েন্টে কিশোর নূর হোসেন ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক; শ্লোগান  গায়ে সেটিয়ে অবস্থান করছিল। স্বৈরাচারী পুলিশ তার উপর গুলি চালিয়ে হত্যা করে। তার দেহ ফেরত দেয়া হয়নি। এরই প্রেক্ষিতে  ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ১৫-দলীয় জনসভা ডাকে। এই জনসভার একজন অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলাম আমি। যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী খোলা ট্রাকে পুলিশ বাহিনী উপর্যুপরি গুলি বর্ষণ করছিল, তখনও আমিসহ কমরেড সাইফুদ্দিন মানিক, পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, দিলীপ বড়ুয়া, সাজেদা চৌধুরী, তোফায়েল আহম্মদ, এম.এ. মান্নান,তপন দত্ত, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, কামাল আজিজ, ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনসহ নেতারা খোলা ট্রাকে আরোহন করি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিনেমা প্যালেসের সামনে পুলিশের সাথে তর্কাতর্কি অবস্থার এক পর্যায়ে ন্যাপ নেতা কামাল আজিজ,ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন ও তপন দত্ত ট্রাক থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে পড়লেন এবং নালায় পড়ে গিয়ে প্রচন্ড আঘাত পেলেন। এই দিকে মিছিলকারীরাও পুলিশ বেষ্টনির মুখোমুখি দাঁড়াল। পুলিশের বাধা ও নির্বিচার গুলিতে বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়। গণবিপ্লবের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০-৯১ সালে প্রবল আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন হলে গণতান্ত্রিক পথে অভিযাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের।

রাজনৈতিক জীবনের স্বীকৃতি ও সম্মাননা

কথার স্রোতে তিনি আমাকে টেনে নিলেন আরেকটি ঘরে, যেখানে কাচের আলমারিতে সাজানো উনার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেতিহাসের পরিশ্রম, স্বীকৃতি ও প্রাপ্তির চিহ্ন সম্মাননা স্মারক, মেডেল, ক্রেস্ট, ট্রফি, উত্তোরীয়, স্মারক ব্যাগ, কলম, মগ সনদ  ও অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন।

কয়েকটি ক্রেস্ট টেবিলে রেখে তিনি দেখালেন। চোখে পড়ল বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা মহান বিজয় দিবস, অমর একুশে বইমেলা সম্মাননা পদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা, মহান মে দিবস শ্রদ্ধা ও সম্মাননা, রাজনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা, চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক আন্দোলনের পুরোধা শ্রদ্ধা সম্মাননা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে গৌরবময় অবদানের জন্য সম্মাননা, মহান মে দিবস শ্রদ্ধা ও সম্মাননা এমন বহু সম্মাননা।

এই সম্মাননাগুলো প্রদান করেছে জেলা পরিষদ, চট্টগ্রাম; ভাষাসৈনিক উদযাপন কমিটি, ঢাকা একুশ উদযাপন পরিষদ, মীরসরাই সম্মিলিত মে দিবস উদযাপন পরিষদ; মনি সিংহ–ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম ন্যাপ–কমিউনিস্ট পার্টি–ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ, চট্টগ্রাম খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরী কমিটি; বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী; চাঁটগার বাণী- চট্টগ্রাম,বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান।

অবসরের দিনগুলোতে সমাজচিন্তা

অবসরের শান্ত মুহূর্তগুলোতে আহসানউল্লাহ চৌধুরীর চিন্তা সর্বদা ছিল সমাজের অবহেলিত মানুষের পানে। শ্রমজীবী মানুষদের কষ্ট, প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা, অসহায় ও উপেক্ষিত মুখগুলো যেন তার হৃদয় ছুঁয়ে যেত। নিজের সাধ্য অনুযায়ী তিনি সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবিরাম কাজ করে গেছেন।

ব্যক্তি ও সংসারজীবনে তিনি ছিলেন সাদামাটা, সরল। তার মন সবসময় জাগ্রত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবর রাখা, পার্টি সংক্রান্ত বা স্থানীয় সমস্যা খুঁটিয়ে দেখা, পরিবারের সদস্য ও নাতি-নাতনীদের সঙ্গে গল্পগুজব করা এসবই ছিল তার দৈনন্দিন অবসরের অংশ। টেলিভিশনে সংবাদ দেখতেন, খবরের প্রতি মনোযোগী থাকতেন আর বই, পত্রিকা ও সাময়িকী পড়ে সময় কাটাতেন। এইসব মুহূর্তে তিনি শুধু নিজেকে নয়, অন্যদেরও সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুভব করতেন।

দৃঢ়তায় এক জীবন

এই অকুতোভয় মানুষটি ছিলেন এক বিশাল মহীরুহ প্রচণ্ড ঝড়ঝাপটার মাঝেও অবিচল, দৃঢ়। পার্টির প্রতি উনার আনুগত্য ছিল শিকড়ের মতো গভীর; কখনোই তিনি দল থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর অনেক রাজনৈতিক সতীর্থ কেউ না-ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন, কেউ পথ পরিবর্তন করে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন, কেউবা অভিমানবশত দূরে সরে গেছেন। যে কোনো প্রলোভন বা ভয় উনাকে টলাতে পারেনি। তিনি সেসব বিচ্যুতির ভিড়ে স্থির থেকেছেন নিজের আদর্শে, নিজের বিশ্বাসে।

নব্বই ছুঁইছুঁই বয়সেও তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের কমিউনিস্ট রাজনীতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি ,একজন হার্টথ্রব ফ্যাক্টর।

শেষ বিকেলের মানুষ

শেষ বয়সে অসুস্থ ছিলেন, তবু আচরণে বিনয়ী, শান্তভাব ও ঠোঁটে প্রাণবন্ত চমৎকার স্মিত হাসি লেগে থাকে। যে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ভালো আছি। তুমি/তোমরা ভালো থেকো। অভিযোগহীন, তৃপ্ত হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তিনি।

জীবনের কোন অপূর্ণতা আছে কিনা জানতে চাইলে কমরেড বলেন, মানুষের জীবন কখনোই পরিপূর্ন হয় না। আমার জীবনেও অনেক অপূর্ণতা আছে। তার জন্য দুঃখ করি না। কবির ভাষায় বলেন ‘কি পাইনি তার হিসাব মেলাতে /মন মোর নহে রাজি/আজ হৃদয়ের ছায়াতে আলোতে/ বাঁশরি উঠিছে বাজি।’

আসবার সময় বেলা শেষের পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়েছিল। সোনালি আলোয় ডুবে যাচ্ছিল চারপাশ। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা সত্ত্বেও আংকেল মুখে অমায়িক প্রশান্তি নিয়ে বাসার সিঁড়ি ধারে এগিয়ে দিলেন। বার বার হাত নেড়ে বিদায় জানান। যেন বিদায়ের সীমারেখায় থেমে থাকা এক নিরব স্নেহ। উনার সেই সদাহাস্যজ্জ্বল মুখ, শুভ কামনার ভঙ্গি যেন এক নিরব আলো হয়ে মনের ভেতর গেঁথে রইলো।

আমি আর আমার সহকর্মী, ফটোসাংবাদিক (ল্যান্স) মুরাদ, ধীরে ধীরে বাইরে হাঁটতে থাকি। সেই গোধূলীলগ্নে মনে হচ্ছিল, এই দেখা, এই কথাগুলো, এই বিকেল শেষ নয়, বরং এক দীর্ঘ স্মৃতির শুরু। মনে মনে বলছিলাম, একটি সন্ধ্যা আর একটি লেখায় তাঁকে নিয়ে আমার জানার শেষ হবে না… তিনি রয়ে যাবেন আমার প্রতিটি ভাবনায়, প্রতিটি লেখায়, অনুপ্রেরণার এক নীরব শিখার মতো।

জন্ম ও মৃত্যুঃ

কিংবদন্তি কর্মবীর আহসানউল্লাহ্ চৌধুরীর জীবনসূর্য উদিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, ফেনী থানার অন্তর্গত মনোরম বালিগাঁও গ্রামে। পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নে,যেখানে তাঁর জীবন ও কর্ম ছড়িয়ে পড়ে মাটি, মানুষ ও আন্দোলনের পরতে পরতে।

দীর্ঘ এক কর্মমুখর, সংগ্রামী ও প্রেরণায় ভরপুর জীবনের পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর, রাত ৯টা ১৩ মিনিটে, চট্টগ্রামে ছোট মেয়ের বাসায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শান্ত, গম্ভীর যেন এক মহীরূহ ধীরে ধীরে প্রকৃতির কোলে ফিরে গেলেন।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

আহসানউল্লাহ চৌধুরীর প্রথম জানাজা ১৮ অক্টোবর ২০২৫ সকাল দশটায় মিমি সুপার মার্কেটের পাশে আফমি প্লাজার পেছনে আবাসিক এলাকায় সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে সেখানে টিইউসি‘র নেতা-কর্মীরা গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। জানাজায় টিইউসি’র আবু তাহের মাসুদ, ইফতেখার কামাল খান অংশগ্রহণ করেন। তপন দত্তও উপস্থিত ছিলেন।

পরে মরহুমকে নগরীর হাজারী গলিতে সিপিবি কার্যালয়ে অনন্ত শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন সংগঠন ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। জয়তু কমরেড আহসানউল্লাহ চৌধুরী।

১৮ অক্টোবর ২০২৫ আহসানউল্লাহ চৌধুরীর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় দুপুর ২: ৩০ মিনিটে প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে জনার্দনপুর, চৈতণ্যেরহাট, মিরসরাই, চট্টগ্রাম। তিনি সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জানাজায় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

দাফনের দিন জাতীয় পতাকায় মোড়ানো তাঁর নিথর দেহের সামনে দাঁড়ায় জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ বাহিনীর চৌকষ দল। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে দেয়া হয় গার্ড অব অনার। গার্ড অব অনার প্রদান করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল উদ্দিন কাদের। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সশস্ত্র সালাম ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।

আহসানউল্লাহ্ চৌধুরীর প্রতি রাষ্ট্রের ও মানুষের এই শ্রদ্ধা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অবদানের স্বীকৃতি নয়। এটি এক যুগের ইতিহাস, এক আদর্শিক চেতনার প্রতি জাতির শ্রদ্ধা নিবেদন।

তিনি ছিলেন এক নীরব আলোর মানুষ, যিনি শব্দের চেয়ে কর্মে, কথার চেয়ে জীবনের উদাহরণে মানুষকে প্রেরণা দিতেন।

যাঁর জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেম মানে দায়িত্ব, সংগ্রাম মানে সেবা আর আদর্শ মানে মানুষের পাশে থাকা।

তাঁর বিদায়ের পরও তিনি রয়ে গেছেন আমাদের চিন্তায়, স্মৃতিতে আর প্রত্যয়ের ভেতর।

আল্লাহ আহসানউল্লাহ্ চৌধুরীকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। শোকাহত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।

সাক্ষাৎকারটি সংগ্রহ করা হয়েছিল: ১৭  জানুয়ারী ২০১৯

লেখিকা: ইপসা ডেভেলপমেন্ট রিসোর্স সেন্টার-ডিআরসি’র সিনিয়র কর্মকর্তা ও সাহিত্যিক

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও