[bangla_date] || [english_date]

মোহাম্মদ ইউসুফ/ মোহাম্মদ সেলিম *

জমির মালিকদের নিয়ে জাইকা প্রতিনিধি দল সীতাকুণ্ড পৌরসভাধীন মৌলভীপাড়ার ইসলাম সর্দারের বাড়িতে পরামর্শ সভা করছেন জাইকা প্রতিনিধি দল ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সঞ্জয় কুমার ঘোষ

অব্যাহত পাহাড়কাটা,সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন,অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও কলকারখানার নিঃসরিত কালো ধোঁয়া ও ময়লা-আবর্জনায় সীতাকুণ্ডের সার্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ যখন হুমকির মুখে , ঠিক সেই সময়ে পরিবেশ বিপর্যয়কারী একটি বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পের নীলনক্সার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সীতাকুণ্ড পৌরসভায়।এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। ইকোপার্ক কর্তৃপক্ষ ও সীতাকুণ্ড পৌরসভা মেয়রের আপত্তির পরও সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের গা ঘেঁষে পাহাড়ের পাদদেশে সংরক্ষিত বন ও  তিন ফসলী জমিতে বিশাল এলাকা জুড়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের তৎপরতা শুরু হয়েছে। কয়েকমাস ধরে চলছে সাদা-কালো মানুষের আনাগোনা। চলছে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ।এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রতিদিন ঢাকা,নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিল্পকারখানা ও জাহাজভাঙ্গাশিল্পের ৭০/৮০টি ৩২চাকার বর্জ্যলরী ঢুকবে সীতাকুণ্ড পৌরসভায়। বিষাক্ত ও দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠবে পৌরএলাকার আলো-বাতাস। মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে পৌরবাসী; মহাবিপর্যয়ের মহাসাগরে হাবুডুবু খাবে ইকোপার্ক ও এর পরিবেশ–প্রতিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য।

সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক পরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বিষয়টি জেলাপ্রশাসক,প্রধান বনসংরক্ষক, পরিবেশ অধিদপ্তর,সীতাকুণ্ডের ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও জাতীয় ভূমি ব্যবহারনীতি লঙ্ঘন করে বসতবাড়ি সরিয়ে কৃষি জমিতে এ ধরনের পরিবেশ বিধ্বংসী স্থাপনা প্রতিষ্ঠার অপতৎপরতায় সীতাকুণ্ডের পরিবেশ-সচেতন মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।এ নিয়ে সহসাই সামাজিক আন্দোলন শুরু হবে-এমন আভাষ পাওয়া গেছে।

শিল্পমন্ত্রণালয়ের অধীন The Establishment of Treatment Storage and Disposal Facility (TSDF) for Ship Recycling Industry and others in Chattogram প্রকল্পের আওতায় জাহাজভাঙ্গা শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের বর্জ্য ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ ও ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার দূরত্ব সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের প্রবেশগেট ও অফিস এলাকা থেকে ৭৫৯ মিটার ও ইকোপার্কের সীমানা থেকে ৯৬ মিটার। ২০২৩ সালের ২৭ডিসেম্বর জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও নিউভিশন সলিউশনস লিমিটেডের কর্মকর্তারা ইকোপার্কে এসে এখানকার কর্মকর্তাদের ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ ও ডিসপোজাল প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়টি মৌখিকভাবে অবহিত করেন। এ সময় ইকোপার্কের বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ইসমত আরা নূর প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বলেন, “ইকোপার্কসংলগ্ন এ জায়গাটিতে এ ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্যে কোনোভাবেই উপযোগী নয়। এখানে বর্জ্য-শোধানাগারের মতো প্ল্যান্ট স্থাপিত হলে ইকোপার্কের দর্শনার্থী শিশু, শিক্ষার্থী, গবেষক, নারী-পুরুষ, বন,বন্যপ্রাণি,পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিরাট ক্ষতি সাধিত হবে।” তাই, তিনি ইকোপার্কের সীমানা ঘেঁষে বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিল্প স্থাপন না করার অনুরোধ করেন এবং এ ব্যাপারে ইকোপার্কের পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু জাইকা প্রতিনিধিদল ইকোপার্ক কর্তৃপক্ষের সাথে কোনো যোগাযোগ না করে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন অব্যাহত রেখেছে। তবে সর্বশেষ ২১ এপ্রিল ২০২৪ জাইকা প্রতিনিধিদল ইকোপার্ক কর্মকর্তাদের সাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং ইকোপার্কের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়,সেভাবেই বর্জ্য শোধানাগার কারখানা স্থাপনের আশ্বাস দেন ইকোপার্ক কর্মকর্তাদের।

এদিকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা (পর্যটন রেঞ্জ) মো.আলাউদ্দিন ও রেঞ্জ কর্মকর্তা (পুনর্বাসন রেঞ্জ) মো.মাসুম কবীর সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার,সহকারি কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী ও কৃষি কর্মকর্তার সাথে দেখা করেন। তাঁরা প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে ইকোপার্কের উদ্ভিদ ও প্রাণিকূলের জীবনরক্ষা ও সীতাকুণ্ডের পর্যটন নগর ও ইকোপার্কের ইকো-সিস্টেম রক্ষার্থে রি-সাইক্লিন ইন্ডাস্ট্রিজ এর ডিসপোজাল স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন না দেয়ার জন্যে সীতাকুণ্ড সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন। রেঞ্জ কর্মকর্তা মো.আলাউদ্দিন চাটগাঁর বাণীকে বলেন,“ইকোপার্কের প্রবেশপথ দিয়ে প্রতিদিন যদি ৩২ চাকার ৭০/৮০টি লরী আসা-যাওয়া করে তাহলে দর্শনার্থীদের গাড়িচলাচলে যানজট ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে; কমে যাবে দর্শনার্থীর আগমন ও রাজস্ব আদায়। এ ধরনের ডিসপোজাল স্টেশন স্থাপন করা হলে পার্কের পরিবেশগত সমস্যার পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তন ও ইকো-সিস্টেম নষ্ট হয়ে যাবে,বিলুপ্ত হবে ইকোপার্কের ৪১২ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ১৬১ প্রজাতির বন্যপ্রাণি ও আবাসস্থল।”

সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের গা ঘেঁষে পাহাড়ের পাদদেশে জাইকা প্রতিনিধি দলের চলছে ভূমি জরিপের কার্যক্রম

বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প স্থাপনের বিষয়ে শিল্পমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানার সাথে মুঠোফোনে কথা হয়। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের পাশে সংরক্ষিত বন,কৃষিজমি ও লোকালয়ের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্প করা যায় কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি চাটগাঁর বাণীকে তিনি বলেন,“পরিবেশের ক্ষতি নয় বরং পরিবেশ উন্নয়ন ও রক্ষার জন্যে জাইকা বিশাল আকারের এ বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি করেই জাপানিরা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।”

ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ ও ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি (টিএসডিএফ) প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত শিল্পমন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাসের সাথে মুঠোফোনে কথা বলতে চাইলে তিনি ফোনে কথা না বলে অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন।

সীতাকুণ্ড পৌরসভায় পাহাড়ের পাদদেশে সংরক্ষিত বনের কাছে তিনফসলী জমিতে বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প স্থাপনের ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলাপ্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“ এ নিয়ে ইকোপার্ক পরিচালকের সাথে আমার কথা হয়েছে। সীতাকুণ্ড ইউএনও কে বিষয়টি দেখতে বলেছি,এখনো এটি পরিকল্পনার পর্যায়ে আছে।”

সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকায় বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প স্থাপন প্রক্রিয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে এম রফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে চাটগাঁর বাণীকে বলেন,এ ব্যাপারে আমরা অংশীজনদের নিয়ে সভা করে সিদ্ধান্ত নেবো।

সীতাকুণ্ড পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম ইকোপার্ক এলাকায় জাইকা ও নিউভিশন সলিউশনস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প স্থাপন প্রসঙ্গে চাটগাঁর বাণীকে মুঠোফোনে বলেন, “এ ধরনের পরিবেশ বিষাক্তকারী বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা প্রকল্প সীতাকুণ্ড পৌরসভায় হওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট লোকজন আমার কাছে এসেছিলেন ‘অনাপত্তিপত্র’ নিতে, আমি তাতে আপত্তি দিয়েছি। পৌরএলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস ও মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়- এ ধরনের জনবিরোধী প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি আমি দিতে পারি না। আমাদের এমপি মহোদয়কেও বিষয়টি জানিয়েছি। সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না,তাদেরও এ ব্যাপারে সচেতন ও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।”

প্রধান বনসংরক্ষক মো.আমীর হোসাইন চৌধুরীর সাথে প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প নিয়ে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি চাটগাঁর বাণীকে বলেন,“সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক পরিচালক লিখিতভাবে আমাকে এ ব্যাপারে অবহিত করেছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমি ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ বরাবরে বিষয়টি প্রেরণ করবো।”

প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার নিয়ে বোটানিক্যাল গোর্ডেন ও ইকোপার্ক পরিচালক মোহাম্মদ হোছাইনের সাথে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি বলেন,“ইকোপার্কসংলগ্ন এলাকাটি এ ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্যে সীতাকুণ্ড জনবসতি এলাকা হিসেবে কোনোক্রমেই উপযোগী নয়। সীতাকুণ্ড জাহাজভাঙ্গাশিল্পসহ অন্যান্য শিল্পএলাকার শ্রম পরিবেশ উন্নয়নের এটি মঙ্গলজনক হলেও দেশের অন্যতম ট্যুরিস্ট স্পট ও জীববৈচিত্র্য হটস্পট হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এমতাবস্থায় বন, বন্যপ্রাণি, জীববৈচিত্র্য,বনের প্রতিবেশ ও ইকো-ট্যুরিজমের ওপর বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় রেখে ইকোপার্কের সীমানা ঘেঁষে বিষাক্ত বর্জ্যব্যবস্থাপনা শিল্প স্থাপন না করে অন্যত্র স্থাপন করা সমীচীন হবে।”

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বনসংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাস প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার প্ল্যান্ট সম্পর্কে বলেন, “প্রকল্পটি যেহেতু আমাদের জায়গায় স্থাপিত হচ্ছে না,সেহেতু আমরা সরাসরি বাধা দিতে পারছি না। তবে এ প্রকল্পের কারণে আমাদের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের যে অপরিসীম ক্ষতি হবে, তা আমরা আমাদের বনমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শিল্পমন্ত্রণালয়কে অবহিত করবো।”

সীতাকুণ্ড পৌরসভার ইকোপার্ক এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাছে আবাদী জমিতে বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প করা যায় কি না- প্রশ্ন করা হলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার মুঠোফোনে চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “প্রস্তাবিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটির এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে,অংশীজনদের সাথে বৈঠক করা হচ্ছে। এখানো আমাদের কাছে লিখিত কোনো আবেদন করা হয়নি। আবদনের পরই আমরা খতিয়ে দেখবো- এ প্রকল্পের কারণে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে কি না। পরিবেশের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকলে আমরা ছাড়পত্র প্রদান করবো।”

সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার প্ল্যান্ট নিয়ে বলেন,“শিল্পমন্ত্রণালয়ে অধীনে জাইকার এ ধরনের একটি বড়প্রকল্প সীতাকুণ্ড পৗরসভায় হতে যাচ্ছে শুনে ভালোই লাগছে। তবে এ জাতীয় প্রকল্পের জন্যে ইকোপার্কসংলগ্ন এলাকাটি কতোটা উপযোগী,পরিবেশ- প্রতিবেশের ক্ষতি হবে কি না- তা নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে।”

প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার প্ল্যান্ট নিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা,সীতাকুণ্ড উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলমের সাথে। তিনি বলেন,“সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতি এলাকায় এধরনের পরিবেশ দূষণকারী প্রকল্প কোনোভাবেই আমরা মেনে নিতে পারি না। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পরিবেশের ক্ষতি ও জনজীবন বিপন্ন হবে- এ ধরনের কথা-বার্তা শোনা যাচ্ছে। তাই, পরিবেশবিদ ও এলাকার সচেতন মানুষের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।”

সীতাকুণ্ড পৌরসভাধীন রেল লাইনের সামান্য পূর্বে মোলভীপাড়ার জনবসতি ও কৃষি জমিতে বর্জ্য শোধনাগার কারখানা স্থাপনের প্রচেষ্টা চলছে

প্রস্তাবিত বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়,সেখানে মাটিতে পোতানো কাঠের তৈরি খুটি শোভা পাচ্ছে। পরিলক্ষিত হয়,কৃষকের বিক্রিকরা জমিতে ক্রেতাদের কয়েকটি সাইনবোর্ড। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে, মৌলভীপাড়া গ্রামে লোকালয়ের সন্নিকটে আবাদী জমিতে প্রকল্পটি করার তোড়জোর চলছে। এ গ্রামে পাঁচশতাধিক কৃষক ও ৪/৫শ জন বর্গাচাষী আছে। কৃষকের ত্রি-ফসলী জমিতে বিষাক্ত বর্জ্য কারখানা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে একধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। এখানকার কৃষকেরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,ধানীজমিতে এমন কারখানা করা হলে কৃষি ও কৃষকের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এখানে চাষাবাদের আর কোনো জমি থাকবে না। আশপাশের জমিগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। বাড়িঘরে বসবাস করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।বর্গাচাষী মাহাবুবুল আলম জানান, “বেশি দামের লোভ দেখিয়ে সহজ-সরল ও নিরীহ কৃষকদের ধানী ও ত্রিফসলী জমি কেনার পাঁয়তারা করছে বাইরের লোকজন। আমাদের চাষাবাদের জমিতে কারখানা করলে আমরা আজীবনের জন্যে বেকার হয়ে যাবো। জমি বিক্রি করে চাষীরা সাময়িকভাবে লাভবান হলেও অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ড পৌরসভায়  জনজীবনে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে।”

পরামর্শ সভায় বক্তব্য রাখছেন জনৈক জমির মালিক

বিগত কয়েকবছর ধরে বিদেশী নাগরিকদের আনাগোনা ও ধানীজমিতে এবং বাড়িঘর দখলে নিয়ে জনবসতি এলাকায় বর্জ্যব্যবস্থাপনা কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে ইকোপার্কসংলগ্ন এলাকার সত্তরোর্ধ কৃষক মো. সোলাইমান চাটগাঁর বাণীকে বলেন,শেষ বয়সে জায়গাজমি ও বসতভিটা বিক্রি করে অন্যত্র কিছু করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর এসব কারখানা করতে হলে যেখানে সরকারি খাস জায়গা ও জনবসতি নেই,ওইসব এলাকায় কারখানাটি নির্মাণে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান কৃষক সোলাইমান।

এদিকে কারখানাটি নির্মাণের লক্ষে এখানকার মৌলভীপাড়া এলাকার ধানিজমির মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে গত দুই/তিন বছর ধরে জাইকা দল জরিপ চালাচ্ছে। এখন ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে গত ২০ এপ্রিল ২০২৪ স্থানীয় জমিমালিকদের নিয়ে জাইকা প্রতিনিধি দল সীতাকুণ্ড পৌরসভার মৌলভীপাড়ার ইসলাম সর্দারের বাড়িতে এক পরামর্শসভার আয়োজন করে। এতে স্থানীয় শতাধিক জমিমালিক, জাইকা প্রতিনিধি দল,শিল্পমন্ত্রণালয়ের উপসচিব সঞ্জয় কুমার ঘোষ ও সীতাকুণ্ড পৌরসভার স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিউল আলম চৌধুরী মুরাদ উপস্থিত ছিলেন।সভায় কারখানাটি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা,সম্ভাব্যতা,পরিবেশবান্ধবসহ ইতিবাচক দিকগুলো প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের চাকরির সুবিধা দেয়ারও আশ্বাস দেয়া হয়। এছাড়া জাইকা প্রতিনিধিদল নির্মিতব্য কারখানার জন্যে আগামী বছর থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কথা জানান। এর পরবর্তী দুবছরের মধ্যে কারখানা নির্মাণের কাজ শেষ করে ২০২৯ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা বলা হয়।

মতবিনিময়সভায় উপস্থিত এক জমির মালিক,বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ডিজিএম প্রণব চৌধুরী বলেন, “বহু স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে দেড়দশক আগে এখানে জমি কিনেছি। বর্জ্যব্যবস্থাপনা কারখানা নির্মাণের নামে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া আমার মতো আরও অনেকের স্বপ্ন তছনছ করে দিচ্ছে। সরকার চাইলে ধানিজমি অধিগ্রহণ অবশ্যই করতে পারবে। তবে জমির উপযুক্ত দাম যাতে দেয়,কারখানা নির্মিত হলেও যাতে পরিবেশবান্ধব হয়।”

সংরক্ষিত বনের কাছে কৃষিজমিতে বর্জ্য শোধানাগার কারখানা স্থাপনের সুযোগ আছে কি না- জানতে চাইলে শিল্পমন্ত্রণালয়ের উপসচিব সঞ্জয় কুমার ঘোষ মুঠোফোনে চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “এ কারণেই তো আমরা অংশীজনদের সাথে সভা করেছি, তাদের সাথে মতবিনিময় করছি। সকলেই যদি ঐক্যমত্যে পৌঁছে তাহলেই তো এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।”

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে বর্জ্যব্যবস্থাপনা কারখানা স্থাপন করা যায় কি না-মুঠোফোনে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দ রিজওয়ানা হাসান চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে না দেখে এ ব্যাপারে কিছু বলার সুযোগ নেই।”

কৃষি মন্ত্রণালয়   অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চা্ইলে তিনি চাটগাঁর বাণীকে বলেন, আমরা চাইনা তিন ফসলী কোনো জমিতে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠুক।এ ক্ষেত্রে  ভূমি মন্ত্রণালয় যদি অনুমতি দেয় তাহলে আমাদের করার কিছুই থাকেনা। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নে দেশে শিল্প গড়ে ওঠুক, তবে ধানী জমিতে নয়, যেখানে ধরনের আবাদ হয় না এমন  জায়গায় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠলে  দেশের জন্য মঙ্গল বলে  মন্তব্য করেন অতিরিক্ত  পাটোয়ারী।

ফসলী জমি নষ্ট করে যেখানে চলছে বর্জ্য শোধনাগার কারখানা নির্মাণের তোড়জোড়

কৃষিজমি অক্ষত রেখে উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার নির্দেশনা দিয়েছেন উল্লেখ করে ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ চাটগাঁর বাণীকে বলেন, ‘তিনফসলী জমি শুধু নয়, দুই- এক ফসলী জমিতেও শিল্প কারখানা করার সুযোগ নেই।কৃষি জমি ধংস করে শিল্প কারখানা নির্মাণ করলে  বাইর থেকে খা্দ্য আমদানী করে ভবিষ্যতে  জনঅধ্যুষিত এ দেশের মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।’

ভূমি মন্ত্রণালয় তাহলে কৃষি জমিতে শিল্পকারখানা করার অনুমতি দিয়েছে কীনা -এমন প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, কারা সীতাকুণ্ডে এমন প্রকল্প করছে অনুমিত নিয়েছে কি-না তা আমি খবর নিচ্ছি। তবে কোনো অবস্থাতেই  তিন ফসলী জমিতে শিল্পকারখানা করার সুযোগ নেই- যেটা প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ বলে তিনি মন্তব্য করেন।’

সীতাকুণ্ড পৌরসভাসদর। ছোট জনপদ ও ঘনবসতি এলাকা। এ জনপদের বুকচিরে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলসড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়ক থেকে মাত্র ৪/৫শ গজ পূর্বে রেলসড়ক। এ রেলসড়কের সামান্য পূর্বে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে ইকোপার্ক রোড দিয়ে কারখানাটি চালু হলে প্রতিদিন শতাধিক বিশালায়তনের লরি চলাচল করবে।প্রতিদিন প্রায় ৩০টির মতো ট্রেন চলাচলের কারণে ৩০বার রেলগেট বন্ধ করতে হবে। এতে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ছাড়াও ইকোপার্ক সড়কে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হবে- যার রেশ পড়বে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে।

হিন্দুসম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থস্থান চন্দ্রনাথধাম,সুপ্তধারা ঝর্ণা ও সহস্রধারা ঝর্ণাকে ঘিরে রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বনের সীতাকুণ্ড ব্লকের ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চলের ১৯৯৬ একর এলাকা জুড়ে প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, নৈসর্গিক শোভা বৃদ্ধি ও জনগণের চিত্তবিনোদনের জন্যে ২০০১ সালে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক স্থাপন করা হয়।দেশের প্রথম এ ইকোপার্ক ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন। এটি দেশের অন্যতম ইকো-ট্যুরিজম স্পট। প্রতিবছর এ পার্কে তিন/চার লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে থাকেন। সবুজ-শ্যামল- ছায়া সুনিবিড় সংরক্ষিত বন ও ইকোপার্কের অনতিদূরে এ ধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেয়া হলো- তা বোঝা কষ্টসাধ্য। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই যারা করেছেন,সজ্ঞানে করেছেন কি না- তাতে যেকারোরই সন্দেহ হতে পারে। সামান্যতম যাদের জ্ঞান-বুদ্ধি আছে,তারা এখানে বর্জ্য-শোধানাগার কারখানা স্থাপনের বিষয় সমর্থন করবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প স্থাপন নিয়ে কারো কোনো আপত্তি নেই, আপত্তি একটিই তা হলো এটি যথোপযুক্ত স্থানে স্থাপিত হচ্ছে কি না। প্রস্তাবিত বর্জ্য-শোধানাগার কারখানাটি ইকোপার্ক এলাকায় না করে সীতাকুণ্ডের অন্যকোনো এলাকায় করা যায় কি না- ভেবে দেখা যেতে পারে। উত্তর ও দক্ষিণ সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় বিশেষকরে বারৈয়াঢালা,কুমিরা কিংবা জঙ্গল সলিমপুরে এ ধরনের প্রকল্প করা যেতে পারে। অবৈধ বসবাসকারী লোকজনকে অন্যত্র পুনর্বাসন করে জঙ্গল সলিমপুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প স্থাপন করার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। কুমিরায় পাহাড়ি এলাকায় সহস্রাধিক একর খাসজমি ব্যক্তি বিশেষের দখলে রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন দখলকৃত এসব সরকারি জায়গা উদ্ধার করে সেখানে অনায়াসে বর্জ্যব্যবস্থাপনা কারখানা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

উল্লেখ্য,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে,“রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যত নাগরিকদের জন্যে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ,জীব-বৈচিত্র্য,জলাভূমি,বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।” এছাড়া জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১ এর ১৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে,“পরিবেশ ও বনমন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত বনাঞ্চল বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত থাকিবে এবং বর্তমান ব্যবহৃত বনভূমির সংরক্ষণ,রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে।”

এছাড়া কৃষিজমিতে শিল্পকারখানা না করে শিল্পজোনে করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।