৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ২৩শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

সীতাকুণ্ডের কৃষিক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন তিনটি প্রস্তাবিত সেচপ্রকল্প প্রায় ৩০বছর ধরে পানিসম্পদমন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। এ তিন সেচপ্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এল কে সিদ্দিকী। পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর এ  জনগুরুত্বপূর্ণ সেচপ্রকল্প নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামায়নি।

শিল্পনগর সীতাকুণ্ড কৃষিতেও সমৃদ্ধ একটি জনপদ হিসেবে বিবেচিত। সীতাকুণ্ডকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ‘সবজি জোন’ বলা হয়। চট্টগ্রাম শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শাক-সবজি যোগানের ক্ষেত্রে এ উপজেলার বিশেষ অবদান রয়েছে। এখানের কৃষকদের সাংবাৎসরিক আয়ের উৎস জমির আইলে উৎপাদিত সীম। সীতাকুণ্ডের সীম প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয়। সীতাকুণ্ডকে অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য স্থানেও জমির আইলে সীম উৎপাদন শুরু হয়েছে।

সীতাকুণ্ডের ভূগর্ভে পানির স্তর না থাকায় গভীর নলকূপ বসানোর সুযোগ নেই। ফলে সেচসঙ্কট এখানে তীব্র। চাষাধীন ১০% জমিতে সেচ সুবিধা রয়েছে। সেচসঙ্কটের কারণে তৃতীয় ফসল বোরো চাষের সুযোগ না থাকায় বছরে ৩০হাজার ৪শ’ ৩২মেট্রিক টন খাদ্যঘাটতি হয়। অথচ চাষাধীন ১০০% জমিকে সেচ সুবিধার আওতায় আনা হলে সীতাকুণ্ডের খাদ্যচাহিদা মিটিয়ে বাড়তি খাদ্যশস্য অন্যত্র সরবরাহের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

সীতাকুণ্ডের সেচসঙ্কট দূরিকরণের মাধ্যমে কৃষিউন্নয়নের লক্ষে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ-সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এল কে সিদ্দিকী  তিনটি খালের ওপর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন এবং এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দায়িত্ব দেয়া হয়।এ এলাকার প্রধান তিনটি খাল যথাক্রমে বোয়ালিয়া খাল, গোপ্তাখালি খালি খাল ও নোনাছড়া খালকে সেচ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়।

প্রস্তাবিত বোয়ালিয়া, গোপ্তাখালি ও নোনাছড়া সেচ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল, দুই পাহাড়ের মধ্যে আড়াআড়ি বাঁধনির্মাণ করে পানি সংরক্ষণাগার সৃষ্টি করা এবং সেই পানি সংরক্ষণাগারে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে বোয়ালিয়া, গোপ্তাখালি ও নোনাছড়া খালের মাধ্যমে উভয় তীরের আবাদী জমিতে সেচ প্রদান করে উচ্চফলনশীল ধানসহ অন্যান্য মৌসুমী ফসল উৎপাদন করা। তাছাড়া প্রস্তাবিত সেচপ্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত হলে এলাকার পানি নিষ্কাশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও মাছচাষের ব্যাপক উন্নতি হবে বলে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বোয়ালিয়া সেচ প্রকল্প

সীতাকুণ্ড উপজেলা সদর থেকে ৮কিলোমিটার দক্ষিণে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বোয়ালিয়াকুল এলাকায় প্রকল্পটির অবস্থান।এ প্রকল্পের উত্তরে পোল্ডার নম্বর-৬১/১, পূর্বে বিশাল পাহাড়, দক্ষিণে সোনাইছড়ি উপপ্রকল্প ও পোল্ডার নম্বর-৬১/১। সীতাকুণ্ড পাহাড় থেকে একটি প্রাকৃতিক জলস্রোত উৎপন্ন হয়ে বোয়ালিয়া খাল নাম নিয়ে পোল্ডার নম্বর- ৬১/১ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইচ নম্বর ১৬ ও ১৬ এর মাধ্যমে সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়েছে। পানি উন্নয়ন রোর্ডের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়, সীতাকুণ্ড পাহাড়ের যে স্থান থেকে বোয়ালিয়া খালের উৎপত্তি হয়েছে, সেই উৎপত্তিস্থলে তিনদিক পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে মাত্র একদিকে ৩০০ মিটার লম্বা ও ১০মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট একটি মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১.৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাবিশিষ্ট একটি পানি সংরক্ষণাগার (রিজারভার) তৈরি করা সম্ভব। বর্ষা মৌসুমে এখানে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন পানি নিয়ন্ত্রক অবকাঠামো, চেক স্ট্রাকচার ও লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে ভাটির দিকে জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা ও সারা বছর মাছচাষ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত পানি সংরক্ষণাগারে মোটামুটি পানি ধারণক্ষমতা হবে ১১,২৫০,০০ ঘন মিটার (৩০% পানি অপচয় ধরে)। এ পানি দ্বারা প্রায় ৭৫০ হেক্টর উচ্চফলনশীল ধানের জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটির সেই সময়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১কোটি ৮০লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে২০হাজার লোক ও ৩হাজার পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে।

গোপ্তাখালি সেচ প্রকল্প

এ প্রকল্পের উত্তরে সীতাকুণ্ড উপজেলা/পৌরসভা সদর, পূর্বে সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়, দক্ষিণে প্রস্তাবিত বোয়ালিয়া সেচ প্রকল্প ও পশ্চিমে পোল্ডার নম্বর ৬১/১। বাড়বকুণ্ড পাহাড় থেকে একটি প্রাকৃতিক জলস্রোত উৎপন্ন হয়ে গোপ্তাখালি খাল নামে পোল্ডার নম্বর ৬১/১ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইচ নম্বর ৫-৬ এর মাধ্যমে সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক জরিপে বলা হয়, বাড়বকুণ্ড পাহাড়ের যে স্থান থেকে গোপ্তাখালি খালের উৎপত্তি হয়েছে, সেই উৎপত্তিস্থলের তিনদিক পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে মাত্র একদিকে ৩০০ মিটার লম্বা ও ১২মিটার উচ্চতাবিশিস্ট একটি মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১.৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে পানি সংরক্ষণাগার তৈরি করা সম্ভব- যেখানে বর্ষা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন পানি নিয়ন্ত্রক অবকাঠামো, চেক স্ট্রাকচার ও লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে ভাটির দিকে জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা ও সারা বছর মাছচাষ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত পানি সংরক্ষণাগারে পানির ধারণ ক্ষমতা হবে প্রায় ১,১২,৫০,০০০ঘনমিটার। অন্যান্য কাজে পানি ব্যবহারের পরও প্রায় ৫৫০ হেক্টর  উচ্চফলনশীল ধানের জমিতে সেচ প্রদান করা যাবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবে প্রকল্প এলাকার ৩/৪হাজার পরিবারের। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১কোটি ৭০ লাখ ৫০হাজার টাকা।

নোনাছড়া সেচ প্রকল্প

প্রকল্পটির উত্তরে পোল্ডার নম্বর-৬১/১ এর উত্তর অংশ, পূর্বে সীতাকুণ্ড পাহাড়, দক্ষিণে সীতাকুণ্ড উপজেলা সদর ও পশ্চিমে পোল্ডার নম্বর ৬১/১। সীতাকুণ্ড পাহাড় থেকে প্রাকৃতিক জলস্রোত উৎপন্ন হয়ে নোনাছড়া নামে পোল্ডার নম্বর- ৬১/১ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইচ নম্বর ১৩সি ও ১৩-১৪ এর মাধ্যমে সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়েছে। প্রকল্পটির উৎপত্তিস্থলের তিনদিক পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে একদিকে ২০০ ও ১৫০ মিটার লম্বা ও ১০মিটার উচ্চবিশিষ্ট মাটির বাঁধনির্মাণ করে পাহাড়ের মধ্যে প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে একটি পানি সংরক্ষণাগার করা যাবে। এখানে বর্ষা মৌসুমে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন পানি নিয়ন্ত্রক অবকাঠামো, চেক স্ট্রাকচার ও লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে ভাটির দিকে জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান ও সারা বছর মাছচাষ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত পানি সংরক্ষণাগারে পানি ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৭৫,০০,০০০ ঘনমিটার (৩০% পানির অপচয় ধরে)- যা দ্বারা ৫শ’ হেক্টর উচ্চফলনশীল ধানীজমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে এবং ১৫হাজার লোক ও ২হাজার পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন হবে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১কোটি ৬০লাখ ৫০হাজার টাকা। প্রকল্প তিনটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার ভৌত পরিবেশের প্রভূত উন্নতি ঘটবে।প্রকল্পে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে।

এদিকে  সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানা বিশেষকরে জিপিএইচ, বিএসআরএম, কেএসআরএম, গোল্ডেন ইস্পাত,সীমা স্টিল প্রতিদিন ৫০/৬০ লাখ লিটার পানি ব্যবহার করায় এখানকার ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে গেছে আশঙ্কাজনকহারে। কয়েকমাস ধরে সীতাকুণ্ডের নলকূপে পানি ওঠছে না। হাহাকার চলছে খাবার পানি নিয়ে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও ভোগছে পানিসঙ্কটে। তাই, সীতাকুণ্ডের  শিল্পকারখানা,কৃষি ও সর্বোপরি জনস্বার্থে প্রস্তাবিত এ তিনটি সেচপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি অনুধাবন করে এ নিয়ে সক্রিয় হবেন- এমন প্রত্যাশা সীতাকুণ্ডবাসীর।

লেখকঃ প্রধানসম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম