[bangla_date] || [english_date]

বিশেষ প্রতিনিধি *

দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সারিকাইত ইউনিয়নে। আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এ ইউনিয়নের আরেক সন্তান স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা.জামাল উদ্দিন চৌধুরী স্বতন্ত্রপ্রার্থী। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন; পাননি। দল থেকে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে নৌকার মাঝি বর্তমান এমপি মাহফুজুর রহমান মিতার সাথে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। প্রথমদিকে এখানে স্বতন্ত্রপ্রার্থীর নেতাকর্মীদের মারধোর ও হামলার ঘটনা ঘটলেও পরবর্তীতে পুলিশের শক্ত অবস্থানের কারণে পরিস্থিতির  ব্যাপক উন্নতি হয়েছে; নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এখন অনেকটা স্বাভাবিকভাবে চলছে। সেই সাথে ঈগলের প্রচারণা জমে ওঠেছে। এখানে এমপিপ্রার্থী ৮ জন হলেও শেষমেশ নৌকা আর ঈগলের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হতে যাচ্ছে। সাগরকন্যা সন্দ্বীপের নির্বাচনী আকাশে মুক্ত ডানায় ঈগলের উড়াউড়ি বাড়ছেই। এছাড়া অন্য প্রার্থীরা হচ্ছেন- এম এ সালাম ( লাঙ্গল), নুরুল আক্তার (মশাল), মুহাম্মদ উল্লাহ খান (মোমবাতি), নুরুল আনোয়ার ( একতারা), মোকতাদের আজাদ খান (আম) ও আবদুর রহীম (চেয়ার)। ১৫ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে ভোটকেন্দ্র ৮৬, সর্বমোট ভোটার ২,৪১,৯১৪ (পুরুষ- ১,২৩,৯৬৯ মহিলা-১,১৭,৯৪৩ ও হিজড়া-২)।

নির্বাচনী প্রচারণা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তফসিল অনুযায়ী  আগামীকাল (৫জানুয়ারি )শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রচারণা চলবে। গ্রামের বাজার, রাস্তাঘাট,পাড়া-মহল্লায়, পৌরশহরের অলিতে গলিতে মিছিলে মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠেছে পুরো জনপদ। প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকেরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। একই সাথে ভোটারদের কেন্দ্রে যওেয়ার আহবানও জানানো হচ্ছে। রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁধারশিতে ব্যানার পেস্টুন দুলছে। প্রযুক্তির আর্শিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানান মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ভোটের যাবতীয় প্রচারণা কার্যক্রম। শীতের মধ্যেও প্রচারণায় যোগ হচ্ছে উত্তাপ।পাল্টেছে প্রচারণার ধরণও। পথসভা, উঠানবৈঠক, গণসংযোগের পাশাপাশি মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠছে দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপ। দম ফেলানোর ফুরসত নেই প্রার্থী ও অনুসারী দলীয় নেতাকর্মীদের। শেষ মুহুর্তেই মহাব্যস্ত সময় পার করছেন নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্টরা। রাতদিন সমানতালে চলছে প্রচারণা। তবে নৌকা আর ঈগলের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। পুরো সন্দ্বীপজুড়ে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। নৌকার মাঝি মাহফুজুর রহমান মিতার নিজ ইউনিয়ন বাউরিয়ায়ও স্বতন্ত্রপ্রার্থী ডা. জামালের অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত এই ইউনিয়নের অনেক নেতা এ-ই প্রথম নৌকার বিপরীতে গিয়ে স্বতন্ত্রপ্রার্থীর পক্ষে সরব হয়েছেন। অবশ্য, ভোটারদের সাথে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা হলো- ভোটারেরা যদি নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে তাহলে স্বতন্ত্রপ্রার্থী ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি।নৌকার সমর্থকদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন- সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সন্দ্বীপে বিদ্যুতায়ন ও নজিরবিহীন অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে মাহফুজুর রহমান মিতার কোনো বিকল্প নেই। শেষ হাসি হাসবেন সন্দ্বীপের উন্নয়নের রূপকার মাহফুজুর রহমান এমপি।”

সন্দ্বীপ আওয়ামী লীগ এর বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও নানান শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে চাটগাঁর বাণী প্রতিনিধির কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ সন্দ্বীপ উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান মৃত্যুবরণ করেন। প্রহসন ও তথা বিনা নির্বাচনে তিনি তিনবার উপজেলা চেয়ারম্যান হন। গত ১৫বছরে সন্দ্বীপের ভোটারেরা কোনো পর্যায়ের নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। মাঈনুদ্দিন মিশন ছাড়াও ওই নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন আরও ১৭জন জেলা ও উপজেলা নেতা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম, উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান জেবুন্নেছা চৌধুরী জেসি, পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ জামিল ফরহাদ, সাবেক মেয়র জাফর উল্লাহ টিটু, জেলা পরিষদ সদস্য ছিদ্দিকুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য রাজিবুল আহসান সুমন, আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যান. মিজানুর রহমান চেয়ারম্যান, প্রয়াত মাস্টার শাহজাহানের ছেলে নাদিম শাহ আলমগীর প্রমুখ। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, জনসমর্থন, রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড, সাংগঠনিক ক্যারিয়ার এসব কিছু বিবেচনায় মাঈনুদ্দিন অন্তত ১০ জনের পেছনে হলেও এমপি’র আর্শিবাদে মনোনয়ন পাওয়ায় অন্য নেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়। এমপি মিতা চাকর-বাকরসহ অন্ধ অনুগত নেতাদের জনপ্রনিধি নির্বাচিত করে দলীয় সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সংখ্যালঘুদের জমিদখল, নেতাকর্মীদের সাথে বৈষম্য ও অসৌজন্যমূলক আচরণ, দুর্ব্যবহার সবকিছু মিলিয়ে তিনি অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। সন্দ্বীপের ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের প্রায় সকলেই স্বতন্ত্রপ্রার্থী ডা. জামালের পক্ষে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। বিশেষকরে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি, প্রবীণ আওয়ামী লীগনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম, এ বি কলেজের সাবেক ভিপি, সাবেক পৌরসভা মেয়র জাফর উল্লাহ টিটু, সন্তোষপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান (ফুল মিয়া), মগধরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান শাহীন, উত্তর জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি ও মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান,আমান উল্লাহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত চৌধুরী, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য রাজিবুল আহসান সুমন, উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহবায়ক নজরুল ইসলাম আকবর, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মশিউর রহমান বেলালসহ আরো অনেক আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা ঈগল মার্কার অনুকূলে

প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে যেসব নেতাকর্মী ঈগলের সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন তাদেরকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে নৌকাপ্রার্থীর লোকজন- এমন কথা শোনা যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম-৩(সন্দ্বীপ) নির্বাচনী এলাকার সার্বিক পরিবেশ ও জয়ের ব্যাপারে কতোটা আশাবাদী প্রশ্ন করা হলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশাবাদ ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, “জয়ের ব্যাপারে আমি শতোভাগ আশাবাদী।” নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার পরিবেশের ওপর সন্তোষ প্রকাশ করে স্বতন্ত্রপ্রার্থী ডা.জামাল উদ্দিন চৌধুরী চাটগাঁর বাণীকে বলেন,“নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, তাহলে ঈগলের জয় সুনিশ্চিত।” নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে মুঠোফোনে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. খোরশেদ আলম চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে রাজী হননি। নির্বাচন নিয়ে টেলিফোনে কথা বলতে আইনগত কোনো বাধা আছে কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘মুঠোফোন লাইন কেটে দেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে কতোটা আশাবাদী জিজ্ঞেস করা হলে সন্দ্বীপ থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, “আশাবাদের বিষয় নয়, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতেই হবে; এর কোনো বিকল্প নেই।”

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগনেতা চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “সন্দ্বীপের ক্ষয়িষ্ণু আওয়ামী লীগ রাজনীতি ধ্বংসের ধ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মাস্টার শাহজাহানের হাতে আওয়ামী লীগের হনন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আর বর্তমান এমপি মাহফুজুর রহমান এ হনন প্রক্রিয়াকে নিরুদ্বেগে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে হাজার হাজার নেতাকর্মীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ চললেও তা দেখার কেউ নেই। দলের এ দুরবস্থার নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন নির্বাচনেও পড়বে।”

উল্লেখ্য,মাহফুজুর রহমান মিতা দল থেকে দুবার মনোনয়ন পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার পিতা দ্বীপবন্ধুখ্যাত প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান সন্দ্বীপের দু’বার এমপি হয়েছিলেন। পিতার জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে ২০০৮ সালে প্রথম দলীয় মনোনয়ন চেয়ে পাননি। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে নৌকার প্রার্থীকে ডিঙ্গিয়ে তিনি দ্বিতীয় হন।পরে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে তিনি দলের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম ওবায়দুল্লাহ, ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে গণফ্রন্টের একেএম রফিকুল্লাহ চৌধুরী, ১৯৮৬ সালের তৃতীয় ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একেএম সামশুল হুদা, ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মুস্তাফিজুর রহমান এই আসনে বিজয়ী হন। ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম সংসদে বিএনপির মুস্তাফা কামাল পাশা বিজয়ী হন।