[bangla_date] || [english_date]

নিজস্ব প্রতিবেদক *

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব যখন প্রশংসা করছে তখন কিছু মানুষ সমালোচনা করছে। কাজেই যে যাই বলুক, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ এগিযে যাবে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।  মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা সভায় অংশ নেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমাদের দেশে কিছু রাজনৈতিক দেওলিয়াত্বপূর্ণ যাদের, যারা একেবারে রাজনৈতিকভাবেই দেউলিয়া….এদের কিছু বক্তব্য। আর আমাদের দেশে কিছু আছে বুদ্ধি বেচিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে যারা, সেই তথাকথিত বুদ্ধিজীবী অনবরত তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গীবত করছে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে দেশে অতি বাম, অতি ডান সবাই এখন এক হয়ে গেছে। এটা কীভাবে হলো জানি না। এই দুই মেরু হয়েও…..সব সারাক্ষণ শুনি যে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করতে হবে। অপরাধটা কী আমাদের? দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সেটাই অপরাধ?

শেখ হাসিনা বলেন, করোনার সময় আমরা বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দিয়েছি। পৃথিবীর ধনী দেশগুলো দেয়নি, কিন্তু বাংলাদেশ দিয়েছে। টেস্ট আমরা বিনা পয়সায় করেছি, কোনো ধনী দেশও করেনি। আমরা দুই হাতে পানির মতো টাকা খরচ করে মানুষকে বাঁচাতে পদক্ষেপ নিয়েছি। খুব কম দেশই সেটা করতে পেরেছে। আমরা সেখানে সাফল্য অর্জন করেছি। মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়েছি, শিশু মৃত্যুর হার কমিয়েছি। স্বাক্ষরতার হার বাড়িয়েছি। মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়িয়েছি। মানুষের ঘরের কাছে চিকিৎসাসেবা নিয়ে গেছি। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি আছে। সবদিক থেকেই তো বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। পিছিয়ে আছি কোথায় আমরা? মাথাপিছু আয় আমরা বাড়িয়েছি, প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছি।

তিনি বলেন, পদ্মাসেতু উদ্ধোধনের পর এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা টোল উঠেছে। সব খরচ রেখে এরপর এই দেড় হাজার কোটি টাকা লাভ হয়েছে। এই সেতু আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে হয়েছে। আমরা পারি, সেটা প্রমাণিত।

গ্রামে দারিদ্র কমেছে, শহরে বেড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য তৃণমূলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি করা। আজকে কেউ বলতে পারে না যে গ্রামে দারিদ্র আছে। এখন মানুষ বলে শহরে দারিদ্র আছে। এটা একটা অদ্ভুত হিসেব। দারিদ্রের হার শহরে বেড়ে গেছে, গ্রামে নয়। অথচ একসময় গ্রামের মানুষ একবেলা ভাত পেতো না, খেতে পেতো না। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। রোগের চিকিৎসা পেতো না। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। আমাদের উন্নয়নের সব কিছু তৃণমূল মানুষকে লক্ষ্য রেখেই পরিকল্পনা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছি। বাংলাদেশে কোনো মানুষ গৃহহীণ থাকবে না। ভূমিহীন থাকবে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলা ও উপজেলা ভূমিহীন-গৃহহীণ মুক্ত ঘোষণা করেছি। অল্প কিছু বাকী আসে, সেই ঘরগুলোও হয়ে যাচ্ছে। কাজেই কোনো মানুষই গৃহহীণ থাকবে না।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যারা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে, ভোটের অধিকার নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলে। তাদের জন্মটাই বা কোথায়? অবৈধভাবে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলকারী তাদের পকেট থেকে বের হওয়া রাজনৈতিক দলের মুখে এখন গণতন্ত্র আর ভোটের অধিকারের ছবক শুনতে হয়।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনেও চক্রান্ত করে আওয়ামী লীগকে হারানো হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ভোটের হার আমাদের বেশি ছিল কিন্তু সিট পাইনি। কারণ আমি রাজি হইনি আমাদের দেশের গ্যাস অন্য দেশের কাছে বেচব। আমরা যদি তখন রাজি হতাম আর গ্যাস বিক্রি করা শুরু করতাম তাহলে কী অবস্থা হতো? আমাদের কোনো ইন্ডাস্ট্রি চলতো? ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি চলতো? বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তো? হতো না ? কিন্তু খালেদা জিয়া কিন্তু মুচলেকা দিয়েছিল ক্ষমতায় গেলে গ্যাস বিক্রি করবে। আল্লাহ জন বুঝে ধন দেয়। খালেদার আমলে কূপ খনন করেও গ্যাস পায়নি।

নিজের ওপর মামলার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর আমার বিরুদ্ধে প্রায় ১ ডজন মামলা দেয়। এরপর তত্বাবধায়ক সরকার এসে আরো ৫ থেকে ৬ টা মামলা দেয়। প্রত্যেকটা মামলা তদন্ত করে রিপোর্ট আমি দিয়েছি। কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। তদন্ত সাপেক্ষেই কোর্ট সমস্ত মামলা বাতিল করে। সরকার থেকে আমরা কোনো মামলা প্রত্যাহার করিনি। তার কারণ আমাদের সততার ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে। আমরা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। যে দলের কোনো মাথা মুন্ড নাই। তাদের চেয়ারপার্সন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও সাজাপ্রাপ্ত আসামি, দেশান্তরী। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। সেই সুবাদে সারাক্ষণ অনলাইনে শুধু নির্দেশ দেয়। সেই সিদ্ধান্তেরও ঠিক নাই। আজকে এরে বহিষ্কার করে, কালকে আবার তারে দলে ফিরিয়ে নেয়। কালকে আবার আরেকজনকে বহিষ্কার করে আবার দলে ফিরিয়ে নেয়। তাদের কোনো সিদ্ধান্ত নাই। আর নির্বাচন করবে না আমাদের অধীনে। আমাদের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কে তারা? যাদের জন্মই হয়েছে ভোট চুরির মধ্য দিয়ে, তারা আবার প্রশ্ন তুলে কীভাবে? দেশের মানুষ তো ভোট দিয়ে খুশি। হ্যা স্থানীয়ভাবে কিছুটা সমস্যা হয়।

২০২৬ সালে নতুন যাত্রা শুরু হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা স্বল্পোন্নত দেশ রেখে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছি। উন্নয়নশীল দেশের জন্য যে কয়েকটা পদক্ষেপ নেয়া দরকার, অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে আমরা সেগুলো নিয়েছি। ২০২৬ সাল থেকে আমাদের নতুন যাত্রা শুরু হবে। সেই প্রস্তুতিও আমরা নিয়েছি। আমরা এটা বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যে অগ্রযাত্রাটা সহজভাবে আমরা করতে পারব। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

ফিলিস্তিনে হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনের ওপরে যেভাবে আক্রমণ হচ্ছে। সেখানে রীতিমত গণহত্যা চালাচ্ছে। আমরা তার প্রতিবাদ করে যাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি ফিলিস্তিনে শিশু-নারী হত্যার প্রতিবাদ করে যাচ্ছি। যুদ্ধ বন্ধ করবার আহ্বান জানাচ্ছি। আজকে সারাবিশ্ব প্রতিবাদমূখর। কয়েকদিন আগে আমেরিকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ফিলিস্তিনে গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। আন্দোলনের সময় একজন নারী প্রফেসরকে পুলিশ যেভাবে হাত ধরে, পিঠমোড়া দিয়ে মাটিতে ফেলে হাঁটু দিয়ে তার ওপর চেপে তাকে যেভাবে গ্রেপ্তার করেছে। সেখানে ছাত্র-শিক্ষক, তাদের হাতে লাঠিও ছিল না, তারা মারমুখীও ছিল না। তারপরেও আমেরিকার পুলিশ যে আচরণ করেছে। ওই দেশে মানবাধিকার কতটুকু আছে, সেটা প্রশ্ন। কথা বলার অধিকার কতটুকু বা প্রতিবাদ করার অধিকার কতটুক আছে, সেটাই প্রশ্ন। আর তারা বাংলাদেশের ওপর মানবাধিকারের রিপোর্ট লেখে।

তিনি বলেন, আজকে আমেরিকার একটা পুলিশের গায়ে যদি কোনো দলের লোক হাত দিতো, তাহলে তারা কী করত? আর প্রতিনিয়ত আমাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরাবে। আমাকে হত্যা করবে। ১৫ আগস্ট ঘটাবে। অনবরত শুনেই আসছি। আমেরিকায় আমাদের কত বাঙালি সেখানে মারা গেছে। কয়েকদিন আগেও দুইজন বাঙালিকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। ছোট শিশু ও বৃদ্ধরাও সেখানে রেহাই পায় না। সেখানে বাংলাদেশে যারা মানবাধিকার খুঁজে বেড়ায়, তারা এর জবাব কি দেবে তারা? আমি তাদের কাছে সেই জবাব চাই। যারা আমাদের স্যাংশন দেয়, জাস্টিজ ডিপার্টমেন্ট বা যারা আমাদের ওপর খবরদারি করে। তাদের কাছে জবাব চাই আমার বাঙালি কেন মারা যাবে? এটা সম্পূর্ণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করা।

চলমান তাপদাহে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রচণ্ড গরম। গরমে মানুষ অতিষ্ঠ। জীবন-জীবিকা তো থেমে থাকবে না। সবাইকে প্রচুর পানি খেতে হবে। নিজেরা সাবধানে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়। থাইল্যান্ডেও একই অবস্থা। প্রচণ্ড গরম। পুরো দক্ষিণ এশিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতেও গরম ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা আশা করছি যে খুব তাড়াতাড়ি বৃষ্টি হবে।

তিনি বলেন, এসময় তিস্তা নদীতে যে পরিমাণ পানি থাকে। সেখানে এবার দ্বিগুণ আছে। সব নদীতে পানি প্রবাহ বেড়ে গেছে। এটা আমাদের জন্য সামান্য একটু আশার আলো। হাওরে ধান উঠে যাচ্ছে। বাম্পার ফলন পাব আশা করি। ১ আষাঢ় থেকে বৃক্ষরোপণ করা হবে। সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি।

সন্ধ্যা ৭টা ৬ মিনিটে শুরু হওয়া সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন।