৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ২৩শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

রোজ একজন প্রাপ্তবয়স্কের ১ হাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট ভিটামিন ডি-এর দরকার পড়ে। শরীরের হাড় ও দাঁতের গঠনের জন্য ভিটামিন ডি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। ভিটামিন ডি এবং ক্যালশিয়াম একে অপরের পরিপূরক। অর্থাৎ ক্যালশিয়ামের ঘাটতি আছে অথচ ভিটামিন ডি রয়েছে পর্যাপ্ত, তাহলেও যেমন তা শরীরের যেমন কাজে লাগবে না, তেমনই ক্যালশিয়াম পর্যাপ্ত আছে, অথচ ভিটামিন ডি নেই- এমন ক্ষেত্রেও তা শরীরের কোনও কাজে আসে না। দু’টি উপাদানই পর্যাপ্ত মাত্রায় না থাকলে হাড়ের ক্ষয় হতে থাকে। আসলে আমাদের শরীরে গঠন ও ক্ষয়ের ক্রিয়া সমানতালে চলতে থাকে। যখন গঠন বেশি হয়, ক্ষয় কমে। আর যখন ক্ষয় বেশি হয়, তখন গঠন কমে যায়।

মাংসপেশির সংকোচন ও প্রসারণের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে চলার পেছনে ভিটামিন ডি-এর বিশেষ ভূমিকা আছে।

বিভিন্ন হর্মোনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভিটামিন ডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে স্টেরয়েডজাতীয় হর্মোনগুলোর কাজ করার জন্য ভিটামিন ডি জরুরি।

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে জরুরি। আবার ইনুসলিন হর্মোনের কাজও সঠিকভাবে করতে দরকার এই ভিটামিনের।

ফুসফুসের শ্বাসনালীর কর্মক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতেও ভিটামিন ডি-এর ভূমিকা আছে।

এই ভিটামিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখা। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ক্যান্সার প্রতিরোধে, বয়স ধরে রাখতে, ত্বকের বলিরেখা প্রতিরোধেও ভূমিকা রয়েছে ভিটামিন ডি-এর।

আমাদের দেশে এর কি ঘাটতি আছে? কতটা?

এ দেশে যেখানে সূর্যালোকের কোনও ঘাটতি নেই, সেখানে শরীরে ভিটামিন ডি-এর খামতি দেখা দেয়ার কারণ নেই। কারণ ত্বকে রোদ পড়লে, চামড়ায় ভিটামিন ডি সংশ্লেষ হয়।  অথচ দেখা গেছে, আমাদের দেশে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৭০ থেকে  ৮০ শতাংশ লোকের ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির অনেক পর্যায় আছে যথা মৃদু, মাঝারি, তীব্র ইত্যাদি।

ঘাটতি কেন হচ্ছে?

খুব বেশি খাদ্যের উৎস থেকে ভিটামিন ডি মেলে না। অতএব ভিটামিন ডি-এর সত্যিকারের উৎস হল সূর্যালোক। ইদানীং আমাদের জীবনযাত্রা এমনই হয়ে গেছে যে, আমরা গায়ে রোদ লাগাবার সময়ই পাচ্ছি না। বেশিরভাগ লোকই সারাদিন অফিসে চার দেয়ালের ঘেরাটোপে বন্দি। সেখানে কৃত্রিম আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত হয়ে থাকলেও রোদ কোথায়! তাছাড়া আমরা গায়ে খুব একটা রোদ লাগাতে পছন্দও করি না। বাইরে বেরলে পা থেকে মাথা অবধি কাপড়ে ঢেকে রাখি যাতে ত্বক না পুড়ে যায়। গৃহকর্ত্রীরা সারাদিন ঘরের মধ্যেই কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে গায়ে রোদ লাগানো হয়ে ওঠে না। অবশ্য অনেকেই বলবেন তারা বাজার, দোকানপাটে যান। তখন কিছুটা রোদ তো গায়ে লাগে। তাতে কি কাজ হবে না? সত্যি বলতে কী, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করতে হলে করতে হবে সাহেবদের মতো আদুল গায়ে রোদ্রস্নান। সারাদিনের মধ্যে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টের মধ্যে যে কোনও সময় আধঘণ্টা একটানা গায়ে রোদ্দুর লাগাতে পারলে, শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন তৈরি হবে। বাইরে থেকে সাপ্লিমেন্ট খেয়ে ঘাটতিপূরণ করতে হবে না।

তবে সেভাবে আর গায়ে রোদ্র লাগানো যায় কোথায়? গ্রামেগঞ্জে তাও বা পুরনো আমলের লোকেরা রোদে বসে গায়ে তেল মেখে পুকুরে

যেতেন, এখন সেসব কেউ করেন না। শহরে তো কথাই নেই। নগরে বেশিরভাগ লোক থাকেন ফ্ল্যাটে। ফলে রোদ্রের অভাবে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থেকেই যায়।

ঘাটতি হচ্ছে বুঝবেন কীভাবে?

এই ভিটামিনের ঘাটতিতে প্রচণ্ড গায়ে হাতে পায়ে ব্যথা হয়। দেখা যায় রাতে শুতে গেলেই বিভিন্ন মাংসপেশিতে টান ধরছে, বুকে ব্যথা হয়, হাড়ে ব্যথা হয়। এছাড়া চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে থাই, পায়ের মাংশপেশিতে ব্যথা হয় অনেকের। দুর্বলও লাগে। একটু ভারী কাজ করতে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন পেশিগুলোতে একটানা ব্যথা হলেও তা কিন্তু ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি নির্দেশ করে। অতএব শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথার উপসর্গ হলে আগে দেখতে হবে ভিটামিন ডি-এর অভাব হচ্ছে কি না। তবে একটা কথা, শুধু ভিটামিন ডি নয়, এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির ক্যালশিয়ামের অভাব আছে কি না তাও দেখা অত্যন্ত জরুরি।

অন্যান্য উপসর্গ

দীর্ঘকালীন ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হাড়ের ক্ষয় ঘটায়। ফলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভোগা ব্যক্তি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকেন। অনেকের পা বেঁকে যায় ফলে তাঁর পদচালনা হয় হাঁসের মতো।

  • ভিটামিন ডি-এর অভাবের প্রভাব পড়ে ইনসুলিনের কাজে। তাই এই ভিটামিনের অভাবে ডায়াবেটিস রোগী দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ খেলেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসে না।
  • এই ভিটামিনের অভাবে ফুসফুসের সমস্যা যেমন অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিসের উপসর্গ কমতে চায় না।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর ভিটামিন ডি-এর প্রভাব অনস্বীকার্য। দেখা গেছে, যে কোনও রোগ থেকে দ্রুত সেরে ওঠার ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে কোনও রোগে সারতে না চাইলে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি আছে কি না তা দেখতে হয়।

ছোটদের সমস্যা

মনে রাখতে হবে, ছোটবেলায় দেহের হাড়গুলোর গঠন শুরু হয়। ফলে সেইসময়ে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে দেহের হাড় বেঁকতে শুরু করে। হতে পারে শিশুদের রিকেট। এই রোগে বাচ্চার পা বেঁকে যায়। তাই ছোটদের ডায়েটে দুগ্ধজাত খাদ্যের জোগান বজায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে তাদের বাইরে রোদে খেলাধুলো করতে দিতে হবে। বাচ্চার জন্মের পরে কিছুদিন অন্তত তাকে রোদে রাখতে  হবে অনেকটা সময়।

ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট

ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, লিক্যুইড আকারে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়। তবে সাপ্লিমেন্ট দেয়ার আগে রক্তপরীক্ষা করে দেখতে হয় সত্যিই এই ভিটামিনের ঘাটতি আছে কি না। কারণ শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বেড়ে গেলেও হতে পারে বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথার মতো উপসর্গ।

১২ থেকে ১৬ সপ্তাহের কোর্স থাকে। সপ্তাহে একটি করে ভিটামিন ডি ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল খেতে হয়। একটি ক্যাপসুলে ৬০ হাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট ভিটামিন ডি থাকে। সাপ্লিমেন্ট এতখানি ভিটামিন থাকার কারণ হল, সাপ্লিমেন্টের ভিটামিন ডি-এর সবটাই শরীরের শোষিত হয় না। তাই একটু বেশিমাত্রায় দেয়া থাকে।

লেখক-বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আশিস মিত্র।