২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ১০ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মোহাম্মদ ইউসুফ *

বন্দর-শহর চট্টগ্রামের পরিবেশ ও আবহাওয়া বিশুদ্ধ রাখতে অনেক আগেই উন্নত ডাম্পিং   স্টেশন স্থাপন  অপরিহার্য হলেও  এখনো তা গড়ে ওঠেনি। নগরবাসী দীর্ঘসময় ধরে ক্লিন ও গ্রিন সিটির গল্প শুনে আসলেও তা কোনোভাবেই আলোর মুখ দেখছে না। বর্জ্য অপসারণে নেই কোনো আধুনিক ব্যবস্থা। পরিচ্ছন্ন -পরিপাটির শহর যেন দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে।ময়লা-আবর্জনা ফেলার উন্নত ডাস্টবিন নেই, নগরের বিভিন্ন স্থানে রক্ষিত নির্ধারিত ডাস্টবিনে নির্ধারিত বর্জ্য না ফেলে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় নগরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে, খোলাজায়গায়, পথচারিদের হাঁটার পথে, সেখান থেকে দিন-দুপুরে ময়লা গাড়িতে তোলা হয়, দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। মুখে মাক্স থাকলেও নাক টিপে ঘর থেকে বের হতে হয় নগরবাসীকে। বন্দরশহর চট্টগ্রাম মানে ময়লা-আবর্জনার শহর।

পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্যে আলাদা পোশাক, নাকে-মুখে মাক্স ও হাত-পায়ে প্লাস্টিকের মৌজা ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও এসব ছাড়াই কাজ করছেন পরিচ্ছন্নকর্মীরা। চসিক এর পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তারা শহরের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে যতোটা না নজর, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত পকেটস্পীত করার কাজে। তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, বহাল তবিয়তে আছেন দুর্নীতিবাজ পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তারা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বলতে কিছুই নেই এখানে।          চসিকের পরিচ্ছন্ন অফিসে কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে এখানে। পরিচ্ছন্নকর্মীরা সুপারভাইজারদের যোগসাজসে কাজ না করে হাজিরা দেখিয়ে বেতন ওঠিয়ে নেয়- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পরিচ্ছন্নকর্মীরা সময়মতো কাজে আসে না। এদের তত্ত্বাবধান সঠিকভাবে হয় না বলেই এমনটা হচ্ছে। আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যবহৃত গাড়ির ট্রিপে গোঁজামিল ও জ্বালানি আত্মসাতের অভিযোগ সকলের মুখে মুখে।এছাড়া মশানিধনের ওষুধ ও ব্লিচিং পাউডার ক্রয়, মজুদ ও ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়ম ও গোঁজামিল রয়েছে।প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারপ্রাপ্ত/অতিরিক্ত দায়িত্ব নেয়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন কর্তাব্যক্তিরা। পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ার লক্ষ্যে প্রতি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নকর্মীদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা প্রয়োজন হলেও তা করা হচ্ছে না। পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি ওপেন-সিক্রেট। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপত্রে দৈনিক মজুরিভিত্তিক ২০০০ পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও অনুমোদনের অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগদানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ছাড়াও সার্টিফিকেট জালিয়াতি, বেশিসংখ্যক শ্রমিক দেখিয়ে বেতনের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদ আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে।জ্যেষ্ঠতা নীতি লঙ্ঘন করে উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা হওয়ার অভিযোগও আছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে মোরশেদ আলম চৌধুরীর মুঠোফোনে বারংবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের দুর্নীতির       তদন্তদল সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে        ১১টি সুপারিশ করেছিল। অন্যতম সুপারিশগুলো হলো-পরিচ্ছন্ন বিভাগের কোনো শ্রমিক  অন্যকোনো বিভাগে নিয়োজিত থাকলে অবিলম্বে তাকে প্রত্যাহার করে পরিচ্ছন্ন বিভাগে নিয়োজিত করা, জরুরিভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ফরমেটে শ্রমিকদের যাবতীয় তথ্যাদি সংরক্ষণ করা, পরিচ্ছন্ন বিভাগে পরীক্ষামূলকভাবে ৪/৫টি ওয়ার্ডে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করা যায়, এতে সফল হলে পর্যায়ক্রমে বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও একই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ করা। শ্রমিকদের কাজে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে ডিজিটাল হাজিরাব্যবস্থা চালু করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর তাদের বদলির ব্যবস্থা করা। এজন্যে সকল কার্যক্রম নথিতে উপস্থাপন করে সচিবালয় শাখার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ জরুরিভিত্তিতে বন্ধ করতে হবে।

নগরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা নিত্যদিনের দৃশ্য। নগরের ওমেন কলেজ মোড়, গরিবউল্যা শাহ হাউজিং সোসাইটির সামনের রাস্তায়, স্টেশন রোড, নন্দনকাননের বোস বাদার্স মোড়, মোগলটুলী রোড, বহদ্দারহাট, ফিরিঙ্গিবাজার, পাথরঘাটা, হালিশহর, পাহাড়তলী, ঈদগাহ কাঁচারাস্তার মাথা, ষোলশহরসহ নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ডাস্টবিনগুলোর বাইরে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরিচ্ছন্নকর্মীরা হাতে-মুখে কোনোকিছু ব্যবহার না করেই আবর্জনা পরিস্কারের কাজ করেন।

পরিচ্ছন্ন বিভাগের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল হাশেমের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেমের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি পরিস্কার করে কিছু বলতে পারেননি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলীর সাথে নগরের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মুঠোফোনে কথা হয়। চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুনীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি চাটগাঁর বাণীকে বলেন, “ আগের কথা বলতে পারবো না, তবে আমি এ বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর নগরকে ৬টি জোনে ভাগ করে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করছি। আধুনিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি যোগ করেন, পরিচ্ছন্নতা বিভাগকে পরিপূর্ণভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা করছি। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য পরিস্কার করতে সক্ষম হয়েছি। পরিচ্ছন্নকর্মীরা যাতে কাজে ফাঁকি দিতে না পারে সেজন্যে ডিজিটাল হাজিরার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।”

লেখক- প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম