২৫শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

নোটন প্রসাদ ঘোষ *

চট্টগ্রাম-০৬ (রাউজান) আসনে এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিটা মুহুর্ত রাউজানের জন্যে ভেবেছেন। রাউজানে মাইলের পর  মাইল  পায়ে হেঁটে গণমানুষের অবস্থা দেখেছেন স্বচক্ষে। সুখ-দু:খের সাথী হয়েছেন। উন্নয়ন কর্মের মহাযজ্ঞ করেছেন। রাউজানকে সারা বাংলাদেশের মডেলে রুপান্তর করেছেন। আগে রাউজানকে সন্ত্রাসের জনপদ বলার কারণে পরিচয় দিতে কুন্ঠাবোধ করতেন আর এখন মডেল রাউজানের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। এতসবের কারিগর যিনি, সেই ফজলে করিম চৌধুরী দিনের পর দিন বছরের পর বছর কাজ করে গেছেন। যার সুফল ভোগ করছি আমরা সকলে। তার বিনিময়ে, আমরা কি পারব না ১টা ভোট দিতে?

আপনি শহরে থাকুন বা গ্রামে  আসুন ৩০ তারিখ রবিবার নিজ নিজ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে এবিএম ফজলে করিমকে কিছুটা দায় শোধ করি।

নিচের ক’টি কথা পড়েই সিদ্ধান্ত নিন।

দৃশ্যপট-১: আমার বাড়ী রাউজানের দক্ষিণাংশে উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানীহাট এলাকায়। বৈজ্যাখালীর গেট নেমে বাড়ী যাওয়াটা এক দুস্কর ব্যাপার ছিল। রাস্তায় ছিল ইট। কোথাও সিঙ্গেল, কোথাও ডাবল ইটের সলিন। বৈজ্যাখালী গেট থেকে কেরানীহাটের দূরত্ব প্রায় ৩কিলোমিটার। যানবাহনের মধ্যে ছিল একমাত্র রিকশা। কিন্তু সড়কে ইটের সলিন এমন ভাঙা ছিল যে হাতে সময় নিয়ে হেটেই বাড়ি যেতাম। আর যেদিন দ্রুততার জন্য রিকশায় চড়েছি সেদিন প্যারাসিটামলের বিকল্প কোনো কিছুই ছিল না।

কোনো অসুস্থ মানুষ বা গর্ভবতী মহিলাকে শহরে নিয়ে আসাটা বিশাল রিস্কের ব্যাপার ছিল। রাউজানের সব প্রশাসনিক অফিস ফকিরহাটে অবস্থিত হওয়ায় দক্ষিণাংশের অধিবাসীদের বিভিন্ন কাজে উত্তরাংশে যেতে হতো। উত্তর দক্ষিণে যাতায়াতের ৩টা সড়ক আছে। যে সড়কটা বিনাজুরীর ওপর দিয়ে গেছে এটা অতিক্রম করতে জীপ নামে দানবই ছিল একমাত্র ভরসা। জীপের সিটে বসার  চেয়ে ছাদে, পেছনে বাদুড়ঝোলা করে বা ড্রাইভারের সামনে ইঞ্জিনের ওপর বসাটাই শ্রেয় মনে করত। কারণ রাস্তার যে বেহাল দশা ছিল তাতে যে মুহূর্তে গাড়ি রাস্তা বাদ দিয়ে খালে পড়ে যেতে পারে। যেটা আধারমানিক দিয়ে জলিলনগরে পৌঁছেছে সেটার অবস্থা আরো খারাপ ছিল। হাফেজ বজলুর রহমান সড়কটা তার তুলনায় কিছুটা ভাল ছিল। কিন্তু ঝুকিপূর্ণ ব্রীজ, ভাঙা ব্রীজ, কার্পেটিং নষ্টসহ নানা কারণে নাজুক অবস্থায় ছিল এ সড়ক। যে কোনোভাবেই যান না কেনো ১ঘণ্টার কমে মুন্সিরঘাটা পৌঁছাতে পারতাম না।

কিন্তু এখন সিএনজি নিয়ে ঘরের দুয়ারে চলে যাই। দক্ষিণের মানুষ সকালে চা খেয়ে উপজেলা অফিসে কাজের জন্য রওনা দেয় আর কাজ সেরে দুপুরের ভাত খায় ঘরে এসে।

দৃশ্যপট-২: নয়ন (ছদ্মনাম) জীপে নোয়াপাড়া থেকে রওনা দিয়েছেন রাউজানের দিকে। গাড়ি একটু আগানোর পরেই সামনে একটা  ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। জীপকে সিগনাল দিতেই জীপ দাঁড়িয়ে গেল। ট্যাক্সি থেকে ২জন মানুষ বের হল। একজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকল। আর একজন জীপে ঢুকে মাঝখান থেকে একজনকে টেনে হিচড়ে নামাচ্ছে। তিনি অনেক মিনতি করছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। জীপভর্তি মানুষ সবাই যেন সিনেমা দেখছেন। ওই লোক শেষ মুহুর্তে কাচা তরকারি ভর্তি বাজারের ব্যাগ থেকে ব্যাংক থেকে তোলা টাকার বান্ডিলটি বের করে গাড়িতে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। সেটাও পারলেন না। ব্যাগসহ তাকে টেনে হিচড়ে বের করে নিয়ে গেল তাকে। জীপ আবার রওনা দিল। সবাই নিজ গন্তব্যে চলল। যেন কিছুই হয় নি।

সম্প্রতি বিনাজুরী ইউনিয়নে পথসভায় বক্তব্য রাখছেন চট্টগ্রাম-০৬ (রাউজান) আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত এমপি প্রার্থী এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী

রাতে এলাকায় এলাকায় পাহারা ছিল ডাকাত রুখে দেয়ার জন্য। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় পালা করে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে রাউজানবাসী। সন্ধ্যার পর আতঙ্কের নিরবতা। কবরের নিস্তবদ্ধতা। হাটবাজারে লোকজন সন্ধ্যা নামার আগেই পলায়ন পর ছিল। দিনেদুপুরে লোকজনের সর্বস্ব কেড়ে নেয়া হত। মা বোনেরা স্বর্ণের একটা চেইন বা কানের দুল পরে বের হতেন না। কান ছিড়ে দুল নিয়ে গেছে। বিয়ে বাড়িতে হানা দিয়ে ডাকাতি হত। চাঁদার জন্য ফোন যেত ঘরে ঘরে। কেউ সমঝোতা করে দিয়ে থেকেছে। অনেকে না পেরে রাউজান ছেড়েছে। একে৪৭ অস্ত্র এবং তার বুলেট তেল/গ্রীজ দিয়ে পরিস্কার করে রাস্তার পাশে চাটাই বিছিয়ে শুকাতে দিত সন্ত্রাসীরা।  আর এসব দেখে দেখে স্কুলে গিয়েছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সমর্থ মেয়ে পাঠিয়ে দিতে হত আত্মীয়ের বাড়িতে। খুন, মারামারি, হানাহানি এগুলো যেন ছিল ছেলের হাতের মোয়া। এসবে রাউজান সারা দেশের চ্যাম্পিয়নই ছিল।

বর্তমান প্রজন্মের রাউজানে ছেলে-মেয়েদের কাছে এসব কথা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। রাউজানে এখন সারি সারি পাকা বাড়ি। গ্রামের বাড়িতেই ব্যবস্থা করছেন শহরের আধুনিক জীবনের সকল আয়োজন। ঘরের দরজা খোলা রেখে ঘুমালেও কোনো সমস্যা হয় না এখন। মেয়েরা সেজেগুজে বিয়ে-পার্বনে যায়।

আজ রাউজান সারা দেশে একটি মডেল। এ মডেলের রূপকার একজনই। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সকলে শ্রদ্ধাভরে নাম নেন তার। তিনি আর কেউই নন রাউজানের গণমানুষের আপনজন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। কি-ই না করেছেন রাউজানের জন্যে। পিংক, গ্রীন, ক্লিন এবং মাদকমুক্ত রাউজানের অগ্রগতি দুকলম লেখায় সিকিভাগও তুলে ধরা সম্ভব না। মহাজোটের এবারের ইশতিহারে বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন ‘গ্রাম হবে শহর’। আর ফজলে করিম ইতিমধ্যেই রাউজানকে শহরে রূপান্তর করেছেন।

তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড তুলে ধরার চেষ্টা করছি। মোহরা জানালী হাট থেকে রাউজানের উপর দিয়ে রেল লাইন নির্মাণ, রাউজান বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও ৩টি সাব স্টেশন সেন্টার, রাউজান রাঙামাটি সড়ক এখন ৪লেন, হালদা ভাঙন রোধে ব্লক স্থাপন, পিংক সিটি ১ ও ২ বাস্তবায়ন, শিশু সংশোধনাগার স্থাপন, আইটি ভিলেজ স্থাপন, শিল্পনগর প্রতিষ্ঠা, টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী ভবন নির্মাণ, ট্রমা সেন্টার স্থাপন, ইকোপার্ক নির্মাণ, বীজ উৎপাদন খামার স্থাপন, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৪টি বাসভবন, বঙ্গবন্ধু পাঠাগার ও আইসিটি ট্রেনিং সেন্টার, সূর্য সেন কমপ্লেক্স, নবীন সেন কমপ্লেক্স, শেখ কামাল কমপ্লেক্স, ২টি ফায়ার স্টেশন, উপজেলা পরিষদ ভবন, উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়াম, পৌরসভা ভবন, থানা ভবন, হাইওয়ে থানা স্থাপন, ডিজিটাল সেন্টার, উপজেলা সার্ভার স্টেশন, ডাক বাংলো নির্মাণ, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, ফজলুল কবির অডিটরিয়াম, প্রবাসী কল্যাণ, আনসার ভিডিপি ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, প্রত্যেকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার স্থাপন, রাউজান শিল্পকলা একাডেমী স্থাপন, বঙ্গবন্ধু গণপাঠাগার ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রাউজান কলেজ সরকারীকরণ, রাউজান, নোয়াপাড়া ও ইমাম গাজ্জালী কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর, আরো অনেক অনেক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার অভুতপূর্ব উন্নয়ন, ১৮৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে দুপুরের টিফিনের ব্যবস্থা , স্বাস্থ্য সেবাখাতে বৃহৎ পদক্ষেপ, গ্রামে গ্রামে ৪৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, ৫টি আশ্রয়ন প্রকল্প, গহিরায় বৃদ্ধাশ্রম, ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পের আওতায় ২৫২টি ঘর নির্মাণ, শেখ রাসেল স্টেডিয়ামসহ ১১টি মিনি স্টেডিয়াম, প্রধান প্রধান সড়কে বাতি, দক্ষিণ রাউজান থানা (প্রক্রিয়াধীন), ৪,৮৭,৫৪০টি ফলদ বৃক্ষরোপন আরো আরো অনেক কর্মযজ্ঞ- যা আধুনিক রাউজানকে চোখে না দেখলে বর্ণনা সম্ভব না।

এবার আমাদের কিছুটা দায় শোধের পালা। মাত্র আর ১দিন পর ৩০ডিসেম্বর আপনারা নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে এবিএম ফজলে করিমকে নৌকায় ভোট দিয়ে চট্টগ্রাম-০৬ আসন থেকে আবারো এমপি নির্বাচিত করি।

নোটন প্রসাদ ঘোষ- লেখক ও সদ্য অতীত সভাপতি, রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং হিলটাউন।