২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ || ১০ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

ওয়ানডে ফরম্যাট বলেই ছিল আকাশসমান আশা। ৫০ ওভারের ম্যাচ বলেই ছিল বুকভরা আত্মবিশ্বাস। মাঠে ব্যাট-বলের লড়াইয়ে সেই আশা ও আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠলো সুন্দর দিনের আলো হয়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে এককথায় খেললো বাংলাদেশ। প্রথম ওয়ানডেতে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ‘ছেলেখেলা’ করে ছাড়লো বাংলাদেশ। দাপুটে জয়ে এক ম্যাচ আগেই ওয়ানডে সিরিজ নিজেদের করে নিলো তামিম ইকবালরা।

বুধবার গায়ানার দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ক্যারিবিয়ানদের ৯ উইকেটে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামে জয়ের পথ আসলে বোলিংয়েই তৈরি করে রেখেছিল সফরকারীরা। মেহেদী হাসান মিরাজ-নাসুম আহমেদের ঘূর্ণিতে জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারতে স্রেফ ছিল সময়ের অপেক্ষা! টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৫ ওভারে মাত্র ১০৮ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের ফলাফল জানতে খুব বেশি সময় অপেক্ষায় রাখেনি বাংলাদেশ। তামিম ইকবালের হাফসেঞ্চুরিতে ২০.৪ ওভারে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। টানা দুই জয়ে এক ম্যাচ আগেই ২-০ ব্যবধানে সিরিজ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।

লক্ষ্য ছিল সহজ। দলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উত্তম মঞ্চ। সে কারণেই কিনা লিটন দাসকে পেছনে ঠেলে ‍নাজমুল  হোসেন শান্তকে দেখা যায় তামিমের সঙ্গে ওপেন করতে। নতুন পজিশনে খুব একটা খারাপ করেননি শান্ত। যদিও অপরাজিত থেকে খেলা শেষ করতে পারেননি। ২০ রানে একমাত্র উইকেট ‍হিসেবে বিদায় নেন তিনি।

বাকি পথটা সহজেই পাড়ি দিয়েছেন তামিম ও লিটন দাস। তামিম কিছুটা দেখেশুনে খেললেও লিটনের ব্যাটে ছিল ঝাঁঝ। বাংলাদেশ অধিনায়ক ৬২ বলে ৭ বাউন্ডারিতে অপরাজিত থাকেন ৫০ রানে। আর লিটন ২৭ বলে ৬ বাউন্ডারিতে খেলেন হার না মানা ৩২ রানের ইনিংস।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের টপ অর্ডার ভেঙে অসাধারণ বোলিং করা নাসুম আহমেদের হাতে উঠেছে ম্যাচসেরার পুরস্কার। এই স্পিনার ১০ ওভারে ৪ মেডেনসহ মাত্র ১৯ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট।

বাংলাদেশের বোলারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটাররা। সফরকারী স্পিনারদের সামনে খেই হারিয়ে ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করেছেন তারা। শুরু থেকে ভুগতে থাকা দলটি একবারের জন্যও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। স্কোরবোর্ডেই যার প্রমাণ। নাসুম আহমেদ-মেহেদী হাসান মিরাজদের ঘূর্ণির সামনে কোনোমতে ১০০ পার করেছে স্কোর।

তাসকিন আহমেদের জায়গায় সুযোগ হয়েছে মোসাদ্দেক হোসেনের। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়ে অবদান রাখতে পারবেন, এই আস্থাতেই একাদশে জায়গা হয়েছে এই অলরাউন্ডারের। বোলিংয়ে অবদান তিনি শুরুতেই রাখলেন। এই অফ স্পিনারের হাত ধরেই প্রথম উইকেটে এসেছে বাংলাদেশের। এরপর নাসুম আহমেদের ভেল্কিতে দুর্দান্ত শুরু পায় তামিম ইকবালরা।

বাংলাদেশকে শুরুতেই সাফল্য এনে দেন মোসাদ্দেক। উইকেট না হারালেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং ছিল মন্থর। বেশ সংগ্রাম করতে হচ্ছিল দুই ওপেনার শাই হোপ ও কাইল মায়ার্সকে। রান খুব বেশি তুলতে না পারলেও উইকেট আগলে রাখছিলেন তারা। অবশেষে তাদের প্রতিরোধ ভাঙেন মোসাদ্দেক। মায়ার্সকে সরাসরি বোল্ড করে এনে দেন প্রথম উইকেট।

অফ স্টাম্প বরাবর মোসাদ্দেকের গুড লেংথ বল মায়ার্স ফ্রন্ট ফুটে ডিফেন্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি, বল আঘাত করে স্টাম্পে। প্রথম ওয়ানডেতেও এই ব্যাটার একইভাবে আউট হয়েছিলেন। সেবার বোলার মেহেদী হাসান মিরাজ থাকলেও এবার মোসাদ্দেক। মায়ার্সের ব্যাট থেকে আসে ১৭ রান।

মোসাদ্দেকের এনে দেয়া উইকেট উৎসব টেনে নেন নাসুম আহমেদ। আগের ম্যাচেই ওয়ানডেতে অভিষেক হয়েছে তার। টি-টোয়েন্টিতে নিজের সামর্থ্যের জানান আগেই দিয়েছেন। ৫০ ওভার ক্রিকেটেও ছাপ রাখছেন বাঁহাতি স্পিনার। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তার ভেল্কিতেই এলোমেলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এই বাঁহাতি স্পিনার একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে ভেঙে দেন ক্যারিবিয়াদের টপ অর্ডার। শামারাহ ব্রুকসকে দিয়ে তার উইকেট আনন্দ শুরু। ওয়ান ডাউনে নামা এই ব্যাটারকে ক্লিন বোল্ড করে প্যাভিলিয়নে ফেরান। যাওয়ার আগে ১৩ বলে করেন মাত্র ৫ রান। এরপর ছেঁটে ফেলেন শাই হোপকে। স্বাগতিক ওপেনার একপ্রান্ত আগলে রেখে আশা জাগালেও সেটা বেশিক্ষণ টিকেনি। নাসুমের ভেল্কিতে তিনি কুপোকাত। এই উইকেটকিপার ব্যাটার মোসাদ্দেককে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ১৮ রানে। ৪৫ বলের ইনিংসে মেরেছেন মাত্র একটি বাউন্ডারি।

১৭তম ওভারের চতুর্থ বলে উইকেট নেওয়ার এক বল পরই আবার উইকেট নাসুমের। এবার তার শিকার অধিনায়ক নিকোলাস পুরান। ক্যারিবিয়ান অধিনায়ককে তো রানের খাতাই খুলতে দেননি। মুখোমুখি প্রথম বলেই ক্লিন বোল্ড হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান পুরান। তাতে ৪৫ রানে ৪ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা।

পুরানের বিদায়ে সবচেয়ে বড় আঘাত লাগে। শুরু থেকে সংগ্রাম করলেও অধিনায়ক হিসেবে তার কাছে বাড়তি চাওয়া ছিল দলের। কিন্তু তিনি আউট হওয়ার পর হয়েছে আসা-যাওয়ার মিছিল। রোভম্যান পাওয়েলের ‘ওয়ানডে খেলোয়াড়’ হতে যে আরও সময় দরকার, সেটা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডানহাতি ব্যাটার শরিফুল ইসলামের বলে ১৩ রান করে বিদায় নেন মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ হয়ে। এমনিতেই বাংলাদেশের বোলারদের দাপট চলছিল, তার ওপর আবার উইকেট ‘উপহার’ দেয় স্বাগতিকরা। ২ রান করে রান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন আকিল হোসেন।

পরের ৩ উইকেট মিরাজের। আগের ম্যাচে আলো ছড়ানো এই স্পিনার এই ম্যাচেও ছিলেন দুর্দান্ত। তার ঘূর্ণিতে কাটা পড়েন রোমারিও শেফার্ড (৪), আলজারি জোসেফ (০) ও গুদাকেশ মোতি (৬)। তাদের ব্যর্থতার মাঝে একপ্রান্ত আগলে ছিলেন কিমো পল। এই ব্যাটার খেলেছেন দলীয় সর্বোচ্চ অপরাজিত ২৫ রানের ইনিংস। ২৪ বলের ইনিংসটি তিনি সাজান ৪ বাউন্ডারিতে।

বাংলাদেশের বোলারদের দিনে সবচেয়ে সফল মিরাজ। ৮ ওভারে এক মেডেনসহ ২৯ রান দিয়ে পেয়েছেন ৪ উইকেট। টপ অর্ডার ভেঙে দেওয়া নাসুম ১০ ওভারে ৪ মেডেনসহ মাত্র ১৯ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। আর একটি করে উইকেট মোসাদ্দেক ও শরিফুল ইসলামের।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৩৫ ওভারে ১০৮ (কিমো পল ২৫*, শাই হোপ ১৮, কাইল মায়ার্স ১৭, রোভম্যান পাওয়েল ১৩, ব্রেন্ডন কিং ১১; মেহেদী মিরাজ ৮-১-২৯-৪, নাসুম আহমেদ ১০-৪-১৯-৩, শরিফুল ৩-০-৯-১, মোসাদ্দেক ১০-০-৩৭-১)।

বাংলাদেশ: ২০.৪ ওভারে ১১২/১ (তামিম ইকবাল ৫০*, লিটন দাস ৩২*, নাজমুল শান্ত ২০; গুদাকেশ মোতি ৭.৪-১-৩৯-১)।

ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

সিরিজ: তিন ম্যাচের সিরিজ বাংলাদেশ ২-০তে এগিয়ে।

ম্যাচসেরা: নাসুম আহমেদ।